বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মজুমদার মার্কেট নিয়ে দ্বন্দ্ব অথবা রাজনৈতিক কারণে খুন হতে পারেন বলে ধারণা করছে খুনের ঘটনার তদন্ত সংস্থা র্যাব ও পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে রফিকুল সর্বশেষ কাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন তার তালিকা র্যাব সংগ্রহ করেছে। তবে তার পরিবার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এই দাবির সঙ্গে একমত হতে পারছে না। তারা বলছে, পোশাক ও অস্ত্রসহ সবকিছু দেখে তারা নিশ্চিত হয়েছে বিশেষ বাহিনীই রফিকুলকে তুলে নিয়ে গেছে। এদিকে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ীরা গতকাল দোকান বন্ধ রেখে প্রতিবাদ করেছেন। এ সময় তারা সড়কে গিয়ে অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সামান্য ধাক্কাধাক্কি হয়। এদিকে রফিকুলের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ টাকা থাকলেও তা খোয়া যায়নি। পরিবারের কাছেই রয়েছে সেই টাকা। এই টাকার পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ।
গতকাল তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চৌধুরী আলম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রফিকুল। এ কারণে নিজের দলের মধ্যে কেউ তার শত্রু হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিলেন তিনি। এতে সরকারি দলের অনেকেই তার উপর নাখোশ ছিলেন। আর বঙ্গবাজারের কাছে নির্মিত ঢাকা সুপার মার্কেটের মালিকানা নিয়ে এর আগে ওই মার্কেটের মালিক দাবিদার ওয়াজিউল্লাহ নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পাঁচ নম্বর আসামি ছিলেন রফিকুল। বর্তমানে মার্কেটটি রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিটি পরিচালনা করছে। মার্কেট কমিটির সভাপতি আব্দুর রহমান এক সময় রফিকুল ইসলামের আস্থাভাজন ছিলেন। রফিকুল নিজেও মার্কেট কমিটির সহ-সভাপতি। কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে রফিকুলের সঙ্গে অন্যদের দ্বন্দ্ব চলছিল। তবে ঘটনা যেভাবেই ঘটুক না কেন র্যাবই যে রফিকুলকে ধরে নিয়ে গেছে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকার। তিনি বলেন, যে-ই রফিকুলের শত্রু হোক না কেন র্যাবকে তারা কাজে লাগিয়েছে। তিনি এর সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিচার চান। অন্যদিকে রফিকুলকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তার চালক ও ভায়রাকে কেনইবা র্যাব ধরে নিয়ে গেল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ তারা তো তখনো কারো কাছে অভিযোগ করেননি। তার আগেই কিভাবে র্যাব খবর পেল রফিকুলকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর তারা তদন্ত শুরু করে দিল। তাই র্যাবের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবারের সদস্যরা।
এদিকে মহানগর কমপ্লেক্স মার্কেটের সহ-সভাপতি রফিকুল ইসলাম মজুমদারকে হত্যার প্রতিবাদে ওই এলাকার অন্তত ৬টি মার্কেট বন্ধ রেখে বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ীরা। বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় গাড়ি ভাংচুর করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়া হয়। বেলা পৌনে ১২টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত গুলিস্তান থেকে শাহবাগ পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল বেলা পৌনে ১২টার দিকে নিহত রফিকুলের মরদেহ বঙ্গবাজার এলাকায় নেয়া হয়। এ সময় বঙ্গবাজার, এনেক্সো টাওয়ার, মহানগর কমপ্লেক্স, বঙ্গ ইসলামিয়া ও বরিশাল প্লাজাসহ আশপাশের মার্কেটগুলো বন্ধ করে ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমে আসেন। রফিকুলের জানাজা শেষে ব্যবসায়ীরা সড়ক অবরোধ করে রাখেন। দুপুর ১টার দিকে পুলিশের হস্তক্ষেপে ব্যবসায়ীরা রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ালেও দিনভরই দোকানপাট বন্ধ রাখেন।
শাহবাগ থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক আনোয়ারুল ইসলাম জানান, ব্যবসায়ীরা রাস্তায় ইট নিক্ষেপ করে ২/৩টি গাড়ি ভাংচুর করে। এক পর্যায়ে তারা আশপাশের মার্কেটগুলোতে ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকলে পুলিশ ধাওয়া করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের ধর্ম বিষয় সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম নান্নু জানান, বঙ্গবাজার, মহানগর, আদর্শ (এনেক্সো টাওয়ার) ও গুলিস্তান মার্কেটের দোকান সোমবার বন্ধ রাখা হয়। মঙ্গলবার মাকের্টগুলো খুলবে। বঙ্গবাজারের এনেক্সো টাওয়ারের মালিক সমিতির সহ-সভাপতি রফিকুল পোশাক ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। জাহাঙ্গীর আলম জানান, রফিকুলের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়েছে। উনি ব্যবসায়ীদের নেতা ছিলেন।
এদিকে ঝিনাইদহ থেকে ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, রফিকুল ইসলাম মজুমদার হত্যা ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোন মামলা হয়নি। শৈলকুপা থানার ওসি আব্দুল বারি জানান, মামলা দেয়ার জন্য নিহতের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তারা জানিয়েছেন, চাঁদপুর জেলার গ্রামে লাশ দাফন শেষে ফিরে এসে মামলা করবেন। কুমারখালী থানার ওসি আলি নেওয়াজ জানান, থানাতে একটি জিডি করে উদ্ধারকৃত লাশ কুষ্টিয়াতে ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী যে থানা এলাকায় ঘটনার সূত্রপাত সে থানাতে মামলা রেকর্ড হবে।
ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার পংকজ ভট্টাচার্য জানান, শৈলকুপা উপজেলা ও কুমারখালী উপজেলা এলাকাতে ঘটনা ঘটলেও এ হত্যার ষড়যন্ত্রের শিকড় ঢাকাতে। তিনি ধারণা করছেন, রাজধানীর বঙ্গবাজার মহানগর কমপ্লেক্স মার্কেটের কর্তৃত্বের ব্যাপারে সৃষ্ট শত্রুতা, ব্যবসায়িক শত্রুতা বা তার রাজনৈতিক শত্রুতার কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তদন্তে এ হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং কারা জড়িত তা বেরিয়ে আসবে বলে তিনি জানান।।
নিহতের বড় ভায়রা সাইদুর রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেছেন, শ্ব্বশুরবাড়ি এলাকায় তার কোন শত্রু ছিল না। তিনি শ্বশুর-শাশুড়ির থাকার জন্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে আনন্দনগরে টিনশেড আধাপাকা বাড়ি তৈরি করে দেন। বাড়িটি প্রোটেক্টেড, উঁচু প্রাচীর ঘেরা। সহজে কেউ ঢুকতে পারে না। তিনি আরো জানান, নিহত রফিকুল তার সাথে গল্পকালে অনেক কথা বলতেন। মার্কেট সংক্রান্ত অনেক কথাও বলতেন। সাথে করে আনা ব্যাগভর্তি টাকা পরিজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
শনিবার রাতে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার আদাবাড়িয়া-মনোহরপুর এলাকা থেকে হাতকড়া লাগানো অবস্থায় রফিকুলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঢাকার ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল শুক্রবার শ্বশুরবাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকুপার আনন্দনগরে যান। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে বিএনপি। এছাড়া ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি তিনদিনের শোক পালনের কর্মসূচি নিয়েছে। ওয়ার্ড কার্যালয়ে কালোপতাকা উত্তোলন করা হবে তিনদিন। রফিকুলের স্মরণে বুধবার বাদ আছর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ ীয় কার্যালয়ে দোয়া মাহফিল হবে।
