বহুল আলোচিত ব্লু গোল্ড ম্যাকাও পাখি ‘প্রিন্স’ ও ‘প্রিন্সেস’-এর ভেঙে যাওয়া সংসার ফের জোড়া লাগবে কি না—তার সমাধান গতকাল বৃহস্পতিবারও হলো না। এ সংক্রান্ত আবেদনের শুনানি শেষে ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহে অলিদ মাঈনুল আমিন গতকাল এক আদেশে বলেছেন, বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২ অনুযায়ী নালিশী পাখিটি কোনপক্ষের হেফাজতে থাকবে—এ ব্যাপারে আদেশ দেয়ার এখতিয়ার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নয়। আগ্রহী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তার অধিকার আদায়ের জন্য উপযুক্ত আদালতে গিয়ে বিচার প্রার্থনা করতে পারেন। নিজের সংগৃহীত স্ত্রী ম্যাকাও পাখি ‘প্রিন্সেস’-এর সঙ্গে ‘প্রিন্স’-এর সংসার টিকিয়ে রাখতে উচ্চ আদালতে যাবেন বলে জানিয়েছেন মামলার বিবাদী ড. আব্দুল ওয়াদুদ।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে প্রিন্সেসকে নিয়ে আদালতে আসেন আব্দুুল ওয়াদুদ। সঙ্গে একটি কাঁচের বয়ামে আনা হয় প্রিন্সেসের নষ্ট হয়ে যাওয়া দুটি ডিম। প্রিন্সেসকে এক নজর দেখতে আইনজীবী ও আদালতে উপস্থিত লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে। প্রায় সব প্রচার মাধ্যমের সাংবাদিকরাও উপস্থিত হন। প্রিন্সেসের ফটোসেশন চলে প্রায় অধাঘণ্টা।
আব্দুল ওয়াদুদ আদালতে আসার আগেই ঠিক হয় যে, বেলা ২টায় শুনানি হবে। ফলে বেলা ১১টায় প্রিন্সেসকে নিয়ে আদালতে আসায় শীতের কারণে বিবাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট বরুণ কুমার বিশ্বাস নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহে অলিদ মাঈনুল আমিনকে আরও আগে শুনানি গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু ২টার আগে শুনানি গ্রহণ করা সম্ভব নয় বলে ম্যাজিস্ট্রেট জানালে বিবাদী ওয়াদুদ প্রিন্সেস ম্যাকাওকে নিয়ে বাসায় চলে যান। পরে তিনি শুনানির সময় শুধু ডিম নিয়ে আদালতে উপস্থিত হন।
শুনানিকালে ম্যাকাও ‘প্রিন্স’-এর দাবিদার মামলার বাদী ইকরাম সেলিমের পক্ষে আইনজীবী সময়ের আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, গত ২ জানুয়ারি বাদী ব্যবসায়িক কাজে ব্যাংকক গেছেন। তাই শুনানির জন্য তাদের প্রস্তুতি নেই। আদালত সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করেন।
অন্যদিকে বিবাদীপক্ষের আইনজীবী বরুণ কুমার বিশ্বাস ও আজাদ রহমান বলেন, ম্যাকাও ‘প্রিন্স’কে উপহার হিসেবে বিবাদীকে দিয়েছিলেন বাদী। তিন বছর তিনি পাখিটির কোনো খবর নেননি। যখন শুনেছেন প্রিন্স-প্রিন্সেসের জুটির সংসারে নতুন অতিথি এসেছে (ডিম ফুটে বাচ্চা হয়েছে) তখন তিনি প্রিন্সকে তার কাছে ফিরিয়ে দিতে দাবি করতে এসেছেন। প্রিন্সকে নিয়ে যাওয়ার পর নিঃসঙ্গ হয়ে প্রিন্সেস খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। ঠিকমতো তা না দেয়ায় তার দুটি ডিম নষ্ট হয়ে গেছে। তাই প্রিন্সকে ফিরিয়ে দিয়ে তাদের সংসার রক্ষা করা হোক।
শুনানিকালে প্রিন্স-প্রিন্সেস-এর সংসার না ভাঙার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান বাহালুল হক চৌধুরীসহ ২০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির স্বাক্ষরিত পত্রও আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
আদেশের পর বিবাদীর আইনজীবী বরুণ কুমার বিশ্বাস জানান, তিনি (ম্যাজিস্ট্রেট) পাখিটি প্রথম আদেশে মালিককে ফিরিয়ে দিতে বললেন। আজ আবার বলছেন ফিরিয়ে আনার এখতিয়ার তার নেই। তাই আদেশটি দ্বৈতমতের। এই আদেশের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে যাবেন বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুর প্রবাসী মোহাম্মদ ইকরাম সেলিম ১৯৯৭ সালে সিঙ্গাপুর থেকে একটি ব্লু গোল্ড ম্যাকাও পাখি আনেন। এর নাম দেয়া হয় প্রিন্স। তখন ওর বয়স ছিল তিন মাস। রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে প্রায় এক বিঘা জমির ওপর তার বাড়িতে পাখিটি বিচরণ করত। এক পর্যায়ে ইস্কাটনের বাড়ি বিক্রি করে বারিধারায় চলে যায় সেলিমের পরিবার। বিদেশে চাকরি, বাড়ি বিক্রি এবং নতুন বাড়ি তৈরির ঝামেলার মধ্যে পাখিটির যত্ন নেয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে তার পরিচিত হাতিরপুলে আবদুল ওয়াদুদের কাছে ২০১০ সালে পাখিটি লালন-পালনের অনুরোধ জানালে তিনি দায়িত্ব নেন।
আব্দুল ওয়াদুদ প্রিন্সের জন্য পরপর দুটি সঙ্গী খুঁজে আনেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে সংসার হয়নি। সব সময় মারামারি করত। সেই নতুন ম্যাকাও দুটি মারা যায়। প্রিন্সের একাকিত্বের কারণে তৃতীয়বার আনা হয় আরো একটি ম্যাকাও। তার সাথে সে ভালভাবে থাকতে শুরু করে। তার নাম রাখা হয় প্রিন্সেস। এরপর তারা জোড়া বাঁধে। তিনবারে আসে পাঁচটি বাচ্চা। বছর খানেক আগে ইকরাম সেলিম প্রিন্সকে ফেরত চান।
আব্দুল ওয়াদুদ প্রিন্সকে ফেরত না দেয়ায় তাকে উদ্ধার করতে ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে গত ৩ জানুয়ারি মামলা করেন সেলিম। আদালতের নির্দেশ পেয়ে কলাবাগান থানা প্রিন্সকে উদ্ধার করে ইকরাম সেলিমকে বুঝিয়ে দেন।
কিন্তু প্রিন্সকে নিয়ে যাওয়ায় প্রিন্সেস খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়। ওই অবস্থায় প্রিন্সেসকে বাঁচানোর জন্য প্রিন্সকে ফেরত চেয়ে একই আদালতে আবেদন করেন আব্দুল ওয়াদুদ। ওই আবেদনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহে অলিদ মাঈনুল আমিন গতকাল বাদী ও বিবাদী উভয়পক্ষের উপস্থিতিতে শুনানির দিন ঠিক করেছিলেন।
