তীব্র শৈত্য প্রবাহের কবলে দেশ

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৫০
কনকনে ঠান্ডায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। পাবনা, ইশ্বরদী ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের উপর দিয়ে তীব্র শৈত্য প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার উপর দিয়ে যাচ্ছে মাঝারি ধরনের শৈত্য প্রবাহ। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ইশ্বরদীতে ৪ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি মওসুমে এটিই সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। রাজধানী ঢাকাও শৈত্য প্রবাহের আওতায় চলে এসেছে। মঙ্গলবার ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, তাপমাত্রা নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বাকাশের অতি শীতল জেট বায়ুও বাংলাদেশের উপর সক্রিয় হওয়ায় একের পর এক জনপদে শীত জেঁকে বসেছে। এই পরিস্থিতি আরও দুই থেকে তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শীতজনিত রোগে ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গৃহহীন, বৃদ্ধ ও শিশুরা ঠান্ডায় বেশি কষ্ট পাচ্ছে। ঘন কুয়াশায় নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সৃষ্ট উচ্চ চাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় উত্তরের কনকনে শীতল বায়ু দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ছে। মূলত এ কারণেই চলতি মওসুমের দ্বিতীয় দফা এই শৈত্য প্রবাহের সূচনা হয় গত ৫ জানুয়ারি থেকে। পরবর্তীতে ঊর্ধ্বাকাশের জেট বায়ু নিচে নেমে এসে বাংলাদেশের উপর সক্রিয় হওয়ায় উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলায় শৈত্য প্রবাহ এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। জেট বায়ু সম্পর্কে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সাধারণত শীতকালে এই ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। এই জেট বায়ু ৩৫ থেকে ৪০ হাজার ফুট উপরে থাকে। শৈত্য প্রবাহের সঙ্গে এর একটি সম্পর্ক আছে। এটি নেমে আসলেই শৈত্য প্রবাহ তীব্র হয় বা এর বিস্তৃতি ঘটে। মঙ্গলবার বাংলাদেশের উপর এই বায়ু ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় সক্রিয় ছিল। এ কারণে ঝাপটা আকারে কনকনে ঠান্ডা বাতাস অনুভব করা যাচ্ছে। এই বাতাস মানুষের শীতের অনুভূতিকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ঈশ্বরদীতে ঈশ্বরদী সংবাদদাতা জানিয়েছেন, আবহাওয়া অফিস গতকাল মঙ্গলবার পাবনার ঈশ্বরদীতে এ বছরের দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে ৪.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সোমবারে ঈশ্বরদীর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা প্রায় ৭ ডিগ্রি হ্রাস পাওয়ায় জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। হিমেল বাতাস শরীরে তীরের মতো বিদ্ধ হচ্ছে। ২০০৮ সালে ঈশ্বরদীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৬.২ ডিগ্রি, ২০০৯ সালে ৬.০ ডিগ্রি, ২০১০ সালে ৬.৮ ডিগ্রি, ২০১১ সালে ৪.৬ ডিগ্রি, ২০১২ সালে ৬.৫ ডিগ্রি। তীব্র শৈত্য প্রবাহ ও ঘন কুয়াশার পাশাপাশি বইছে উত্তরের হিমেল হাওয়া। দুপুরের দিকে কিছু সময়ের জন্য সূর্যের মুখ দেখা গেলেও বিকেল ৩টার পর আবারো নেমে আসে কুয়াশাচ্ছন্নতা। রাজধানী ঢাকার অবস্থা রাজধানীবাসী গতকাল ছিলেন শীতে কাহিল। মৃদু শৈত্য প্রবাহ ও জেট বায়ুর প্রভাবে ঠান্ডা ছিল হাড় কাঁপানো। বিশেষ করে বাতাসের ঝাপটা ছিল অসহনীয়। সকালের দিকে অনেক এলাকায় মানুষকে আগুন পোহাতে দেখা যায়। এই ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি কষ্টের মধ্যে পড়ে গেছে মহানগরীর বস্তিবাসী নিম্নবিত্ত মানুষেরা। আমাদের স্টাফ রিপোর্টার দিনাজপুর থেকে জানিয়েছেন, হিমালয়ের কোল ঘেঁষে বৃহত্তর দিনাজপুরে ৩টি জেলা পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও এবং দিনাজপুরে শৈত্য প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে নামছে এবং বাতাসের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। জীবননগর সংবাদদাতা জানিয়েছেন, গত দুই দিনে শীতজনিত রোগে উপজেলায় ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতরা হলেন গয়েশপুর গ্রামের ভিকু মন্ডল (৭৫), ফকির মোহাম্মদ (৮০), কাটাপোল গ্রামের মতিয়ার রহমান (৫০), তেঁতুলিয়া গ্রামের হামিদা খাতুন (৬৫), বসুতিপাড়ার হাতেম আলী (৫৫) ও খয়েরহুদা গ্রামের কহিনুর বেগমের (৮০)। সাঘাটা (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, প্রবল শীতে সেখানে ৪ জন মারা গেছেন। এরা হলেন উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের আফজাল হোসেন মন্ডল (৬০), শিমুলতাউড় গ্রামের গফুর আলী (৭৫), রাঘবপুর গ্রামের আঃ রাজ্জাক (৬৫) ও দুর্গাপুর গ্রামের বুলু সরকার (৫৫) । রাজীবপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, সেখানে ঠান্ডাজনিত রোগে একজন মারা গেছেন। মৃত ব্যক্তি হলেন সাজাই গ্রামের ওসকর আলী (৭০)। জামালপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জামালপুরে তীব্র শীতে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তিরা হলেন দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সানন্দবাড়ী পশ্চিমপাড়ার রোস্তম আলী (৮০) ও বকশীগঞ্জ উপজেলার সওদাগর পাড়ার লাল মিয়া (৫৫)। রংপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ২য় দফা শৈত্য প্রবাহে জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। সেই সাথে দেখা মিলছে না সূর্যের। অব্যাহত ঘন কুয়াশাপাত ও কনকনে শৈত্য প্রবাহ এবং গত দু’দিন থেকে সূর্যের দেখা না মিলায় সৃষ্ট হাড় কাঁপানো শীতে মানুষের পাশাপাশি কাবু হয়ে পড়েছে গবাদি পশু-পাখি। চলতি শীত মৌসুমের মধ্যে গত সোমবার রংপুর অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল। সোমবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং গতকাল ছিল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৫ ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সিলেট অফিস জানিয়েছে, সিলেট বিভাগের সর্বত্র তীব্র শীত পড়েছে। মধ্যে দু’তিন দিন বিরতি দিয়ে আবার যেন সিলেটে শীত ঝেকে বসেছে। বেলা বাড়লেও সূর্যের দেখা মেলে না। গতকাল সিলেটে তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ১২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে ।