সংবিধানে ৩৯ (২) ধারা অনুযায়ী স্বাধীন ও নির্ভীক ভাবে স্বীয় মতামত গণমাধ্যমে প্রকাশ করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ অধিকারের সফল বাস্তবায়ন ছাড়া গণতন্ত্র সফল হতে পারে না। গণমাধ্যমেই জনমতের প্রতিফলন ঘটে, উঠে আসে সরকারের দোষ-ত্রুটি, সফলতা ও ব্যর্থতা। গণতান্ত্রিক সরকার গণমাধ্যমের সমালোচনা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বীয় দোষ-ত্রুটি শোধরানোর ব্যবস্থা করবেন। গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় সংবাদপত্র বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ স্বাধীনভাবে প্রকাশ-প্রচার করবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতারোহীরা তাদের আমলে গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলে দাবি করলেও বাস্তবে সব সরকারই নগ্ন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে লুণ্ঠন করেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী প্রতিটি সরকারই বিটিভিকে স্বদলীয় দরবার শরিফে পরিণত করার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে আসছে। পীর-মুর্শিদের দরবার শরিফের আলোচনায় যেমন পীরের গুণ-কীর্তন ছাড়া অন্য কোনো বিষয় স্থান পায় না—ঠিক একইভাবে বিটিভিতে সমকালীন সরকারের অতিরঞ্জিত প্রশংসা আর সফলতা ছাড়া সরকারের প্রতি জনগণের প্রদত্ত সতর্কতা বা পরামর্শ কোনোটিই প্রচার করা হয় না।
বর্তমান সরকারের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু মহাজোট সরকারের চার বছরে গণমাধ্যমের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ করা হয়নি বলে দাবি করলেও বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ উলটো। মহাজোট সরকারের শাসনামলেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে চ্যানেল ওয়ান। বেসরকারি কয়েকটি টেলিভিশন বিরোধী দলীয় মহাসমাবেশ সরাসরি সমপ্রচার করার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেও ক্ষমতাসীনদের অবৈধ হস্তক্ষেপের কারণে শেষ পর্যন্ত সমপ্রচার করা সম্ভব হয়নি। সরকারের সমর্থনপুষ্ট দলীয় নেতাদের হুমকিতে দেশের স্বনামধন্য পত্রিকার বহু সাংবাদিক এলাকাছাড়া এবং জনস্বার্থে সত্য সংবাদ পরিবেশন করে প্রাণনাশের আতংকে ভুগছেন। সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করায় সরকার দলীয় এক কর্মী জাতির ক্রান্তিকালের কাণ্ডারী সাংবাদিকসমাজকে জ্ঞানপাপী হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। কলমসৈনিকেরা জনগণের দুঃখ-দুর্দশার যে চিত্র তুলে ধরেন তাতে সরকারের ব্যর্থতা, দোষ-ত্রুটি আসাটা স্বাভাবিক। তাই বলে তাঁরা জ্ঞানীপাপী হিসাবে আখ্যায়িত হবেন কেন? যিনি গড়তে জানেন তিনি শিবও গড়তে পারেন, বাঁদরও গড়তে পারেন। সাংবাদিকরা যেমন সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করেন তেমনি সরকারের সফলতার খবর তাঁরাই জনগণের কানে পৌঁছে দেন। গণমাধ্যমের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের বদনাম শুধু এ সরকারের নয় বরং বিগত সময়ে ক্ষমতারোহী সরকারগুলোও এ অগণতান্ত্রিক কাজে মোটেও পিছিয়ে ছিল না।
১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তান টেলিভিশনের উদ্বোধন করতে এসেছিলেন। একই দিনে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ফাতিমা জিন্নাহ ঢাকায় সমাবেশ করেছিলেন। স্বৈরশাসনবিরোধী হাজার হাজার জনতা সেদিন ফাতিমা জিন্নাহর সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছিল। হাজারও মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ফাতিমা জিন্নাহর প্রতিবাদ সমাবেশের কোনো চিত্র সেদিন পাকিস্তানে টেলিভিশনে প্রচার করা হয়নি। প্রচার করা হয়েছিল হাতেগোনা মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন লোক নিয়ে অনুষ্ঠিত আইয়ুব খানের ঘরোয়া সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি। স্বৈরশাসনবিরোধী সমাবেশ প্রচার হয়নি বলে জনগণ আইয়ুব খানকে গ্রহণ করে নিয়েছিল এমন নয় বরং জনগণ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে আইয়ুব খানের পতন ঘটিয়েছিল। গণমাধ্যম হলো গণমানুষের কণ্ঠ। শাক দিয়ে যেমন মাছ ঢাকা যায় না তেমনিভাবে গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ করে জনগণের কণ্ঠকে রোধ করা যায় না বা ক্ষমতার মসনদে খুব বেশি সময় টিকে থাকা যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
