পিরোজপুরে ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত কান্দিবেড় পদ্ধতির সবজি চাষ

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৬
পিরোজপুরের উত্তরাঞ্চলে কান্দিবেড় পদ্ধতির শীতকালীন শাক-সবজি চাষের এখন ভরা মৌসুম। তবে শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কবলে পড়ে এ বছর সবজি চাষ মারাত্মক ফলন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। কৃষকদের ধারণা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কয়েক বছর ধরে তারা এ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন যা এ বছর প্রকট আকার ধারণ করেছে। গত সোমবার জেলার নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ী দোবরা ও কলারদোয়ানীয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় সরেজমিনে শাক-সবজি ফলনের এই দুর্দশা দেখা গেছে। এ দুটি ইউনিয়ন সন্নিহিত দীর্ঘা ও মালিখালী এবং পার্শ্ববর্তী বানারীপাড়ার বিশারকান্দি ও ইলুহার এবং স্বরূপকাঠির বলদিয়া ইউনিয়নে দীর্ঘকাল ধরে কান্দিবেড় পদ্ধতিতে শাক-সবজি চাষ প্রচলিত। নাজিরপুর উপজেলার চারটি ইউনিয়নেই ১০১০ হেক্টর জমিতে ১৮১৮০টি কান্দিতে ২৩ রকমের শাক-সবজি চাষ হয় রবি ও খরিফ মৌসুমে। যার মধ্যে নভেম্বর মাস থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, লাউ, করলা, মরমা (শশা বিশেষ), আলু, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শালগম, টমেটো, বেগুন, পেঁপে, সীম, মরিচ ইত্যাদি চাষ হয় ব্যাপকভাবে। জোমাটির সাথে পলি পড়ে গঠিত বিশেষ ধরনের ভূমিতে কান্দি বা আল কেটে চাষের বেড় তৈরি হয়, মাঝে থাকে বেড় বা ড্রেন। ১০/১২ ফুট চওড়া এবং নানা আকারের দৈর্ঘ্য। এসব কান্দিতে শীত মৌসুমে কৃষকরা নানা জাতের শাক-সবজি, মসলা ও আখ চাষ করে। দেউলবাড়ী দোবরা ইউনিয়নের বিল ডুমরিয়া গ্রামের ধনি কৃষক শাহাবুদ্দিন বাহাদুর (৬৫) জানান, তার মালিকানায় ১০০ রশি (এক রশি সমান ১৮০ ফুট) কান্দি বেড় রয়েছে। যার সংখ্যা দেড় শতাধিক। তিনি নিজে ১৬টি কান্দি চাষে রেখে বাকিগুলো বার্ষিক লিজ দিয়েছেন। ১৬টি কান্দিতে ১১ রকমের শাক-সবজি চাষ করেছেন। যেখানে তার বিনিয়োগ লক্ষাধিক টাকা। চলতি শীত মৌসুমেও আগের দুই-তিন বছরের মত তার নিজের ও প্রতিবেশীদের ক্ষেতে কুয়াশা ও শীতের কারণে ভাইরাস লেগে মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, বেগুন ইত্যাদির কড়া ছোট অবস্থায় পচে যাচ্ছে। পাশাপাশি বেগুনক্ষেতে বুলবুলি পাখির উপদ্রব দেখা দিয়েছে। প্রবীণ কৃষক শাহাবুদ্দিনের ধারণা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কুয়াশা মারাত্মকভাবে দেখা দিয়েছে। মধ্য গাওখালী গ্রামের তরুণ কৃষক এমরান দেখালেন মরমার কড়াগুলো কিভাবে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পচে যাচ্ছে। পাশেই প্রবীণ কৃষক কদম আলী (৬০), স্ত্রী কোহিনূর বেগম (৫২) ও কন্যা তানিয়াকে (১০) নিয়ে আলুচাষের জন্য জমি তৈরি করছিলেন। তিনি বলেন, এ বছর ১২ রশি কান্দিবেড় করে মোটা লোকসানে পড়েছেন। ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে আসল তো দূরের কথা উল্টো পুঁজি হারানোর দশা। ফাল্গুন মাসে দক্ষিণা বাতাস ফিরলে করল্লা ফলন বাড়ার আশায় বসে আছেন তিনিসহ গ্রামের অনেক চাষি। এখানেই আলাপ হয় মুগারঝোর গ্রামের আরেক চাষি সাখাওয়াত হোসেনের (৫০) সাথে। তিনি ভাইরাস আক্রান্ত চাল কুমড়া গাছ কেটে নৌকায় করে নিয়ে যাচ্ছিলেন আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার জন্য। তিনি বলেন, ভাইরাস বা ছত্রাক সংক্রামক বলে গাছগুলো পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। একই গ্রামের কৃষক সংগঠক আক্তার হোসেন (৩৫) বললেন, এ দুটি ইউনিয়নে ব্যাপকভাবে ছত্রাক ছড়িয়ে পড়ায় শত শত কান্দিবেড় চাষি ফলন বিপর্যয়ের কবলে পড়েছেন। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রমানন্দ মণ্ডল বলেন, কুয়াশার কারণে ‘লেট ব্লাইট ও ‘আরলি ব্লাইট’ নামে মৌসুমের শুরু ও শেষে এক ধরনের ছত্রাকের প্রাদুর্ভাব ঘটছে কান্দিবেড় এলাকায়। এ রোগের কবল থেকে ফসল বাঁচাতে চাষিদের ডায়কেন এম-৪৫, ইন্ডোফিল-৪৫, নিউবেন ইত্যাদি নামের ওষুধ এবং পানি স্প্রে করার জন্য কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। দেউলবাড়ী দোবরা ইউনিয়নে কৃষকদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইনসিডিনের আপরার প্রকল্পের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী কৃষিবিদ মো. শাহজালাল বলেন, ছত্রাক ছাড়াও মোজাইক ভাইরাস নামে এক ধরনের পরজীবীরও আক্রমণ লক্ষ্য করা যায় কান্দিবেড় পদ্ধতির শাক-সবজির চাল কুমড়া, মরমা ইত্যাদিতে যা কুয়াশারই প্রভাব। তবে তার ধারণা শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ঘন কুয়াশা বা শৈত্যপ্রবাহ বাড়ছে না তা স্বাভাবিক ঋতু আবর্তন।