আমার প্রিয় স্কুল

কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৪২
প্রাচীন বাংলার রাজধানী ছিলো কোতওয়ালীপাড়ায়। এই কোতয়ালী পাড়া থেকে কোটালীপাড়া। সেকালে বাংলার নবদ্বীপ, ভাটপাড়া, মূলাজোড়, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বিক্রমপুর ও কোটালীপাড়া ছিলো বিদ্যা-শিক্ষা তথা সংস্কৃত চর্চার জন্য উপমহদেশ বিখ্যাত। সেকালে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার জন্য উল্লিখিত এলাকার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে ভর্তি হতেন। কোটালীপাড়ায় এরকম একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলো, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ১৩১২ বঙ্গাব্দে বিখ্যাত গ্রাম উনশিয়ার দক্ষিণ প্রান্তে, দুর্গাধর ন্যায়ভূষণের বহির্বাটিতে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ছিলো আর্য বিদ্যালয়। পরে বিদ্যালয়টি কালীপ্রসন্ন চক্রবর্তীর বহির্বাটিতে স্থানান্তরিত হয় এবং আচার্য নিযুক্ত হন মহামহো পাধ্যায় সিদ্ধান্ত বাগীমা। পাল ও সেন আমলের পর সুলতানী পাটান, মোগল ও কোম্পানী আমলে সংস্কৃত চর্চা হ্রাস পায়। ইংরেজরা ক্ষমতা দখল করে রাজভাষা ফার্সীকে বিদায় করে দেয়। রাজকার্যে তখন ইংরেজি ভাষা এবং উপমহাদেশে ইউরোপীয়ানদের জ্ঞানচর্চা প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। কোটালীপাড়া তখনো বঙ্গের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, রাজনীতি, দর্শন ও জ্ঞান চর্চার পীঠস্থান। জমিদার, তালুকদার, চৌধুরী, সাহা ও কাজীরা তখন সমাজের আচার-আচারণ বিশেষভাবে সাধারণ মানুষকে বিদ্যানুরাগী হওয়ার জন্য একটি আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা অনুভব করেন এবং সেই লক্ষ্যে সর্বপ্রথম মদনপাড়, ডহরপাড়, পশ্চিমপাড়, পিনজুরী, কাশতলী, দিঘীরপাড়, আলিঠাপাড়া সোনাটিয়া দক্ষিণপাড়া, বালিয়াভাঙ্গা, গচাপাড়া, উনশিয়া, বাগান উত্তরপাড়, মাঝবাড়ী, কুশলা, মঠবাড়ী ও গোয়ালঙ্কের গন্যমান্য ব্যক্তিরা একটি সভায় মিলিত হন। ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন বাবু প্রতাপচন্দ্র চৌধুরী। সভায় স্কুল স্থাপনের দায়িত্ব দেয়া হয় শিক্ষাবিদ বাবু রাজেন্দ্র সেনগুপ্তকে। তিনি সাত সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করেন এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করে সমবেত প্রচেষ্টায় ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ২০শে জানুয়ারি স্কুলটি স্থাপন করা হয়। স্কুলটির নামকরণ করা হয় কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন। উল্লেখ্য, এই বিদ্যালয়টির পাঁচ বছর পূর্বে বরিশালের গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যলয় ও ১৪ বছর পূর্বে বরিশালের ব্রজমোহন উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের দশম শ্রেণির ছাত্র। আমি এই স্কুলে পড়তে পেরে গৌরব অনুভব করি। কারণ এই বিদ্যাপীঠটিতে উপমহাদেশের নামযাদা ব্যক্তিবর্গ পড়াশোনা করেছেন। এঁরা কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (কলকাতা ও ঢাকা), সাহিত্যিক, দার্শনিক, সমাজসেবী, শিল্পপতি, রাজনীতিক, সমাজসংস্কারক, চিকিত্সক, চিত্রশিল্পী, সিভিলিয়ান, স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিচারক এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক ও সংগঠক। আমাদের ইনস্টিটিউশনটি কোটালীপাড়া সদর থেকে দক্ষিণে বালিয়াভাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত। স্কুল ও উপজেলার সদস্য হাসপাতালের মাঝে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাবা শেখ লুত্ফর রহমান সরকারি মহাবিদ্যালয়টি অবস্থিত। আমাদের বিদ্যালয়টির চতুর্দিকে রয়েছে পাকা সড়ক। যাতায়াতের কোন অব্যবস্থা নেই। এক সময় ছিলো টিনের ঘর। এখন ত্রি-তল ভবন। ভবনের সামনে বিস্তৃত খেলার মাঠ। লাইব্রেরী, বিজ্ঞান কক্ষ, ছাত্রাবাস, স্কাউটিং কোন কিছুই অভাব নেই। স্কুলটি পাইলট