জনমত জরিপের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে জরিপের ফলাফলে জনমতের প্রতিফলন ঘটে না। ১৪ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র ৫ হাজার মানুষের অভিমত নিয়ে জরিপে কখনোই উঠে আসে না প্রকৃত চিত্র। তৃতীয় বিশ্বের দেশে একমাত্র গণভোটের মাধ্যমে (যদি সুষ্ঠু হয়) জনমতের প্রতিফলন পাওয়া যেতে পারে। এ অভিমত বিশেষজ্ঞদের। তারা বলেছেন, গণমাধ্যম নিজস্ব এজেন্ডা ও পছন্দের প্রশ্নমালা দিয়ে এই জরিপ করেছে। এর মাধ্যমে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই তারা প্রকাশ করেছে। যে কারণে একই সময়ে এবং একই পদ্ধতিতে পরিচালিত এই জনমত জরিপে ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল দেখা গেছে। একটি সংবাদপত্র দেখিয়েছে, বিরোধী দলের নেত্রীর জনপ্রিয়তা কিছুটা বেড়েছে, অন্যটিতে দেখা গেছে তার জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে। সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা নিয়েও পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে।
বর্তমান সরকারের চার বছর পূর্তি এবং আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা ধরনের জনমত পরিচালিত হচ্ছে। বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এসব জরিপ করছে। এসব জরিপ জনমনে কিছুটা হলেও বিভ্রান্তি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাশ্চাত্য দেশগুলোয় বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে জনমত জরিপ পরিচালনা করা হয়। সেই জরিপের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কেউ প্রশ্নও তোলেন না। অথচ আমাদের দেশে জরিপের ক্ষেত্রে রয়েছে ভিন্ন চিত্র। গণমাধ্যমের নিজস্ব এজেন্ডা সেট করার ফলে ওইসব ইস্যুর বাইরে জনগণের মত নেয়া সম্ভব হয় না।
এ প্রসঙ্গে প্রবীণ সাংবাদিক ও সংবাদপত্রে প্রথম জরিপ পরিচালনাকারী শফিক রেহমান বলেন, পত্রিকাগুলো সময়ের প্রয়োজনে জরিপগুলো বের করেছে। অনেকেই আবার উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে জরিপ কার্য পরিচালনা করে থাকে। তবে বর্তমানে যারা জরিপ পরিচালনা করছেন, তা বিজ্ঞানসম্মত নয়। কারণ জরিপে কাদের মতামত নেয়া হচ্ছে, তারা কোন আদর্শের, আদৌও কারোর মতামত নেয়া হয়েছে কি না বা অফিসে বসে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে কি না, প্রশ্ন কর্তা কি ধরনের প্রশ্নের উত্তর চাচ্ছেন বা কোন উদ্দেশ্যে জনগণের কাছ থেকে উত্তর চাওয়া হচ্ছে, এমনকি প্রাপ্ত তথ্যের উপস্থাপনের সঙ্গে বাস্তবতার মিল থাকছে কি না- এসব প্রশ্ন প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে। কোন পত্রিকার জরিপে বিদ্যুত্, গ্যাস, জ্বালানি তেল, নিত্যপণ্য দ্রব্যমূল্যর দাম বৃদ্ধির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কথা বলেছে। এসব কারণেই জরিপের ফলাফল নিয়ে দেখা দিচ্ছে ভিন্নতা।
শফিক রেহমান বলেন, ১৯৮৫ সালে প্রথম এ ধরনের জরিপ পরিচালনা করে তত্কালীন যায়যায়দিন পত্রিকা। তবে জরিপকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা বেশ দুরূহ কাজ। তখন কম্পিউটার ছিল না, তারপরেও অনেক কষ্ট করে বিদেশিদের পরামর্শ নিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে জরিপ পরিচালনা করে ছিলাম। আসলে এসব জরিপে কখনো সঠিক প্রশ্নের উত্তর দিতে চায় না জনগণ। এ জন্য দু’ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করি। এর মধ্যে সরাসরি উত্তরদাতা এবং পরোক্ষভাবে যারা পত্র বা লিখিতভাবে উত্তর বা মতামত দেন তাদের মতামত গ্রহণ করা হয়।
