আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে মুখর তুরাগ তীর

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১২
আজ থেকে শিল্পশহর টঙ্গীতে শুরু হচ্ছে দু’পর্বের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। দুনিয়া ও সম্পদের মোহ ত্যাগ করে পার্থিব লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহ্র রাস্তায় বের হওয়া তাবলীগ জামাতের লাখ লাখ মানুষ এখন টঙ্গীমুখী। তাবলীগের মুসল্লিগণ জীবনের কিছু সময় দ্বীনের জন্যে কোরবান করে বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে আসছেন টঙ্গীতে। একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লাখ লাখ মানুষ এবং শ’খানেক দেশ থেকে হাজার হাজার তাবলীগ অনুসারী বিশ্ব ইজতেমায় শামিল হওয়ার জন্য ছুটে আসছেন টঙ্গীর তুরাগ তীরে। টঙ্গী মেতে উঠেছে ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণ ধর্মীয় উত্সবে। ঢাকা থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে তুরাগ নদীর তীর মুখরিত হয়ে উঠছে লাখো মুসলমানের আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে। বিছানাপত্র, হাঁড়ি-পাতিল মাথায় আর কাঁধে বহন করে দলে দলে মানুষ আসছে বিমানে, লঞ্চ-স্টীমারে, ট্রেনে, ট্রাকে, বাসে, ইঞ্জিনচালিত নৌকায় আর পায়ে হেঁটে। আজ শুক্রবার বাদ ফজর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম পর্বের আমবয়ান শুরু। দুপুরে অনুষ্ঠিত হবে সর্ববৃহত্ জুমার নামাজ। জুমার নামাজে ইজতেমায় আগত মুসল্লিসহ আশপাশ এলাকার লোক অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ময়দানে আগামী রবিবার আখেরী মোনাজাতের পূর্ব পর্যন্ত চলবে জামাত তৈরি, তাবলীগের বয়ান। শনিবার সন্ধ্যায় প্রতি বছরের ন্যায় এবারও যৌতুক বিহীন বিয়ে সম্পন্ন করা হবে বলে ইজতেমাসূত্রে জানা গেছে। বিয়েগুলো অনুষ্ঠিত হবে বর-কনে উভয়পক্ষের অভিভাবকদের উপস্থিতিতে। বিয়ে সম্পন্নের পর নতুন দাম্পত্য জীবনে সুখ সমৃদ্ধি ও ইমান আমল বৃদ্ধির জন্য মোনাজাত করা হবে। বিদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুসল্লি আসছেন ভারত ও পাকিস্তান থেকে। অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বার্মা, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, ইরান, ওমান, ব্রুনেই, কুয়েত, কোরিয়া, চীন, জর্দান, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহ্রাইন, ফিলিপিন, মালয়েশিয়া, সিরিয়া, মিসর, সিঙ্গাপুর, লেবানন, আলজেরিয়া, মরক্কো, সোমালিয়া, তাঞ্জানিয়া, চাদ, ইয়েমেন, নাইজেরিয়া, তিউনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, কম্বোডিয়া, ফিনল্যান্ড, ফিজি, জাম্বিয়া, ফ্রান্স, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ইটালি, কেনিয়া, মৌরিতানিয়া, মালি, নরওয়ে, আফ্রিকা, ফিলিস্তিন, জিবুতি, ঘানা, কাতার, জাপান, জার্মান প্রভৃতি। গতকাল সরেজমিন ইজতেমা ময়দানে গিয়ে দেখা গেছে, দেশি-বিদেশি লাখ লাখ মুসল্লি প্যান্ডেলের নিচে সবুজ ঘাসের ওপর বিছানা পেতে অবস্থান নিয়েছেন। সবার মুখে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু....আল্লাহু আকবার ধ্বনি। যারা আসছেন তারাও যিকিরের সঙ্গে ময়দানে প্রবেশ করছেন। কাঁধে বিছানাসহ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। তারা ময়দানে প্রবেশ করে খুঁজে নিচ্ছেন জেলা ও উপজেলা ভিত্তিক খিত্তা, হালকা, রাস্তা ও খুঁটি নম্বর। ইজতেমা কেন্দ্রিক টঙ্গী পৌরসভা কন্ট্রোল রুম থেকে জানা গেছে, এবারের ইজতেমায় অতীতের চেয়ে এবার বেশি মুসল্লির সমাবেশ ঘটবে। এ প্রত্যাশা থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতিও গ্রহণ করা হয়েছে। এদিকে ইজতেমাকে ঘিরে আগত মুসল্লিদের স্বাস্থ্যসেবায় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ইজতেমা ময়দান পরিদর্শন করেন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ডা. মজিবুল হক, তাদের সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল ও টঙ্গী পৌর মেয়র এড. মো. আজমত উল্লা খান। দুই মুসল্লি নিহত, এক বিদেশিসহ অসুস্থ ৭ জন টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে দুই মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। এরা হচ্ছেন চট্টগ্রামের আব্দুল মোতালেব (৭০) এবং কিশোরগঞ্জের আব্দুল হামিদ (৭৫)। এছাড়া মরক্কো থেকে আগত মুসলিম লাখাদ (৬০) নামের একজনসহ ৭ জনকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতির বাণী রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে এক বাণীতে বলেছেন, ‘বিশ্ব ইজতেমা-২০১৩’ উপলক্ষে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসল্লিদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানাই। বাণীতে তিনি বলেন, শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম ইসলামের আদর্শ সমগ্র মানব জাতির জন্য পথপ্রদর্শক। যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণভাবে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজনে মুসলিম বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, এই মহামিলন ইসলামের আদর্শ এবং কোরআন ও সুন্নাহ্র শিক্ষাকে বিশ্ববাসীর কাছে ছড়িয়ে দিতে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মুসলিম বিশ্বের শান্তি, ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ব সুদৃঢ়করণে বিশ্ব ইজতেমার গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামের সুমহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানবতার কল্যাণে সবাই অবদান রাখবেন এটাই প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রীর বাণী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে এক বাণীতে বলেছেন, ‘মুসলিম উম্মাহ্র অন্যতম বৃহত্ সমাবেশ বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে আমি দেশবাসী এবং বিশ্বের সকল মুসলমানকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ। রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে এই বিশ্ব ইজতেমা ইসলামের মর্মবাণী প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে তাত্পর্যপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।’ তিনি বলেন, ইজতেমায় আগত বিদেশি মেহমানদের মাধ্যমে আবহমানকাল ধরে আমাদের লালিত অসাম্প্রদায়িক চেতনা, অকৃত্রিম সরলতা ও অতিথি পরায়ণতা এবং সহিষ্ণুতার আলোক বার্তা বিশ্ব দরবারে পৌঁছে যাবে। আমি আশা করি এ মহান ধর্মীয় সমাবেশ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রাখবে। দেশ ও বিশ্বের সর্বস্তরের মানুষ ও মুসলিম উম্মাহ্র ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরো সৃদৃঢ় করবে। আমি বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে মহান আল্লাহ্র দরবারে দেশবাসী ও মুসলিম উম্মাহ্র সুখ, শান্তি ও কল্যাণ এবং দেশের সমৃদ্ধি কামনা করছি। খালেদা জিয়ার শুভেচ্ছা বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে দেশবাসীসহ মুসলিম বিশ্বের শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে তাদের শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গতকাল বৃহস্পতিবার এক বাণীতে তিনি বলেন, টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা বিশ্ব মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত। বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণকারী দেশ-বিদেশের অগণিত ধর্মভিরু মানুষের অব্যাহত সুখ, শান্তি ও কল্যাণ কামনা করছি। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মুক্তির জন্য বিশ্ব ইজতেমায় বাংলাদেশসহ সারাবিশ্ব থেকে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে ঢাকার অদূরে তুরাগ নদীর তীরে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে। মহান আল্লাহ্র নামে মুখরিত হয়ে ওঠে ইজতেমা ময়দান। মোমিন-মুসলমানদের এই ঐতিহাসিক জমায়েত উপলক্ষে আমি আল্লাহ্র দরবারে দোয়া করছি, বিশ্বের সকল মানুষ যেন সংঘাত ও হানাহানি থেকে মুক্ত হয়ে সুখী ও আনন্দময় জীবন যাপন করতে পারে। পৃথক এক বাণীতে বিএনপির সমন্বয়ক ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামও আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক সাফল্য কামনা করেছেন।