প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আমরা সবকিছুই পাচ্ছি। উল্লেখ্য বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার মাত্র ২ বছর পর ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এটিকে চিরস্থায়ী মঞ্জুরী দেয়। শুধু তাই নয় ঐ সময় পূর্বাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসার কষ্ট লাঘবের জন্য অদূরে গচাপাড়ায় এ স্কুলের শাখা স্বরূপ একটি মাইনর স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিদ্যালয়টির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট ও মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার ফল সব সময় ভালো। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের তথাকথিত দেশবিভক্তি স্কুলের উপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। স্থানীয় বিদ্যানুরাগী হিন্দুরা কলকাতা চলে যান। তখন স্কুলটির হাল ধরেন সমাজ সংস্কারক কাজী বেলায়েত হোসেন। তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তাঁর পরিচালনায় প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত কোন সরকারি অনুদান না নিয়ে টিকে থাকে। বর্তমানেও তাঁর পুত্র শিল্পপতি কাজী আকরাম উদ্দীন আহমদ এই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি। তিনি দেশের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। তিনিও এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তার বড় ভাই কাজী আশরাফ উদদীন টুকু কাজী স্কুলটির পারিচালনায় বিশেষ অবদান রাখেন। আমাদের স্কুলের অনেকেই প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এর মধ্যে প্রথম প্রধান শিক্ষক রাইচরণ চক্রবর্তী, শৈলেনচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, অমলচন্দ্র চৌধুরী, সুনীল কুমার করগুপ্ত আনোয়ার হোসেন ও বর্তমানের প্রধান শিক্ষক হিমাংশু কুমার পান্ডের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। আমাদের স্কুলে অনেকেই পড়াশোনা করেছেন। সমাজে তারা নামজাদা ব্যক্তি। স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। মুক্তিযোদ্ধাও অনেকে। এদের মধ্যে নিবারণ সমাজপতি, অধ্যাপক কালিপদ শান্ডিল্য, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, ড. ধীরেন্দ্রনাথ সেন, ড. দুঃখহরণ চক্রবর্তী, কবি শান্তিময় শীল, সৈয়দ আহমদ বেগ, মুন্সী নেসারউদ্দিন, রেলওয়ে কর্মকর্তা সিরাজউদ্দিন আহমেদ, ডা. শামসুদ্দিন মিয়া, কাজী হারুনর রশীদ, কাজী বজলুর রশীদ, বিচারপতি বজলুর রহমান তালুকদার, ফজলুর রহমান তালুকদার, শহীদ গোলাম আলী, অধ্যক্ষ গৌরাঙ্গলাল চৌধুরী, মো. ইকবাল হোসেন মোল্লা, অধ্যাপক হারুণ-অর-রশিদ, এ্যাড. রেজাউল করিম, ডা. শামীমুজ্জামান, জজ শেখ আকবর আলী, এ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন সরদার, সরোয়ার হোসেন তালুকদার প্রমুখ। বর্তমানে স্কূল পরিচালনা কমিটির সদস্যরা হলেন: রাজা আলী তাজ, এসএম মহিউদ্দীন, এস এম আতিয়ার রহমান, আবদুর রব হাজরা ও মো. লিয়াকত আলী মোল্লা। আগামী ২০ জানুয়ারি আমাদের স্কুলটির জন্মদিন। এদিন স্কুলটির বয়স ১১৪ বছর পূর্ণ হবে। শতবছর পূুর্তি উপলক্ষে কলকাতায় ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে কোটালীপাড়া সম্মিলনী একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। আয়োজনকারী সম্মিলনীর সবাই এ স্কুলের ছাত্র। আশার কথা— আমাদের স্কুলেও শতবর্ষ উদযাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহবায়ক মনোনীত হয়েছেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র মো. লিয়াকত আলী মোল্লা। শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও এ উপলক্ষ্যে ‘সোনালী ইতিহাস’ শিরোনামে একটি স্মারকপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। স্কুলের প্রাক্তন যে কোন ছাত্রছাত্রী এতে লিখতে পারবেন। কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন সুদীর্ঘকাল শিক্ষার আলো ছড়াবে এটাই আমার প্রত্যাশা।