সংবিধান সংশোধন ছাড়াই তত্ত্বাবধায়ক সরকার কি গঠন করা সম্ভব?

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৬
সংবিধান সংশোধন ছাড়াই তত্ত্বাবধায়ক সরকার কি গঠন করা সম্ভব ? সংবিধান প্রণেতাদের একজন এবং পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধন কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপি বলেছেন, বর্তমান সংবিধান বহাল রেখেই নির্দলীয়, অন্তর্বর্তীকালীন কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা তার এই মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তারা বলেছেন, ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর পর বর্তমান সংবিধান যে রূপ ধারণ করেছে তাতে সংবিধান সংশোধন ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সম্ভব নয়। গত বুধবার পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, সকল দলের অংশগ্রহণে কীভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায় সে ব্যাপারে সংসদে আলোচনা হতে পারে। এক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন করার কোন প্রয়োজন নেই। গতকাল ইত্তেফাককে তিনি আরো বলেন, আপিল বিভাগের রায়ে নির্বাচনের ৪২ দিন আগে সংসদ বিলুপ্ত করে একটি ছোট আকারের মন্ত্রিপরিষদ গঠনের পরামর্শ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে প্রধানমন্ত্রীর আদলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং মন্ত্রীদের আদলে উপদেষ্টারা দায়িত্ব পালন করতেন। রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে ছোট আকারের মন্ত্রিপরিষদকে তত্ত্বাবধায়কের রূপ দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীরাই উপদেষ্টাদের মতো দায়িত্ব পালন করবেন। তারা রুটিন ওয়ার্ক করবেন এবং নীতি নির্ধারণী কোন কাজে যুক্ত হবেন না। এটি আমার ব্যক্তিগত মত। এই মতের সাথে আমার দলের কোন সম্পর্ক নেই। আমি মনে করি, রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা ও সমঝোতার উপরে কোন কথা নয়, এক্ষেত্রে সংবিধান কোন বাধা হিসাবে কাজ করবে না। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান সংবিধানে একটি দলীয় সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্দেশনা রয়েছে। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে‘ বর্তমান সংসদ বহাল রেখে এবং সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগেই সংসদ নির্বাচনের নির্দেশনা রয়েছে।’ সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এটিএম শামসুল হুদা এ প্রসঙ্গে বলেছেন, একটি সংসদ বহাল রেখে কোনভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। খোদ মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপিও সংসদ বহাল রেখে আরেকটি সংসদ নির্বাচন আয়োজনের কঠোর সমালোচনা করছেন। বিরোধী দল থেকেও সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে বর্তমান সংসদ এবং এই সরকার বহাল রেখে কোন নির্বাচনে তারা অংশ নেবে না। এছাড়া ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল হয়ে যাওয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোন বিধান আর সংবিধানে নেই। সংবিধানের ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে মন্ত্রিসভা আছে, যদি না তারা পদত্যাগ করেন তাহলে তাদের অধীনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কোন কারণে যদি প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন তাহলে বর্তমান সংসদে যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের আস্থাভাজন রাষ্ট্রপতি তাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য আছেন। ফলে প্রধানমন্ত্রী কোন কারণে পদত্যাগ করলে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া যায় আওয়ামী লীগ থেকেই আরেকজন প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হবেন। প্রধানমন্ত্রী যেরূপ চাইবেন সেইরূপ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন। সংবিধানের ৫৬ (২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপ-মন্ত্রীর সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ সদস্যগণের মধ্যে থেকে নিযুক্ত হবেন এবং অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে মনোনীত হতে পারবেন। অনেকে এমন ধারণা দেন, নির্বাচনের আগে সকল সংসদ সদস্য পদত্যাগ করবেন অথবা প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙ্গে দিতে বলবেন। যদি তাই হয় সেক্ষেত্রেও সংবিধানের ৫৬ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ভেঙ্গে যাওয়া সংসদ সদস্যদের মধ্যে থেকে রাষ্ট্রপতিকে নিয়োগ দিতে হবে। ওই ’অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সংসদ ভেঙ্গে যাওয়া এবং সংসদ সদস্যদের অব্যাহতির পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে এই অনুচ্ছেদের (২) বা ৩ দফার অধীন নিয়োগ দানের প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার অব্যবহিত পূর্বে যারা সংসদ সদস্য ছিলেন এই দফার উদ্দেশ্যে সাধনকল্পে তারা সদস্যরূপে বহাল রয়েছে বলে গণ্য হবেন।’ এসব কারণে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন পুনরায় সংবিধান সংশোধন ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা সম্ভব নয়।