৪৫ বছরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা দিনাজপুরে ৩.২ ডিগ্রি

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:০৩
সর্বনিম্ন তাপমাত্রার দিক থেকে আগের সব রেকর্ড ভেঙ্গে গেল। দিনাজপুরে গতকাল বুধবার সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি ৪৫ বছরের মধ্যে সারাদেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এর আগে ১৯৬৮ সালে একবার শ্রীমঙ্গলে তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বুধবার ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, আগামী অন্তত দুইদিন এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। তাপমাত্রা নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বাকাশের অতি দুরন্ত ও শীতল জেট বায়ুও বাংলাদেশের উপর সক্রিয় হওয়ায় একের পর এক জনপদ শীতার্ত হয়ে পড়ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শীতজনিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে। ঘন কুয়াশায় মাওয়ায় ৩ ঘণ্টা ও পাটুরিয়া ঘাটে সাড়ে ৪ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। তীব্র ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পেরে খড়কুটো জ্বালিয়ে সাধারণ মানুষ শীত নিবারণের চেষ্টা চালাচ্ছে। এভাবে আগুন পোহাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন অগ্নিদগ্ধও হয়েছেন। আবহাওয়া বিভাগে কর্তব্যরত আবহাওয়াবিদ জানান, চ্ট্টগ্রামের সমুদ্র তীরবর্তী কিছু এলাকা বাদ দিয়ে সারা বাংলাদেশের উপর দিয়ে তীব্র থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, কুয়াশা ও কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসের কারণে শীতের তীব্রতা অনুভূত হচ্ছে। চলতি মওসুমের দ্বিতীয় দফা এই শৈত্যপ্রবাহের সূচনা ৫ জাুনয়ারি থেকে। এরপর পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হয়েছে। প্রথমে মৃদু তারপর মাঝারি আর এখন তীব্র শৈত্যপ্রবাহে সারাদেশ কাতর। গতকাল চুয়াডাঙ্গা, যশোর, সৈয়দপুর, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, ইশ্বরদী, রাজশাহী, শ্রীমঙ্গল, রাঙ্গামাটি, সিতাকুন্ডু, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর ও মাদারীপুরের উপর ছিল তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। এছাড়া দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ। সাধারণত তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে সেই পরিস্থিতিকে শৈত্যপ্রবাহ ধরা হয়। তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রির মধ্যে থাকলে তাকে বলা হয় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি থাকলে তাকে বলা হয় মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ এবং তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রির নিচে নামলে বলা হয় তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। আবহাওয়া বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি শৈত্যপ্রবাহের সূচনা হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সৃষ্ট উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার মধ্যে দিয়ে। উচ্চচাপ বলয়ের কারণে উত্তরের কনকনে শীতল বায়ু দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ার সুযোগ পায়। কিন্তু পরবর্তীতে ঊর্ধ্বাকাশের জেট বায়ু সক্রিয় হওয়ায় পরিস্থিতির খুব দ্রুত অবনতি হয়। ঊর্ধ্বাকাশের এই দুরন্ত ও শীতল বায়ু (জেট বায়ু) সাধারণত ৪০ হাজার ফুট উপর দিয়ে বয়ে যায়। কখনো কখনো শীত মওসুমে এটি নিচে নেমে আসে। তখনই বাধে বিপত্তি। যেমনটি এখন হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে এই বায়ুপ্রবাহ হিমালয়ে ধাক্কা খেয়ে নিচে নেমে আসতে শুরু করেছে। তারপর ভারতের উত্তর প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশকে জমিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের উপর চলে আসছে। গতকাল এই বায়ুর আওতায় চট্টগ্রাম পর্যন্ত চলে এসেছে। মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, কুয়াশার কারণে আগে থেকেই বাংলাদেশের জনপদগুলো শীতার্ত হয়েছিল। জেট বায়ু এসে পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। গতকাল রাজশাহীতে তাপমাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪, ইশ্বরদীতে ৩ দশমিক ৯, রংপুরে ৪ দশমিক ২, বগুড়া ৫ দশমিক ৮, চুয়াডাঙ্গায় ৪ দশমিক ৪, যশোর ৪ দশমিক ২, সাতক্ষীরা ৬ দশমিক ৬, বরিশালে ৬ দশমিক ৫ এবং শ্রীমঙ্গলে ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানীর পরিস্থিতি :হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় গতকাল রাজধানীর জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ছিল না। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কেউ বাড়ি থেকে বের হননি। সম্ভবত সে কারণেই যানজট তুলনামূলকভাবে কম বোধ হয়েছে। যারা বেরিয়েছেন তারা সামর্থ্য অনুয়ায়ী গায়ে ভারি কাপড় জড়িয়েছেন। তবে ইজতেমা যাত্রীদের কারণে রাজধানীর কিছু কিছু পয়েন্টে যানজট ছিল। ঢাকায় গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশেষ করে বাতাসের ঝাপটা ছিল অসহনীয়। বস্তি এলাকায় মানুষকে আগুন পোহাতে দেখা যায়। এই ঠাণ্ডায় সবচেয়ে বেশি কষ্টের মধ্যে পড়ে গেছে মহানগরীর বস্তিবাসী, নিম্নবিত্ত মানুষেরা। আমাদের গোয়ালন্দ সংবাদদাতা জানিয়েছেন, কুয়াশার কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে সাড়ে চার ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। ফলে দেখা দিয়েছে তীব্র যানজট। ঘন কুয়াশার কারণে বুধবার ভোররাত চারটা থেকে সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত সাড়ে চার ঘণ্টা ফেরিসহ সকল প্রকার নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল। এ কারণে স্বাভাবিক রুটের গাড়ির সঙ্গে বিশ্ব ইজতেমাগামী অতিরিক্ত কয়েক’শ গাড়ি ও ঢাকায় শিক্ষক সমাবেশের গাড়ি আটকে পড়ে। স্টাফ রিপোর্টার মতিউর রহমান, দিনাজপুর থেকে জানিয়েছেন, দিনাজপুরে ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। গত ১শ’ বছরেও মানুষ এ ধরনের শীত অনুভব করেনি। বীরগঞ্জের কাশীপুর গ্রামের ৮৫ বছরের রহিমউদ্দীন বললেন, ‘মুই মোর জীবনে এই রহম শীত কখুন দেখোনি। মোর হাড়গুলো কাঁপছে, মনে হছে ঠক ঠক কাঁপুনিতে মোর জীউটা কখন যে বাইর হই যায়।’ শুধু রহিমউদ্দীনই নন, অনেক প্রবীণের নিকট থেকে জানা গেছে, এরকম ঠাণ্ডা তারা দেখেননি। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে জেলার ১৩টি উপজেলা। তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশার কারণে ঘর থেকে বের হতে পারছে না মানুষ। গত ৩ দিন সূর্যের দেখা মেলেনি। ইটভাটা, চাতালের দিনমজুরেরা কাজের অভাবে চরম দুর্ভোগের মধ্যে কাটাচ্ছেন। শীতে ঘর থেকে বের হওয়াই যাচ্ছে না, কাজ করা তো দূরের কথা। ঈশ্বরদী (পাবনা) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, ঈশ্বরদীতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। বুধবার ঈশ্বরদীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র শৈত্যপ্রবাহে ঈশ্বরদীর শীতার্ত মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। বুধবার দুপুর ৩টার সময়ও শহরের বিভিন্ন স্থানে খড়কুটো জ্বালিয়ে সাধারণ মানুষকে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা গেছে। জীবননগর সংবাদদাতা জানিয়েছেন, হাড় কাঁপানো তীব্র শীতে মানুষের পাশাপাশি পশু-পাখিও জবুথবু হয়ে পড়েছে। তীব্র শীতের সাথে ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ার তীব্রতায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা দুর্বিষহ করে তুলেছে। গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, সারা দেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহের কারণে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। শহরের পথে পথে, বিপণী কেন্দ্র, মোড়ে মোড়ে তীব্র শীত থেকে বাঁচতে উষ্ণতার পরশ নিতে খড়কুটা, পুরাতন কাগজ, টায়ারসহ নানা উপকরণ দিয়ে তৈরি হচ্ছে আগুনের কুন্ডলী। পথচারী, দোকানীসহ নানা পেশার মানুষও এসব কুন্ডলীতে ভিড় করছে। কৃষক, কামার-কুমার, জেলেদের কাজকর্ম প্রায় বন্ধ। তবে রিকশা ভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণ। গ্রামাঞ্চলের চা-দোকান, রেস্টুরেন্টগুলোর চারপাশে পর্দা টাঙিয়ে চলছে বেচাকেনা। পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, পীরগঞ্জ উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী উপজেলাসমূহে হাড় কাঁপানো শীত জেঁকে বসেছে। রাতে শীতের তীব্রতায় এলাকার গরিব, অসহায়, ছিন্নমূল মানুষের দুর্ভোগ বর্ণনাতীত। শীতের কারণে দরিদ্র ও দিনমজুর শ্রণীর মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া লোকজন বাড়ির বাইরে যায় না। ডোমার (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, শীত নিবারণের জন্য আগুন জ্বালিয়ে আগুন তাপাতে গিয়ে উপজেলার হরিণচড়া ইউনিয়নের ছমির উদ্দিনের স্ত্রী আরজিনা বেগম (৩৬), বামুনিয়া ইউনিয়নের বারবিশা গ্রামের আতাউর রহমানের স্ত্রী জাহানারা বেগম (৩২) ও পার্শ্ববর্তী জলঢাকা উপজেলার খেরকাটি গ্রামের সান্তু রায়ের স্ত্রী সম্পতি (৫০) অগ্নিদগ্ধ হয়ে ডোমার উপজেলা স্বা্স্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। এছাড়া আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা স্বরূপকাঠি, রাজশাহী, রানীশংকৈল, চলনবিল, সুন্দরগঞ্জ, মধুখালী, জামালপুরের মাদারগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের তাড়াইল, কুড়িগ্রাম, চাঁদপুর, গাইবান্দার ফুলছড়ি, বগুড়া, চুয়াডাঙ্গা, চাটখিল ও সোনাইমুড়ী, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ, সাতক্ষীরার তালা থেকে শীতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ার খবর দিয়েছেন।