নৌযান শ্রমিকদের লাগাতার ধর্মঘটে দেশের নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সব নৌপথেই নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ১৬ দফা দাবি আদায়ে গত বুধবার থেকে এই ধর্মঘট শুরু করে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। দাবির স্বপক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে তারা। সমাবেশে দাবি মেনে না নেয়া পর্যন্ত শ্রমিক ধর্মঘট চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ফেডারেশন নেতৃবৃন্দ। এদিকে ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনে গতকাল সারাদেশের নৌ টার্মিনালগুলোতে আটকা পড়েন হাজার হাজার যাত্রী। বিশেষ করে বিশ্ব ইজতেমাগামী যাত্রীরা বেশি বিপাকে পড়েন। বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিতে স্বরূপকাঠি ইন্দিরহাট থেকে আগত ইকরাম এলাহী ইত্তেফাককে বলেন, নৌযান ধর্মঘটের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীসহ ইজতেমায় আসতে আগ্রহী হাজার হাজার মুসল্লি আটকা পড়েছেন। প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে অনেকে বহু কষ্টে বাসে, ট্রাকে করে ঢাকার পথে রওয়ানা হচ্ছেন। এতে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মুসল্লিদের, তাছাড়া অতিরিক্ত ভাড়াও গুণতে হচ্ছে। তিনি নিজেও কষ্ট করে কোন মতে ঢাকায় পৌঁছেছেন বলে জানান। তিনি ইজতেমা উপলক্ষে আপাতত নৌধর্মঘট তুলে নেয়ার জন্য নেতৃবৃন্দদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
ভোলার অধিবাসী মিজানুর রহমান জানান, তিনি গত দুই দিন ধরে সদরঘাট টার্মিনালে ঘুরছেন বাড়ি যাবার জন্য। কিন্তু শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ আজ শুক্রবার তার চাচাত ভাইয়ের বিয়ে। বিয়ের কিছু বাজারও করে নেয়ার কথা তার। চাঁদপুরের সলিমউল্ল্যাহ জানান, প্রতি ইজতেমায় তারা ঢাকায় আসেন। কিন্তু নৌযান ধর্মঘটের কারণে কেউ আসতে পারছেন না।
এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএর সদরঘাট টার্মিনালের উপ-পরিচালক সাইফুল হক খান ইত্তেফাককে বলেন, ইজতেমাকে সামনে রেখে কোনভাবেই নৌযান ধর্মঘটের ডাক দেয়া উচিত হয়নি। এতে করে হাজার হাজার মুসল্লি ইজতেমায় যোগ দিতে পারবেন না। তাছাড়া যাত্রীরাও সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
শ্রমিকদের বিক্ষোভ
১৬ দফা আদায়ের লক্ষ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার সদরঘাট ও বাংলাবাজার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। পরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহ আলমের সভাপতিত্বে নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। বক্তারা ১৬ দফা দাবি মেনে না নেয়া পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দেন।
নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনের ১৬ দফার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দাবিগুলো হচ্ছে: লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন শ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান, মাস্টার-ড্রাইভারদের সার্টিফিকেট মেয়াদিকরণ বাতিল, বাজারদরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বেতন স্কেল পুনর্নির্ধারণ এবং নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ।
এদিকে শ্রমিকদের ধর্মঘটে সমর্থন জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। এরা হলো: বাংলাদেশ জাতীয় সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ জাহাজী শ্রমিক ফেডারেশন, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক ঐক্য ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (টাফ)।
নৌমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক আজ
এদিকে আজ শুক্রবার আড়াইটায় বিআইডব্লিউটি’র সেমিনার কক্ষে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানের নেতৃত্বে জরুরি সভা ডাকা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড.শামছুদ্দোহা খন্দকার। সভায় নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে। সভায় নৌযান ধর্মঘটের নিরসন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
‘ধর্মঘট বেআইনি’
নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনের ধর্মঘট বেআইনি ও ট্রেড ইউনিয়নের নামে সন্ত্রাসের বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ নৌ-যান মালিক সমিতি। এই অবৈধ ধর্মঘটকে কঠোর হাতে দমনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সমিতির নেতারা। গতকাল এক বিবৃতিতে সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার ২০১০ সালে নৌ-যান শ্রমিকদের নির্ধারিত মজুরি স্কেল ঘোষণা করে। এতে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ বেতন ভাতা বাড়ানো হয়, যা ৫ বছর মেয়াদের জন্য করা হয়। এই মজুরি ২০১৪ সাল পর্যন্ত বলবত্ থাকবে। মেয়াদ শেষের আগে বেতন বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন সম্পূর্ণ বেআইনি। কতিপয় নেতা ব্যক্তি স্বার্থে নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনকে ব্যবহার করছেন এবং তারাই ধর্মঘটে ইন্ধন দিচ্ছেন বলে সমিতির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে আন্দোলনরত বাংলাদেশ নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, নৌযান শ্রমিকরা ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু নৌযান মালিক সমিতি নেপথ্যে আন্দোলন বানচাল করার নানা ষড়যন্ত্র করছে। মালিক পক্ষের উস্কানিতে গত মঙ্গলবার রাতে পুলিশ কামাল ও মোহাম্মদ আলী নামে দুইজন চালককে গ্রেফতার করেছে। তিনি অবিলম্বে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি এবং ১৬ দফা দাবি মেনে নেয়ার আহবান জানান।
আশুগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, ধর্মঘটের কারণে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ নৌ-বন্দরে আটকা পড়েছে ২ শতাধিক মালবাহী কার্গো জাহাজ। এতে নৌপথে পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া ঢাকা-সিলেট নৌরুটে চলাচলকারী শত শত মালবাহী কার্গো জাহাজ বিভিন্ন পয়েন্টে আটকা পড়েছে বলে জানা গেছে।
