ম্যাকাও দুটির জুটি যেন না ভাঙ্গে

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:২২
অনেক বাছাইয়ের পর মনে মনে মন মিলেছিল। আর সেই মিলে যদি আসে ফাটল তবে কি আর মন ভাল থাকে? তাই মন কোনভাবেই মানছে না। মন খারাপ। আর মন খারাপ থেকেই অনশন শুরু। প্রিয়তমর দেখা নেই। তাই চারদিন খাওয়া বন্ধ। ঠোঁটে কোন শব্দও নেই। খাওয়া বন্ধ করেই মনের দুঃখ জানাচ্ছে স্ত্রী ম্যাকাওটি। ওর সঙ্গী এখন অন্য জায়গাতে খাঁচায় বন্দী। কোন দোষ না করেই বিচ্ছেদ। ভালই চলছিল সংসার। কোথা থেকে কি হলো তারা জানেই না। কিন্তু আলাদা হয়ে যেতে হলো। আকাঙ্ক্ষার ধন থেকে দূরে সরে যাওয়াতে দুইয়েরই মন খারাপ। ভালবাসা বলে কথা। দুর্লভ পাখি ব্লু গোল্ড ম্যাকাও। তিন বছর আগে তাদের সংসার শুরু। বাংলাদেশে প্রথম বাচ্চা ফুটিয়েছিল ওরা। সেই জুটি এখন আলাদা। আইন-আদালত আর ব্যক্তি ইচ্ছায় আলাদা থাকতে হচ্ছে ওদের। গতকাল বিকাল ৩টার দিকে হাতিরপুলে গেলে দেখা যায়, মেয়ে ম্যাকাওটি খাঁচায় নিঃসঙ্গ বসে। সত্যিই তার মন খারাপ। চুপ করে বসে আছে। কথা নেই। খাওয়া নেই। সঙ্গী বাছাইয়ের বেলায় ওরা বেশ ভিন্ন রকমের পাখি। শুধু মনের মত একটা সঙ্গী পেলেই সংসার পাতা ওদের স্বভাব। সে প্রমাণও মিলেছে এই দুই ম্যাকাওয়ের ক্ষেত্রে। ছেলে ম্যাকাওটি পাওয়ার পর তিন তিনটি মেয়ে ম্যাকাও আনতে হয়েছে জুটি করতে। প্রথম দুটিতে মন বসেনি। তৃতীয়ের সঙ্গে মেলে মন। এরপর সংসার। তিন তিন বার ডিম পাড়া। আর সে থেকে পাঁচটা বাচ্চার জন্ম দেয়া। এত কিছুর পর এখন আলাদা? তাও আবার আদালতের মাধ্যমে? এটা কেউই মানতে পারছেন না। তাই সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এই সংসারকে আবার মিলিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। যে কোন মূল্যে পাখি দুটিকে একসাথে রাখার ব্যবস্থা করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ.আ.ম.স আরেফিন সিদ্দিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর মোকসেদ আলী হাওলাদারসহ বিশিষ্টজনেরা। রাজধানীর হাতিরপুলে ছিল ওদের সংসার। চার বছর আগে মোহাম্মদ ইকরাম সেলিম পাখি বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল ওয়াদুদকে উপহার দেন ছেলে ম্যাকাওটি। আবদুল ওয়াদুদ পাখিটি পেয়ে একটি স্ত্রী ম্যাকাও নিয়ে আসেন। কিন্তু তার সাথে সে ম্যাকাও সংসার পাতেনি। পরে আরো একটা ম্যাকাও নিয়ে আসেন। কিন্তু সেটিতেও না। তিন নম্বর পাখিটির সাথে শুরু করে সংসার। তারপর একই খাঁচায় কাটছিল তাদের সংসার। হঠাত্ ইকরাম সেলিম তার পাখিটি নিয়ে যাওয়ার দাবি তোলেন। কিন্তু ম্যাকাও দুটির সংসার যাতে না ভাঙ্গে সে জন্য, পাখি দিতে অসম্মত হন আবদুল ওয়াদুদ। পাখি বিশেষজ্ঞ ড. ওয়াদুদ বলেন, পাখিটি যে আমার তা আমি বলছি না। উনি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। উপহারের জিনিস কেউ ফেরত চাইতে পারে তা আমার জানা ছিল না। বিষয়টি সেখানেও নয়। উনার ইচ্ছা হলে উনি নিয়ে যাক। কিন্তু সংসার ভেঙ্গে নয়। নিলে দুটো এক সঙ্গে নিতে হবে। এই পাখির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবে ওরা সংসার পাতে। গড়ে ২০ থেকে ২৫ জোড়ার মধ্যে মাত্র এক জোড়া সংসার পাতে। যে সংসার শুরু করেছিল এখানে তারা। যেহেতু একটি জুটি তৈরি হয়েছে তা ভাঙ্গা কোনভাবেই ঠিক হবে না। প্রয়োজনে উনি স্ত্রী ম্যাকাওটিও নিয়ে সুন্দর করে পালন করুন তাতে আমার কোন বাধা নেই। তবে তার এই পাখি পালন করার মত পরিবেশ আছে কিনা তা দেখতে হবে। মেয়ে পাখিটি নিতে চান মোহাম্মদ ইকরাম সেলিম। গতকাল যোগাযোগ করা হলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ম্যাকাও সহজে জোড়া বাঁধে না এটা ঠিক। এজন্য যদি মেয়ে ম্যাকাওটি উনি দিয়ে দেন তবে আমি তা নেব এবং তাদের সংসার সাজাতে বা সংরক্ষণ করতে যা যা করা প্রয়োজনে সবই করব। ম্যাকাও-এর প্রয়োজনীয় আবাসন তার বাড়িতে আছে বলেও তিনি জানান। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই পাখির মিলনে বিচ্ছেদ ঘটলে শেষ পর্যন্ত পাখি দুটির মৃত্যু হতে পারে। আগামী ১০ই জানুয়ারি ম্যাকাও দুটি এক সাথে থাকা নিয়ে আদালতে শুনানি আছে। গত বৃহস্পতিবার আদালতের রায়ের বলে পুলিশের সহযোগিতায় পুরুষ ম্যাকাওটি নিয়ে গেছেন ইকরাম সেলিম। একটি ম্যাকাও ৫০ থেকে ৬০ বছর বাঁচে। এর মধ্যে ২০ বছর সংসার করতে পারে। চার বছর বয়স থেকে সংসারী হয়। আর ডিমে তাওয়া দিয়ে বাচ্চা ফোটায় ২৮ দিনে। প্রতিদিন ১৮ পদের খাবার দিতে হয় এদের। একটি ম্যাকাও-এর দাম প্রায় দুই লাখ টাকা। কিন্তু যদি জোড়া বাঁধে তখন সেই জোড়ার দাম ৩৫/৪০ লাখ টাকা। এখানে পুরুষ পাখিটির জন্ম ১৯৯৭ সালে। স্ত্রী পাখিটি ওর পাঁচ বছরের ছোট। এদিকে কলাবাগান থানার এসআই মাসুদ সিকদারের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশে আমারা পাখিটি নিয়ে মালিককে দিয়ে দিয়েছি। ভবিষ্যতে আদালতের অন্য কোন নির্দেশ আসলে তা আমরা পালন করব।