আগামী নির্বাচন কোন্ পদ্ধতিতে বা কোন্ সরকারের অধীনে হবে তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এখনো বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। দুদলের মধ্যে স্পষ্ট মতবিরোধ দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে দু’দলের মধ্যে বহুল আলোচিত সংলাপের কথাও বলা হচ্ছিলো। কিন্তু সে সম্ভাবনাও এখন ক্ষীণ। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিলো বলে জানিয়ে-ছিলেন। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া বিষয়টি নাকচ করে দেয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। সৈয়দ আশরাফ বলে-ছিলেন, নির্বাচন-কালীন সরকার নিয়ে বিএনপির সঙ্গে সংলাপ হচ্ছে। আর খালেদা জিয়া বলেছেন, তলে তলে নয়, আলোচনা হতে হবে প্রকাশ্যে। এরপর বিষয়টি আর এগোয়নি। মূলত বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আর সরকারি দলের অন্তর্বর্তী-কালীন সরকারের ফর্মুলার মধ্যে আটকে আছে বহুল আলোচিত এই সংলাপ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক সংকট প্রধান দুই দলের সৃষ্টি। সমাধানও করতে হবে তাদের। জনগণ এর দায় নেবে না।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেছেন, দু’দলের একগুঁয়েমির কারণে ওয়ান ইলেভেনের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো। তারা মতৈক্যে পৌঁছলে পরিস্থিতি এমন হতো না। এবারও প্রধান দুটি দল বিপরীত মেরুতে। সহসা সংলাপ করে মতৈক্যে না পৌঁছতে পারলে এবারকার পরিস্থিতি ওয়ান ইলেভেনের চেয়ে ভয়াবহ হবে বলে মনে করেন তিনি। দু’দল সংলাপে রাজি না হলে তৃতীয় কোন পক্ষ এতে মধ্যস্থতা করতে পারে কিনা?-এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, দেশের বাইরের কেউ মধ্যস্থতা করলে তা দেশের জন্য লজ্জাকর হবে। অতীতেও এ রকম মধ্যস্থতাকারীদের জাতি দেখেছে। কিন্তু তারা কোন ফল আনতে পারেননি। সেদিক বিবেচনা করে প্রধান দু’দলকেই আশু উদ্যোগ নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
এদিকে, আওয়ামী লীগ বলছে, দাবি নিয়ে আলোচনা করতে বিরোধী দলকে সংসদে আসতে হবে। দলটির সিনিয়র নেতারা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি রোডম্যাপ প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন। তবে সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবশ্যই নির্বাচিতদের নিয়ে গঠিত হতে হবে। কিভাবে সেই সরকার গঠন করা যায় সরকার তা নিয়ে বিরোধী দলের সাথে যে কোন মুহূর্তে আলোচনা করতে প্রস্তুত। যেহেতু দেশে সংসদ বহাল রয়েছে সেহেতু সংসদের অভ্যন্তরেই দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। অপরদিকে, বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলেছেন, আমরা চাই নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং একমাত্র এই নির্দলীয় সরকার নিয়েই সরকারের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হতে পারে। প্রস্তাবিত নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা এবং কতজন নিয়ে সে সরকার গঠিত হবে সে বিষয়ে আলোচনা হবে।
আওয়ামী লীগ যা বলছে-
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ইত্তেফাককে জানান, বিরোধী দলের দাবি সুরাহার জন্য তাদের আলোচনায় বসতে হবে। দু’পক্ষের মধ্যে সংলাপ ছাড়া সংকট থেকে উত্তরণের কোন উপায় নেই। তবে সেই সংলাপ হতে হবে সংসদ কেন্দ্রিক। এ প্রসঙ্গে তিনি অতীতের নজির তুলে ধরে বলেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর গোলাম আযমসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ছাড়াও বিভিন্ন দাবিতে তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সংসদ বর্জন শুরু করে। তখন বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই সংকট সমাধানের জন্য এক পর্যায়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই সময় সংসদে সরকারি দলের চিফ হুইপ খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে সংসদের অভ্যন্তরে আমার প্রথম বৈঠক হয়। পরে স্পিকারের কক্ষে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ আলোচনায় সরকারি দলের পক্ষে তত্কালীন সংসদ উপনেতা অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং বিরোধী দলের পক্ষে বিরোধী দলীয় উপনেতা আব্দুস সামাদ আজাদ নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘ আলোচনা শেষে উভয়পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে একটি প্রস্তাব গ্রহীত হয়। এ প্রস্তাবে সরকারি দলের পক্ষে উপনেতা অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও চিফ হুইপ খন্দকার দেলোয়ার হোসেন এবং বিরোধী দলের পক্ষে বিরোধী দলীয় উপনেতা আব্দুস সামাদ আজাদ ও আমি স্বাক্ষর করি। পরে প্রস্তাবটি সংসদে পাঠ করেন অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
মোহাম্মদ নাসিম জানান, পঞ্চম সংসদের মেয়াদের শেষ দিকে এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিরোধী দল লাগাতার সংসদ বর্জন শুরু করে। এ সময়ও তত্কালীন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার সংসদের অফিস কক্ষে গিয়ে বিরোধী দলীয় উপনেতা আব্দুস সামাদ আজাদ বৈঠক করেন। এরপর তত্কালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনার সংসদের বিরোধী দলীয় নেতার অফিসকক্ষে গিয়ে বৈঠক করেন স্পিকার শেখ আব্দুর রাজ্জাক। অচলাবস্থার এক পর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার স্টিফেন নিনিয়ান আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের জন্য ঢাকায় আসেন। তার সঙ্গে সরকারি ও বিরোধী দলের আলোচনার সূত্রপাত হয়ও সংসদের স্থায়ী কমিটির কক্ষে। এ আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দলের পাঁচজন করে প্রতিনিধি অংশ নেন। পরে আলোচনাস্থল স্থানান্তরিত হয় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায়।
আওয়ামী লীগের এই প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সংসদে একটি বিল পাস হয়েছে। এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি সংবিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
বিএনপি আলোচনার পক্ষে, তবে....
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার ইত্তেফাককে জানান, আলোচনা ছাড়া বর্তমান সংকট নিরসন সম্ভব না এটা আমরা বিশ্বাস করি। আমরা চাই ফলপ্রসূ আলোচনার ভিত্তিতে সরকার ও বিরোধী দল একটা সমঝোতায় উপনীত হোক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আমাদের দাবি ছিল। কিন্তু বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছি। আমরা চাই নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং একমাত্র এই নির্দলীয় সরকার নিয়েই সরকারের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হতে পারে। প্রস্তাবিত নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা এবং কতজন নিয়ে সে সরকার গঠিত হবে সে বিষয়ে আলোচনা হবে। তবে সে আলোচনা গোপনে নয়, প্রকাশ্যে হতে হবে। কিন্তু জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশে বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলছে বলে যে বক্তব্য সরকারি দলের নেতারা প্রচার করছেন তা ভিত্তিহীন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, সরকারের সঙ্গে এখন পর্যন্ত আমাদের কোন আলোচনার সূত্রপাতই হয়নি। আমাদের দাবি উপেক্ষা করে যদি নির্বাচন করা হয়, তবে সে নির্বাচন আমরা শুধু বয়কটই করবো না, হতেই দেবো না।
