দুর্ঘটনা কি ‘হঠাৎ করিয়া' ঘটিয়া যায়? অবশ্যই নহে; কারণ, গভীরভাবে লক্ষ করিলে দেখা যাইবে, প্রায় প্রতিটি দুর্ঘটনার পিছনে থাকে অবহেলা, অসতর্কতা কিংবা দায়িত্বে গাফিলতির এক দীর্ঘ মানসিকতা। একটি গ্যাস সিলিন্ডার নামানোর সময় সামান্য ভুল, একটি যন্ত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এক মুহূর্তের অসতর্কতা কিংবা নিরাপত্তাবিধির কোনো একটি তুচ্ছ অথচ জরুরি ধাপ এড়াইয়া যাওয়া—এই ধরনের ‘সামান্য’ ভুলই অনেক সময় ডাকিয়া আনিতে পারে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি, কাড়িয়া লইতে পারে মানুষের অমূল্য জীবন । প্রতিটি দুর্ঘটনার পর আমরা কেবল আহাজারিতে বুক ভাসাই, তদন্ত চলে, একে অপরের কাঁধে দায় চাপাইবার প্রতিযোগিতা করি; কিন্তু কখনো ভাবিয়া দেখি না যে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা যথাযথভাবে গ্রহণ করা হইলে দুর্ঘটনাটি না-ও ঘটিতে পারিত । আশুলিয়ার সাম্প্রতিক অগ্নি ও বিস্ফোরণের ঘটনা আমাদের আবারও এই নির্মম সত্যটির মুখোমুখি দাঁড় করাইয়াছে ।
গত রাত্রে আশুলিয়ার জামগড়ায় এক পোশাককারখানা চত্বরে গ্যাস সিলিন্ডারবাহী কাভার্ড ভ্যান হইতে সিলিন্ডার নামানোর সময় বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যাহাতে অন্তত ছয় জন নিহত এবং অনেকে আহত হন । ভয়াবহ বিস্ফোরণে কারখানা ও আশপাশের স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয় । প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, এত ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ কি যথাযথ প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও নিরাপত্তাবিধি ছাড়া করিবার সুযোগ থাকা উচিত? রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র দেশে আমরা গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহনের ক্ষেত্রে যেই ‘যাচ্ছেতাই’ অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া থাকি, তাহা কি ভীতি-জাগানিয়া নহে? কারণ, গ্যাস-ভর্তি সিলিন্ডারকে ‘জীবন্ত টাইম বোমা' বলিলেও কম হইবে!
‘অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী’–এই বহুল প্রচলিত প্রবাদটির বাস্তব ভয়াবহতা আমরা সম্ভবত কর্মক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি দেখিতেছি । এই দেশে প্রতিদিন বয়লার বিস্ফোরণ, নির্মাণকাজে ভারী বস্তু পড়িয়া প্রাণহানি, যন্ত্রের মধ্যে শ্রমিক আটকা পড়া, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা কিংবা অদক্ষ চালকের হাতে সড়ক দুর্ঘটনা প্রভৃতি অসংখ্য ঘটনা ঘটিয়া থাকে । প্রেক্ষাপট আলাদা হইলেও অধিকাংশ ঘটনার নেপথ্যে দেখা যায় একই দুর্বলতা! বিভিন্ন বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান থাকিতে পারে; কিন্তু প্রতিটি কাজেরই কিছু বিশেষায়িত জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। বিশেষ করিয়া শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, গ্যাস, নির্মাণ কিংবা যন্ত্রপাতি পরিচালনার ন্যায় ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে ‘ভাসাভাসা জ্ঞান’ কোনোভাবেই যথেষ্ট নহে। অভিজ্ঞতাকে বাদ দিয়া অনুমানের উপর নির্ভর করার মানসিকতাই অনেক সময় বড় দুর্ঘটনার বীজ বপন করে । এইজন্য ‘এতদিন তো কিছু হয় নাই’ কিংবা ‘এতটুকুতে কী হইবে' টাইপের চিন্তা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য ।
উন্নত বিশ্ব এই জাতীয় ঝুঁকিকে ব্যক্তিগত সতর্কতার উপর ছাড়িয়া রাখে নাই । তাহারা ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে ‘কম্পিটেন্ট পারসন' বা যথাযথ দক্ষ ব্যক্তির ধারণাকে গুরুত্ব দিয়া থাকেন । যিনি ঝুঁকি শনাক্ত করিতে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে সক্ষম, কেবল তাহাদেরকেই দায়িত্বে বসানো হয় । উন্নত বিশ্বের মূল দর্শনই হইল, দুর্ঘটনা ঘটিবার পর দায়ী ব্যক্তি খোঁজার পরিবর্তে দুর্ঘটনা ঘটিবার পূবেই ঝুঁকি বন্ধ করা শ্রেয় । আমরাও কি সেই পথে হাঁটিব না?
একটি ছোট অসতর্কতার মূল্য কত বড় হইতে পারে, তাহা বুঝিবার জন্য বড় কোনো উদাহরণের প্রয়োজন নাই। মইয়ের একটি ধাপ দুর্বল দেখিয়া যদি কেউ বলেন, ‘কিছু হইবে না', সেই একটি ধাপই পরক্ষণে বড় বিপদের কারণ হইতে পারে । তবে পরিতাপের বিষয়, ইহা আমরা বুঝি, ঠিক যখন মই ভাঙিয়া নিচে পড়িয়া যাই । মূলত এই কারণেই বলা হয়, নিরাপত্তাবিধি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নহে, বরং ইহা মানুষের জীবনের প্রতিই দায়িত্ব পালন । অতএব, শিল্পকারখানার মালিকদের বুঝিতে হইবে, দক্ষ জনবল নিয়োগ কোনো অতিরিক্ত ব্যয় নহে, বরং ইহা বিনিয়োগ । নিরাপত্তায় এক দিনের সাশ্রয় বহু বছরের ক্ষতি ডাকিয়া আনিতে পারে। পাশাপাশি বিপজ্জনক কাজে কেবল ‘কাজটি জানি' বলা লোকের উপর ভরসা করা হিতে বিপরীত হইতে পারে । একই ভাবে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হইল, নিয়ম কাগজে আছে কি না, তাহা না দেখিয়া নিয়ম বাস্তবে মানা হইতেছে কি না, তাহা দেখা। ‘কিছু হইবে না’–এই অবহেলাপূর্ণ বাক্যটি যেন আর কোনো মৃত্যুর পূর্বভূমিকা না হয়, সেই ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকিতে হইবে ।

