নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিধান খসড়া আরপিওতে থাকছে না

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:২৩
সাংবিধানিক এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ক্ষমতাবলে আগামী সংসদ এবং প্রয়োজনে স্থানীয় নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের পক্ষে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিগত ৯টি জাতীয় নির্বাচনে কিভাবে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল তা খতিয়ে দেখে কমিশন এ বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে রাজনৈতিক দলের মতবিরোধ থাকায় এ নিয়ে বিতর্কে যেতে চায় না কমিশন। এজন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তি না করেই খসড়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে। আজকালের মধ্যে এই খসড়া ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর চিন্তা-ভাবনা করছে ইসি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, বিদ্যমান আইন এবং সাংবিধানিক ক্ষমতাবলেই নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করার সুযোগ রয়েছে। তবে ২০০১ সালে কেন সেনাবাহিনীকে আইন-শৃঙ্খলার সংজ্ঞায় রাখা হয়েছিল, আবার ২০০৯-এ কেন বাদ দেয়া হলো তা দেখা হচ্ছে। এছাড়া ২০০১ সালের আগে কিভাবে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয় তাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ২০০১ সালের ৮ আগস্ট ১ নং অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বিভাগকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে। পরে সরকার ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে সশস্ত্র বাহিনীর নাম বাদ দেয়। বর্তমানে নির্বাচনকালীন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় আছে পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, র্যাব, আনসার, বিজিবি ও কোস্টগার্ড। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৮, ১২৯ ও ১৩০ ধারা অনুযায়ী সংসদসহ সব ধরনের স্থানীয় নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা সম্ভব। ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৮, ১২৯ ও ১৩০ ধারায় বলা আছে, কোথাও কোন বেআইনি সমাবেশ হলে বা জনশৃঙ্খলা নষ্ট হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট অথবা পুলিশ বাহিনী তা ছত্রভঙ্গ করে দেবে। পুলিশ বাহিনী ব্যর্থ হলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর পুরুষ কর্মকর্তাদের সহযোগিতা কামনা করতে পারবেন। তারপরও ছত্রভঙ্গ করা না গেলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অথবা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তা ছত্রভঙ্গ করতে পারবেন। কমিশন থেকে সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের দাবি জানানো হলে সরকার তাতে সাড়া না-ও দিতে পারে। এর অংশ হিসেবে ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছিল। এ বিষয়ে কমিশন থেকে দুইটি চিঠি দেয়া হলে সরকারের পক্ষ থেকে সে চিঠির জবাব দেয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় বড় ধরনের কোন দাঙ্গা-হাঙ্গামা না ঘটলে নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের সুযোগ নেই। ইসির এক কর্মকর্তা বলেন, দেশব্যাপী একইদিনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কারণে ছয় লাখেরও বেশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেখানে সেনাবাহিনী বাদ দিয়ে এত বিপুলসংখ্যাক সদস্য মোতায়েন সম্ভব নয়। কমিশনের খসড়ায় নির্বাচনের জন্য সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সকল মন্ত্রণালয়ের বদলি, পদোন্নতি ও নিয়োগের ক্ষমতা ইসির হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার জন্য নির্ধারিত ফরমে কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এক শতাংশ সমর্থনসহ অন্যান্য বিষয় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। খসড়া প্রস্তাবে ব্যক্তি পর্যায়ে নির্বাচনী ব্যয়সীমা বর্তমানে ১৫ লাখ টাকা থেকে ২৫ লাখে ও প্রার্থীর জামানাত ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। বর্তমান আইনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের এক শতাংশ সমর্থনের বিধানটি তুলে দেয়ার পরিকল্পনা থাকলেও সদ্য সমাপ্ত সংলাপের পরে এমন অবস্থান থেকে সরে এসেছে ইসি। তবে সংলাপে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে আইন সংশোধনের প্রস্তাব করা হলেও কমিশন তা আমলে নেয়নি। সেক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার ফরমে কিছুটা সংশোধন করা হচ্ছে। একই দল থেকে একাধিক ব্যক্তি মনোনয়নপত্র জমা দিলেও দলীয় প্রধানের কাছ থেকে প্রতীক বরাদ্দের চিঠি পাওয়া প্রার্থী ছাড়া বাকিদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাবে। বর্তমানে বাকিদের বাতিল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও এখন তা উল্লেখ করা হচ্ছে। এছাড়া সংলাপে জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল দলীয় মনোনয়ন পেতে তিন বছরের বিধান বাদ দেয়ার প্রস্তাব করেছিল। খসড়া প্রস্তাবে এ বিষয়টি অপরিবর্তিত থাকছে। পাশাপাশি নবনিযুক্ত জেলা পরিষদের প্রশাসকসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর তিন বছর অতিক্রান্ত না হলে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ না পাওয়ার বিধানটিও অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। এর আগে ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন নির্বাচনী আইনের বেশকিছু সংস্কার প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠালেও তা গৃহীত হয়নি। তার মধ্যে অন্যতম ছিল সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পরে সরকারের জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার ও মন্ত্রী পরিষদ এই চারটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ইসির অধীনে চলে যাবে। বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পরপরই তাদের মতামতের জন্য এই প্রস্তাব ইসি’র কাছে ফেরত পাঠায় আইন মন্ত্রণালয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ ও অন্য চার কমিশনার কয়েকমাস আরপিও’র প্রতিটি ধারা বিশ্লেষণ করে এই প্রস্তাব তৈরি করেন।