গতকাল জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ১৮ দলীয় জোটের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলাকালে দুরু দুরু বুকে বাসা থেকে বের হলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে এক জরুরি মিটিং এ যেতে হবে, হূদয়ের কাঁপুনি খেয়াল করার সুযোগ নেই। মাত্র বিশ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে হরতাল দিবসে যে রোমাঞ্চ বোধ করতাম, তেমন কোন অনুভূতি আমাকে নাড়া দিল না। কেবল সেদিনের হরতালে বিশ্বজিতের মর্মান্তিক খুনের দৃশ্য মনটাকে ওলট-পালট করে দিতে লাগলো। ভাবছিলাম, আজো যদি এমন কোন ঘটনা ঘটে!
কলাভবনের গেটে পৌঁছেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। মনে হলো এক ভারি মনোযন্ত্রণা থেকে আমি মুক্ত হলাম। আমার এ ব্যক্তিক অনুভূতি বোধ হয় অধিকাংশ নাগরিকের সামষ্টিক বেদনার সাথে একাকার হয়ে জাতীয় জীবনে মনোযন্ত্রণার গভীর ক্ষত যুক্ত হয়েছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যন্ত্রণা, বেদনা, ক্ষোভ ও দুঃখগুলো পুরো জাতির মনোজগতে অনিরাময়যোগ্য ব্যাধি সংক্রমিত করছে, যার সুদৃঢ় সুদূরপ্রসারী প্রতিফলন ঘটছে আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায়।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে হরতাল দাবি আদায়ের কৌশল হিসেবে স্বীকৃত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু হরতাল বিষয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অসুস্থ সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, এমনকি হরতালের মর্মার্থ, লক্ষ্য, ধরন, কৌশল সম্পর্কেও ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত হচ্ছে।
গণতন্ত্রে হরতাল এবং এ জাতীয় কর্মসূচি বোঝাতে যে শব্দগুলো ব্যবহূত হয় তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধর্মঘট, বন্ধ, স্টাইক, অবস্থান কর্মসূচি, সিট ইন ইত্যাদি। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে হরতালের প্রযোজ্যতা অনুধাবনযোগ্য কিন্তু গণতন্ত্রের প্রয়োজনে হরতালই অবধারিত এমন ধারণা চিরায়ত রূপ লাভ করতে পারে না। গণদাবি আদায়ে হরতালের প্রয়োজনীয়তা সর্বশেষ বিকল্প, কিন্তু একে একমাত্র বিকল্প হিসেবে স্থির করা অনুচিত। গণদাবি পূরণের লক্ষ্যে কার্যকর সকল বিকল্প ব্যর্থ হলে ‘হরতাল’ বিকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ কর্মসূচি, অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন ফলপ্রসু ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। মানববন্ধন, মৌনমিছিল প্রভৃতি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও অগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না। হরতালের মত চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা ও বাস্তবায়নের আদো প্রয়োজনীয় পূর্বশতগুলো পূরণ না হলে গণতন্ত্রের সুষ্ঠু বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
আমাদের রাজনীতিবিদগণ হরতাল পালনের পূর্বে এ পূর্বশর্তগুলো পূরণ হয়েছে কিনা তার পুংখানুপুংখ যাচাই করেন না। ফলে কোন এক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকাকালে হরতাল সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে, বিরোধী দলে থাকলে সেই দলটি সম্পূর্ণ পৃথক এক ধারণা লালন করে। অর্থাত্ হরতালকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা বাংলাদেশে যত বেশি, জনগণের স্বার্থ ও অধিকার আদায়ে হরতালকে কার্যকর কর্মসূচি হিসেবে অনুশীলনের ইচ্ছে ঠিক তত কম। হরতাল সম্পর্কে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের এ ধরনের মানসিকতা ও প্রাকটিস কেবল জনদাবিকে পাশ কাটাচ্ছে সূক্ষ্মভাবে।