জরিপকে গ্রহণযোগ্য করার বিষয়ে তিনি বলেন, জরিপ একটি চলমান প্রক্রিয়া। ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে গত বছর কোন পত্রিকা ৫ হাজার লোকের মতামত গ্রহণ করতে পারে। একইভাবে ওই ৫ হাজারের মধ্যে থেকে কিছু বাদ দিয়ে আবার সাড়ে ৪ হাজারের মতামত পুনরায় নিতে পারে। নতুন করে আরো ৫শ বা ১ হাজারের মতামত নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে তাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হলো কি না তা স্পষ্ট হওয়া যায়। জরিপে ‘ফ্যাক্ট স্টাবলিশ’ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তবে জরিপে নমুনা যতবেশি নেয়া যাবে জরিপ ততই গ্রহণযোগ্য হবে। যদিও চলমান জরিপ কাজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আতাউর রহমান বলেন, পশ্চিমা বিশ্বে এটা একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বহুদিন ধরে এ নিয়ে তারা কাজ করায় জনগণের মাঝে গ্রহণযোগ্যতাও তৈরি হয়েছে। গড়ে উঠেছে গবেষণা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমাদের দেশে উন্নত বিশ্বের মতো জরিপ পরিচালনা ও তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারপরেও এই ধারা রাজনীতি ও জনগণের জন্য মঙ্গল। জনগণ কিছুটা হলেও সচেতন হতে পারছে। জরিপগুলো শতভাগ গ্রহণযোগ্য না হলেও জনগণের ইস্যুগুলো সামনে চলে আসছে। মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটছে।
তিনি বলেন, জরিপ পদ্ধতি, নমুনা ও তথ্য বিশ্লেষণ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কারণ যিনি তথ্য উপস্থাপন করছেন তিনি সেটা ভিন্নভাবে তুলে ধরতে পারেন। ১৪ কোটি লোকের মধ্য থেকে ৫ হাজার মানুষকে নমুনা ধরে জরিপে সঠিক চিত্র কখনোই আসে না। তারা গভীরে প্রবেশ করে না। ফলে এখানে তথ্যের ব্যত্যয় ঘটাটাই স্বাভাবিক। আবার পত্রিকাগুলো নিজেদের মতো করে জরিপও পরিচালনা করে থাকে। সবকিছু মিলিয়ে জরিপ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও জনগণ, জনপ্রতিনিধি, বিরোধী দল ও সরকার একটা বার্তা পেয়ে যাচ্ছে। যেটি রাজনীতির জন্য ইতিবাচক বলা যেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, পত্রিকাগুলো এজেন্ডা সেটিং করে জরিপগুলো পরিচালনা করে থাকে। কোন পত্রিকায় সরকারের জনপ্রিয়তা ৭৩ শতাংশ বলেছে, আবার কোন পত্রিকায় বলা হচ্ছে সরকারের জনপ্রিয়তা ৩৫ শতাংশ। আবার কয়েকটি সংবাদপত্রে দেখলাম সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। এতে জনগণই বিভ্রান্ত হচ্ছে। তবে প্রশ্নের ধরন ও নমুনার উপর জরিপের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে। কিন্তু আমাদের পত্রিকাগুলো এক একটি উদ্দেশ্য নিয়েই জরিপগুলো পরিচালনা করে থাকে। যেখানে জনমতের কোন প্রতিফলন ঘটে না। জরিপগুলোর কোন নির্ভরযোগ্যতাও নেই। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের দেশের এসব জরিপ বরং বিভ্রান্তই তৈরি করে। তিনি পত্রিকাগুলোকে পাশ্চাত্য দেশগুলো যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করে জরিপ পরিচালনা করে সেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে জরিপ পরিচালনার আহবান জানান। তিনি আরো বলেন, এসব জরিপের প্রশ্নে সরকারের সাফল্যগুলো থাকে না। বরং নেতিবাচকভাবে প্রশ্নগুলো প্রস্তুত করে মাত্র দু’টি অপসন দেয়া হয়। এতে একপ্রকার বাধ্য হয়ে উত্তর দেন উত্তরদাতারা।
বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক পিয়াস করিম বলেন, জরিপগুলোতে ধরে নেয়া হয় যাদের কাছে প্রশ্ন করা হচ্ছে তারা সঠিক উত্তর দিচ্ছেন। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের জনগণ জরিপে সঠিক কথা বলে না। এ জন্য জরিপে সঠিক উত্তর পাওয়া চ্যালেঞ্জ। পত্রিকাগুলোর জরিপ পদ্ধতি নিয়ে ত্রুটি রয়েছে। পত্রিকাগুলো নিজস্ব পলিসি অনুযায়ী জরিপ পরিচালনা করে থাকে। নমুনাগুলো কিভাবে সংগ্রহ করা হলো, প্রশ্ন কর্তা কে, কাকে প্রশ্ন করা হলো, কিভাবে উত্তর জানা গেলে—এসব বিষয় স্পষ্ট নয়। ফলাফলেও রয়েছে স্ববিরোধিতা। তিনি বলেন, জরিপের প্রশ্নকর্তা ও নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে পত্রিকাগুলো সমাজবিজ্ঞানী বা কোন দক্ষ একাডেমিশিয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এতে জরিপের ত্রুটিগুলো কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। তবে এই জরিপ নিয়ে স্বল্প সময়ে জনমনে ধূম্রজালের সৃষ্টি হলেও ধীরে ধীরে এক সময়ে কেটে যাবে।
