অনিয়মই নিয়ম যেখানে

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৪
ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম দুর্নীতি থামছে না। বিশ্ববিদ্যালয় আইন এবং সরকারি বিধি-বিধান না মেনে একের পর এক অনিয়ম করে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই চলছে এ অনিয়ম ও দুর্নীতি। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে একের পর এক জনবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গবেষণার দিকে কারো নজর নেই। পত্রিকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোন ডিগ্রি না থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন একজন। ২০০৮ সালে গঠিত একটি তদন্ত কমিটি এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পায়। ওই সময় এই কর্মকর্তা ছিলেন খামার তত্ত্বাবধায়ক পদে। নানা আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই তদন্ত কমিটি খামার তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ১৪ দফা সুপারিশ পেশ করে। অভিযুক্ত এই কর্মকর্তাকে খামার তত্ত্বাবধায়ক পদ থেকে পদাবনতি করা বা তার প্রাপ্য পদোন্নতি, আপগ্রেডস, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও বার্ষিক বর্ধিত বেতন পাঁচ বছরের জন্য রহিত করার সুপারিশ করে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সিন্ডিকেটের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু তত্কালীন ভিসি শাহ ই আলম তার দুটি ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করে দিয়ে জনসংযোগ কর্মকর্তার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেন। এ পদে থেকে সবধরনের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন ঐ কর্মকর্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পর্যায়োন্নয়ন ও নিয়োগ নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও ২০১০ সালে তিনি সিলেকশন গ্রেড নেন। পরে যদিও প্রশাসন আবার তা বাতিল করে। এছাড়া এই ব্যক্তির এমএস ডিগ্রি না থাকলেও আবারো পদোন্নতির আবেদন করেছেন। এ কাজে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সায় রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এই কর্মকর্তাকে শাস্তি না দিয়ে এখন পুরস্কৃত করা হচ্ছে। শিক্ষকরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১২ বছর ভিসির দায়িত্ব পালন করেছেন ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক। ওই সময় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত হয় এটি। মেধা বিবেচনা না করে স্বজনপ্রীতি ও রাজনীতি বিবেচনায়ই সব জনবল নিয়োগ হয়। এ কারণে সবার দাবি ছিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ভিসি নিয়োগ। শিক্ষকদের এ দাবি পূরণ হয় এবার। শুধু ভিসি নন, প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষও নিয়োগ হয় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। শিক্ষক কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের আশা ছিল এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন হবে। মেধা যোগ্যতা কিছুটা হলেও প্রধান্য পাবে। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখছে না। গবেষণার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছে ভিসি, প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষের মধ্যে। বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় বিবেচনায় জনবল নিয়োগের জন্য তালিকা তৈরির কাজ চলছে। সাবেক ভিসি অধ্যাপক শাহ ই আলম ড্রাইভার পদে নিয়োগের জন্য যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন তাতে বলা হয়, এ পদের জন্য এসএসসি উত্তীর্ণ হতে হবে। পরে বর্তমান ভিসি ওই বিজ্ঞপ্তি বাতিল করে নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। সেখানে বলা হয়, ড্রাইভার পদে নিয়োগের জন্য অষ্টম শ্রেণী উত্তীর্ণ হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. এ এম ফারুকের সময় ভুয়া ও অসত্য তথ্য দিয়ে একাধিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভিসি হিসাবে অধ্যাপক শাহ ই আলম নিয়োগ পাওয়ার পর একটি কমিটি গঠন করে অভিযুক্তদের একটি তালিকা তৈরি করেন। ওই তালিকার আলোকে ৪ জনকে চাকরিচ্যুত এবং ১ জনকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার থেকে পদাবনতি দিয়ে সহকারী রেজিস্ট্রার করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই কমিটির মাধ্যমে ৪৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভিসির সাথে সম্পর্কের কারণে অনেককে অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। আবার অনেকের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকার পরও অভিযোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। ফলে তাদের পদোন্নতি আটকে আছে দীর্ঘদিন। বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, পরিচালক (পরিকল্পনা), পরিচালক (শরীর চর্চা)-এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এখনো শিক্ষকরা পালন করছেন। এ নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বাকৃবির নীতিমালায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বিধিমালা রয়েছে তা মানা হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে হেকেপের ৬ টি প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার গবেষণা কাজ চলার কথা থাকলেও গবেষণার চিহ্ন মাত্র শেকৃবিতে নেই । এ বিষয়ে ভিসির বক্তব্য জানতে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক হযরত আলী বলেন, আমরা দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি।