আমার প্রিয় বই

ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৪৩
এবার জেএসসি পরীক্ষা শেষে ভাইয়া তার প্রিয় লেখক হুমায়ুন আজাদের ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’ বইটি এনে দেয়। ‘কেমন লাগলো জানাবি। জাপানী ভাষায় অনুবাদ হয়েছে বইটি’—গর্বের সাথে বললো ভাইয়া। প্রচ্ছদ দেখেই মনে হলো যেন শৈশবের ভাইয়া বসে আছে ছবির মতো সুন্দর গ্রামে। যতই পড়ি শৈশবের দিনগুলো আয়নার মতো ক্রমাগত কাছে আসতে থাকে। পড়ার সময় রফিকুন নবীর আঁকা নিপুণ ছবিগুলো মিলিয়ে নিলে গল্পের মৌলির মতো (যাকে লেখক তার শৈশব-কৈশোরের গল্প বলেছেন) শহুরে যে কেউ অনায়াসে মিশে যেতে পারবে গ্রামের কচুরি ফুলে, বাঁশের পুলে, খেজুর ডালের ঘোড়ায়, মাছরাঙার ডানায়, টিনের চালে বৃষ্টির শব্দে, সাদা বেলুনের মতো চাঁদে। হারিয়ে যেতে পারবে ওস মাখা মাঠে, লাউয়ের ডগায়, রঙিন মেঘে, ধানের শীষে, শিশির কুয়াশায়। খেলতে পারবে পুকুরের জলে, ছোট্ট নৌকায়, মেঠোপথে, কাশফুলে, জোনাকির আলোতে, সর্ষে আর কুমড়ো ফুলের হলুদ সাগরে। খেজুর রস, তাজা ইলিশ, মায়ের হাতের রূপসী আর মিষ্টি পিঠা, মধুর মতো ভাত, দুধ-শবরি কলা মাখা ভাতের স্বাদ মিশে রয়েছে গল্পের পাতায় পাতায়। সহজ ভাষায় আবেগী বর্ণনায় অপূর্ব চিত্র ফুটে উঠেছে লেখকের ফেলে আসা শ্রেষ্ঠ ফুল— তার গ্রামটির। পুকুরভরা কচুরি ফুল, যেন প্রদীপ জ্বলছে—এমন সৌন্দর্য বাংলার গ্রাম ছাড়া আর কোথায় আছে! ‘দুই ভাই’ গল্প গ্রামের সহজ-সরল মানুষের মাটি-ঘনিষ্ঠ জীবনযাত্রার এক জীবন্ত ছবি। লেখক অসাধারণ গল্পগুলোতে তার গ্রাম রাড়িখাল ছাড়াও ভাগ্যকুল, কামারগাঁ ইত্যাদি আশপাশ গ্রামগুলো তুলে এনেছেন। গ্রামের মানুষের জীবনচিত্র এঁকেছেন—খেজুর গাছ কাটা গাছি, কৃষক, জেলে, তাঁতি, রাখাল, পণ্ডিত বাবু, মুনশি সাবদের কথা বলেছেন। গল্পে গল্পে বলেছেন জমিদার বাড়িগুলোর কথা, তার গ্রামের গর্ব মহাবিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর কথা। মেলার গল্পে আছে ঐতিহ্যবাহী সার্কাসের কথা—বাঘ, হাতি, জোকারের খেলা আর দম বন্ধ হয়ে যাওয়া ত্রিফলা বর্শার খেলা। বলেছেন জাদু আর যাত্রাপালার কথা। বাদ পড়েনি গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আর কুসংস্কারের কথাও। ভ্রান্ত বিশ্বাস, অবহেলায় যখন চিকিত্সার অভাবে তার প্রাণপ্রিয় ছোট ভাইটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো, আমি তখন চোখের জল আটকে রাখতে পারিনি। গল্পের ছলেই বলেছেন নগরায়ণের দুষ্টচক্রে গ্রামগুলোর বদলে যাওয়ার কাহিনী—গ্রাম মরে যাওয়ার কাহিনী। বইটি পড়তে পড়তে তখন আমারও মনে হয় যেন বেড়ে উঠেছি কোন মরা গ্রামে। পূর্বে গ্রামগুলো কত সুন্দর ছিল জেনে আক্ষেপ হতে থাকে। ভীষণ অভাববোধ করতে থাকি অনাবিল সবুজ মাঠ-ভিটা, কাঁচা রাস্তা, খাল-পুকুর-বিল-ঝিল ঘেরা গ্রাম আর গ্রামের মানুষের সরল-অকপট জীবনযাত্রা। আমার কিশোর মনের প্রতিটি অলি-গলিতে সুখে, দুখে, স্বপ্নে ভ্রমণ করতে থাকে গল্পগুলো। এক সময় স্বপ্ন দেখায় বড় হতে, জগদীশচন্দ্র বসুর মতো অনেক বড় হতে। গ্রামকে ভালবাসতে, মানুষকে ভালবাসতে চেতনা জাগায়। বাংলা সাহিত্য কেন বিশ্ব সাহিত্যে এমন শিশুতোষ বই কি আর আছে! আমার মনে হয় বইটি পড়লে সবার প্রিয় বই হিসেবে এটি স্থান দখল করে থাকবে।