নব্বই দশকে গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রাকালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগ অসংখ্য হরতাল পালন করে এবং হরতালের মাধ্যমে বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করে জনগণের দাবি, স্বার্থ ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী নেতৃবৃন্দ দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে। ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগ শাসনভার গ্রহণ করে। তখন জনগণের স্বার্থরক্ষায় বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করলে আওয়ামী নেতৃবৃন্দ হরতালকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে জোর বক্তব্য দিতে শুরু করে। কোন কোন নেতা এমন ঘোষণাও দেন যে, বিরোধী দলে গেলেও তারা আর হরতাল করবেন না। একবিংশ শতাব্দীতে পুনরায় বিএনপি ক্ষমতায় আরোহণ করলে আওয়ামী লীগ পুনরায় হরতালের মাধ্যমে সোচ্চার হয়ে হরতাল সংস্কৃতির নতুন মাত্রা যোগ করে। বিএনপি শাসনের শেষাংশে উপর্যুপরি হরতাল দিয়ে দেশকে অচল করে দেওয়ার মত অবস্থা তৈরি করা হয়। হরতাল, অবরোধ, ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও হয়ে উঠে আমাদের নিত্যদিনকার রাজনৈতিক এবং নাগরিক জীবনের প্রতিচ্ছবি। এক পর্যায়ে ১/১১ -এর বেদনাদায়ক অধ্যায়ের সূত্রপাত হয় এবং ছায়া সেনাশাসনের অধীনে বিরাজনীতিকীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে গত চার বছরে সাফল্য-ব্যর্থতার ইতিহাস গড়েছে। ২০১৩ সালের নববর্ষের শুরুতে পত্র-পত্রিকা ও ইলেকট্রোনিক মিডিয়ায় জ্ঞানী-গুণিগণ সেই সাফল্য-ব্যর্থতার মূল্যায়ন উপস্থাপন করেছেন। তার আলোকে নির্মোহ দৃষ্টিতে সরকারকে আত্মমূল্যায়নে সচেষ্ট হতে হবে। বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি আন্দোলনের কৌশল হিসেবে উপর্যুপরি হরতাল ঘোষণা ও বাস্তবায়নের পূর্বে হরতালের প্রচলিত প্রক্রিয়ার ব্যাপারে জনগণের সমর্থন আছে কিনা তা পুনঃপরখ করা উচিত। গতকালের ১৮ দলীয় হরতালের মূল কারণ ছিল: ‘জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি’। জনমনে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে কিভাবে প্রতিফলিত করা হবে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তা জনমনে কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
৬ জানুয়ারি ‘দি ডেইলী স্টারে’ সিপিডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ জনগণের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে। ‘দৈনিক ইত্তেফাকে’ অত্যন্ত দরদী ভাষায় শীর্ষ খবর হিসেবে ছাপা হয়েছে: “তেলের দামের সাথে বাড়ল মানুষের কষ্টের বোঝা”। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে যে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, তা কি এই হরতালের মাধ্যমে দূর করা যাবে? হরতালের মাধ্যমে কি বিরোধী দল জ্বালানির মূল্যহ্রাসে সরকারকে বাধ্য করতে পারবে? হরতালের ফলে যে জনদুর্ভোগ, তা বিরোধী দলের ব্যাপারে জনগণের যে বিরক্তির উদ্রেক ঘটাবে, তা প্রশমনে কি বিরোধী দল সক্ষম? এ প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর যদি না হয়, তাহলে হরতাল কেন? আবার বিরোধী দলের ডাকা হরতাল বাঞ্ছাল করতে সরকারের সর্বমুখী তত্পরতাইবা কেন? এ অবস্থা আমাদের কিশোর গণতন্ত্রের জন্য খুবই অনিষ্টকর।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিরোধী দলের হরতাল আহবান গণতান্ত্রিক অধিকার। সেই অধিকার হরণ করার সরকারি তত্পরতা হিতকর নয়। লক্ষণীয় বিরোধী দলের হরতাল আহবানের পরপরই প্রথমে সরকার তার সমর্থক রাজনৈতিক দল বা দলসমূহকে ঐ হরতাল বন্ধ করতে মাঠে নামায়। পুলিশও হরতালকারীদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালায়। বিশ্বজিতের নিহত হওয়া সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর উদাহরণ। বিরোধী দলের হরতাল পালনের কর্মসূচির বাস্তবায়নের জন্য সরকারের সহযোগিতা গণতন্ত্রে স্বীকৃত পদ্ধতি। দুঃখজনক হলো, হরতালের দিনে হরতাল আহবানকারী রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীকে পথে নামতে দেয়া হয় না, বরং রাজপথ থাকে সরকারি দলের দখলে। মনে হয় সরকারি দলই পিকেটিং করছে। অর্থাত্ সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা রাজপথে থাকেন অতন্দ্র প্রহরারত। গণতন্ত্রের প্রয়োজনে জনগণের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলের হরতাল পালনের এ অনিষ্টকর সংস্কৃতি অচিরেই বন্ধ করা উচিত। এ জন্য প্রয়োজন কার্যকর সংলাপের। প্রশ্ন হলো, সংলাপের পরিবেশ আমাদের দেশে আছে কি-না। হরতাল ঘোষণার সাথে সাথে সরকারের উচিত বিরোধী দলের আহূত হরতালের কারণ ব্যাখ্যা করা। বিরোধী দলের এ দাবি যদি ন্যায্য হয়, তা যদি জনগণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় হয়, তাহলে সেই দাবি পূরণ করেই কেবল হরতাল কর্মসূচি বন্ধ করার ব্যবস্থা করা উচিত। তাহলে সরকার বন্দনাময় হয়। সরকার জনগণের প্রিয় হয়ে উঠে। তখন বিরোধী দলেরও বিরোধ করার কোন ইস্যু থাকে না, ফলে সরকার হয়ে উঠে জনপ্রিয়, জননন্দিত। আর যদি বিরোধী দলের দাবি পূরণ সম্ভব না হয়, তাহলে কেন তা সম্ভব নয়, তার যথার্থ কারণ ব্যক্ত করা উচিত। এতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সদ্ভাব, সুসম্পর্ক ও বিশ্বস্ততা তৈরি হয় নিবিড়ভাবে।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে জনগণের প্রয়োজনে রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক উপাদান, যার অভাবে প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রও মুখ থুবড়ে পড়ে। আমাদের রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় অভাব বিশ্বাস ও আন্তঃবিশ্বাসের। বিশ্বাস ও আন্তঃবিশ্বাসের সিঁড়ি বেয়ে সংলাপের পথে যাত্রা করার এখনি সময়। রাজনীতির মহাশ্মশানে আমরা গণতন্ত্রকে আর দগ্ধীভূত দেখতে চাই না। ৬ জানুয়ারি একটি পত্রিকার খবরে ‘সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস’ শীর্ষক হেড লাইন মূল্যায়নের সাহস ও স্বচ্ছতা থাকতে হবে সরকারের। কয়েকদিন আগে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হয়ে ফলপ্রসূ সংলাপের ঘোষণা দেন। কিন্তু এর পরপরই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত আরো দুটি মামলা দিয়ে তার মুক্তি বা জামিনের পথ রুদ্ধ করে সরকার সংলাপ প্রক্রিয়ার পথ কঠিন করে তুলে। আবার সংসদে যোগ না দিয়ে বিএনপি সংলাপের শীর্ষস্থান থেকে চ্যুত হয়ে জনগণের স্বার্থের কথা তুলে ধরার সুযোগ হাতছাড়া করছে একে একে। বিএনপির সংসদে যাওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে যে দাবি করে আসছে, সরকারের উচিত সে দাবির মূল্যায়ন করা। অন্যথায় সংলাপের সর্বশেষ সুযোগ হাতছাড়া হতে বাধ্য।
সরকার ও বিরোধী দলকে সযত্নভাবে জনগণের মন ও মানস বুঝতে হবে। যে কারণে ১/১১-এ অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছিল, সেই রকম অসংখ্য কারণ এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে উপস্থিত। এগুলো দূর করতে না পারলে অচিরেই জনগণ বড় দু’দলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে নতুন চিন্তায় মগ্ন হবে। ইতিমধ্যে রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থান নিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। তৃতীয় শক্তির এ উত্থান স্বতঃস্ফূর্ত জনগণের স্বার্থের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয় নিয়ে সে অনুভূতি এখন বেশ আলোড়িত তরঙ্গ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। অনেক রাজনৈতিক অরাজনৈতিক জ্ঞানী-গুণীরা তৃতীয় সুরে তরঙ্গায়িত হচ্ছেন। একটি অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি আমরা। সেই অনিশ্চিত, সেই অজানা বিপদ আশংকা দূর করতে বিএনপি-আওয়ামী লীগের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো এখন সংলাপে বসা। এ ব্যাপারে একটি ফলপ্রসূ রূপরেখা প্রণয়ন করে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে আয়োজিত সংলাপই আমাদেরকে আরেকটি রাজনৈতিক ধস থেকে মুক্ত করতে পারে। একটি কার্যকর সংলাপ প্রক্রিয়ার রূপরেখা নিয়ে মতবিনিময় করার সময় এখন এবং এখনই।
++লেখক :সহযোগী অধ্যাপক,
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
