বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বাম রাজনীতির আদর্শে আমৃত্যু অবিচল রাজনীতিক নির্মল সেন আর নেই। সাম্যের বাংলাদেশ গড়ার আজীবন স্বপ্ন ছিল তার। গতকাল মঙ্গলবার ল্যাবএইড হাসপাতালে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। নির্মল সেনের মরদেহ ল্যাবএইড হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতীয় পার্টি জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নির্মল সেন তার দেহ ও চোখ হাসপাতালে দান করে গেছেন। তাই তার দেহ দাহ করা হবে না। তবে আজ বুধবার তার জন্মস্থান গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় তার মরদেহ শেষবারের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে সর্বস্তরের শ্রদ্ধানিবেদন শেষে আজই তার মরদেহ ঢাকায় নিয়ে আসা হবে। এরপর সর্বস্তরের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য আগামীকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাব ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে। তার জন্মস্থান কোটালিপাড়া থেকে আসা আত্মীয়-স্বজনদের শেষ দেখার সুযোগ করে দিতে আজ কোন কর্মসূচি রাখা হয়নি।
চিরকুমার নির্মল সেন ছিলেন বামপন্থি শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দলের নেতা। তার মৃত্যু সংবাদে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। সবাই ছুটে যান রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে। তাকে শ্রদ্ধা জানাতে হাসপাতালে ছুটে আসেন তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, নারীনেত্রী শিরীন আখতার, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, বরকতুল্লাহ বুলু, বাসদের সভাপতি খালেকুজ্জামান, ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য হায়দার আকবর খান রনো, শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দলের নেতা মোসাদ্দেক হোসেন প্রমুখ।
ল্যাবএইড হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে নির্মল সেন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ২৫ ডিসেম্বর থেকে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। ল্যাবএইডে নির্মল সেন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. সাইদুল ইসলাম ও নিওরোলজি বিভাগের ডা. সিরাজুল হকের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। ল্যাবএইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, ২০১০ সাল থেকে ল্যাবএইড নির্মল সেনের চিকিত্সার ব্যয় বহন করছে। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার দীঘিরপাড় গ্রামে নিজ বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরেই বসবাস করছিলেন নির্মল সেন। গত ২৩ ডিসেম্বর গ্রামের বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে উন্নত চিকিত্সার জন্য ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সব আন্দোলন-সংগ্রামই সামনের সারিতে ছিলেন নির্মল সেন। ২০০৩ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত রোগে আক্রান্ত হন নির্মল সেন। এরপর তিনি দেশে ও বিদেশে চিকিত্সা নিয়েছেন।
নির্মল সেন ১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার দীঘিরপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। তার পিতার নাম সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত এবং মায়ের নাম লাবণ্যপ্রভা। দেশ বিভাগের সময় মা-বাবা এবং ভাইবোনসহ পরিবারের সবাই বাংলাদেশ ত্যাগ করে কলকাতা চলে গেলেও মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালবাসায় সিক্ত নির্মল সেন এদেশে থেকে যান। বাবা মা চলে যাওয়ার পর ঝালকাঠিতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বড় হন তিনি। ঝালকাঠি জেলার কলসকাঠি বিএম একাডেমী থেকে ১৯৪৪ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। বরিশাল বিএম কলেজ থেকে আইএ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ও এমএ পাস করেন। ১৯৪২ সালে নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে যোগ দিয়ে রাজনীতি শুরু করেন। রাজনৈতিক কারণে ১৬ বার কারাবরণ করতে হয়েছে তাকে। ১৯৫৯ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সহ-সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতার মাধ্যমে তার কর্মজীবনের শুরু। এরপর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে কাজ করেন তিনি। ১৯৯৭ সালে দৈনিক বাংলা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ওই পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও তিনি। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অতিথি শিক্ষক ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টি জেপির শোক
রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান তার শোকবার্তায় বলেন, সাংবাদিক, রাজনীতিক নির্মল সেনের অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তায় দেশের সাংবাদিকতা ও রাজনীতিতে তার অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং তার আত্মার মুক্তি কামনা করেন।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ নির্মল সেনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম। এক বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, তিনি একজন ত্যাগী রাজনীতিবিদ ছিলেন এবং তার সীমিত সাধ্য নিয়ে জনগণের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় নির্মল সেনের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।
এছাড়াও শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি। এছাড়া তারপ্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ, সাধারণ সম্পাদক আবদাল আহমেদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যবৃন্দ।
