ভিসিবিরোধী সভায় ছাত্রলীগের হামলা, এসিডদগ্ধ ২ শিক্ষক

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১২
রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিবিরোধী শিক্ষকদের সমাবেশে ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। হামলাকারীরা ব্যানার ছিনিয়ে নিয়ে সমাবেশে ব্যবহূত মাইক, ব্যাটারী ও এপ্লি¬ফায়ার ভাঙ্গচুর এবং শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করে। এ সময় ব্যাটারির এসিড ছিটকে পড়ে দুই শিক্ষকের চোখ ও মুখমন্ডল ঝলসে যায়। গতকাল বৃহস্পতিবার এ ঘটনা ঘটে। হামলায় আরো ৪ শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীও আহত হন। তবে এই হামলার সঙ্গে সংগঠনের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এক নেতা। এসিডদগ্ধ শিক্ষকরা হলেন বাংলা বিভাগের প্রভাষক ড. তুহিন ওয়াদুদ ও ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মতিউর রহমান। তাদের রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হামলায় আহত অন্যরা হলেন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক গোলাম রব্বানি, পলিটিক্যাল সাইন্স বিভাগের শিক্ষক সনোয়ার সিরাজ, শিক্ষক আপেল মাহমুদ, শিক্ষক এএসএম হাফিজার রহমান সেলিম রাজিব, শিক্ষার্থী পিয়াল, তানজিনা, সানজিদা, আফরোজা, রাশেদা ও খাদিজা। এ ঘটনার পর দুপুরের দিকে ক্যাম্পাসে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন এলাকা থেকে বেশ কিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। ছাত্রলীগের একাংশ ও বহিরাগত বিপুলসংখ্যক সন্ত্রাসী সশস্ত্র অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে আইন-শৃঙ্খলা ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে গতকাল সন্ধ্যা ৭টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাসে সভা, সমাবেশ, মিছিল, অবস্থান ধর্মঘট, মানববন্ধন, অনশনসহ সকল ধরনের শৃঙ্খলা বহির্ভূত কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগ। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে গতকাল সকালে ‘সচেতন শিক্ষক সমাজ’-এর ব্যানারে ভিসিবিরোধীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান ধর্মঘট এবং আমরণ অনশন শুরু করেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালনের জন্য সেখানে গেলে দুই পক্ষে সংঘর্ষ বেধে যায়। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের একাংশ বহিরাগতদের নিয়ে ঘটনাস্থলে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটালে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এ ঘটনার প্রতিবাদে ব্যানার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে মিছিল বের করেন ‘সচেতন শিক্ষক সমাজে’র নেতৃবৃন্দ। মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় আকস্মিক তাদের উপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের একাংশ ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা। এ সময় মাইক টানা-হেঁচড়া করতে গিয়ে এর ব্যাটারী ভেঙ্গে এসিড ছিটকে গিয়ে ২ শিক্ষকের ওপর পড়ে। এতে তাদের চোখ ও মুখমন্ডল ঝলসে যায়। এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী আহত হন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ অভিযোগ করেছেন, ভিসি’র বিরুদ্ধে আন্দোলন করায় হামলাকারীরা তাদের মুখে এসিড ছুঁড়ে মেরেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, তাকে লক্ষ্য করে এসিড ছুঁড়ে মারার কোন ঘটনাই ঘটে নাই। মাইকের ব্যাটারী পড়ে গিয়ে সেখান থেকে বের হওয়া এসিড ছিটকে তার শরীরে লাগতে পারে। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুল জলিল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় অস্থিতিশীল করার জন্য যারা আন্দোলন করছিলেন তাদের ভেতরে থাকা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্র হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে আহত করেছে। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত ও নিয়মবিধি মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগসহ সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু একটি কুচক্রি মহল আমার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ করছে। যার কোন ভিত্তি নেই। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করার পাঁয়তারা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও রংপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মো. রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি জন্য ছাত্রলীগকে দায়ি করা হচ্ছে। কিন্তু ছাত্রলীগের শাখা বা কোন প্রকার কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। ওই ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগ কোনভাবেই জড়িত নয়। ছাত্রলীগের কোন কর্মী যদি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ শিক্ষক আহত হওয়ার খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিকেলে আন্দোলরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আমরণ অনশন করেন। সেখানে আয়োজিত সমাবেশে এই আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার মোজাম্মেল হক, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রেজাউল করিম রাজু প্রমুখ।