তীব্র শৈত্যপ্রবাহে সারা দেশের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে নেমে যাচ্ছে। সৈয়দপুরে গতকাল বৃহ-স্পতিবার সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী চার দশকের মধ্যে এটি দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। শুধু সৈয়দপুর নয় চট্টগ্রামের সমুদ্রতীরবর্তী কিছু এলাকা ছাড়া সারা দেশই কার্যত শীতে থর থর করে কাঁপছে। জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় শিশুরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। ঠাণ্ডাজনিত অন্যান্য রোগের প্রকোপও বাড়ছে। ঘন কুয়াশায় নৌ চলাচলও ব্যাহত হওয়ায় অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে পড়েছেন যাত্রীরা। তীব্র শীত সহ্য করতে না পেরে খড়কুটো জ্বালিয়ে সাধারণ মানুষ শীত নিবারণের চেষ্টা চালাচ্ছে। এভাবে আগুন পোহাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধও হওয়ার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে এক বৃদ্ধের মৃত্যুও হয়েছে আগুনে পুড়ে।
আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বাকাশের দুরন্ত ও শীতল বায়ু (জেট বায়ু) বাংলাদেশের উপর বৃহস্পতিবার ১৮ হাজার ফুটে সক্রিয় ছিল। সাধারণত এই বায়ু প্রবাহ ৩৫ থেকে ৪০ হাজার ফুট উপর দিয়ে বয়ে যায়। এটি নীচে নেমে আসার কারণেই সারা দেশে চলমান শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিয়েছে। আবহাওয়াবিদরা আশা করছেন, আজ শুক্রবার থেকে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করবে। তবে অতি দ্রুত এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। আরো তিন থেকে চার দিন শৈত্যপ্রবাহ অথবা শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব থাকবে।
শুধু সৈয়দপুর নয় চট্টগ্রামের সমুদ্রতীরবর্তী কিছু এলাকা ছাড়া সারা দেশই কার্যত শীতে থর থর করে কাঁপছে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগসহ টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, সিতাকুণ্ডু, রাঙ্গামাটি, কুমিল্লা, শ্রীমঙ্গল, যশোর এবং কুষ্টিয়া এলাকা রয়েছে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের আওতায়। এসব এলাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রয়েছে। তবে এর মধ্যে রংপুরে গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বাকি সব অঞ্চল রয়েছে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহের আওতায়। মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের আওতাভুক্ত স্থানসমূহের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রয়েছে ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।
সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড:গত বুধবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল দিনাজপুরে ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেটি ছিল দিনাজপুরের জন্য সর্বনিম্ন তাপমাত্রার একটি রেকর্ড। এর আগে ১৯৫৫ সালে দিনাজপুরে একবার তাপমাত্রা নেমেছিল ৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তবে আবহাওয়া বিভাগ থেকে জানা গেছে, এ অঞ্চলে এর চেয়েও কম তাপমাত্রার রেকর্ড রয়েছে। ১৯৬৮ সালে একবার শ্রীমঙ্গলে তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এছাড়া রাজশাহীতে ২০০৩ সালে একবার তাপমাত্রা ৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে গিয়েছিল।
রাজধানীর পরিস্থিতি:গতকাল আক্ষরিক অর্থে রাজধানীর ছিল জবুথবু অবস্থা। সকাল ১১টার পরও কোন কিছুই স্বাভাবিক গতিতে চলেনি। গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়া কেউ বাইরে বের হয়নি। পাড়া-মহল্লার মোড়ে মোড়ে, চায়ের দোকানে ছিল জটলা। অনেকেই স্কুল বাদ দিয়েছে। যারা গেছে অভিভাবকরা তাদের রীতিমতো ঢেকেঢুকে নিয়ে গেছেন। বিকাল চারটার দিকে রাজধানীর আকাশে সূর্য ছিল। কিন্তু ধোয়াশার (ধূলিকণা ও কুয়াশার মিশ্রণ) কারণে সে সূর্যকে দিনের বেলায় দেখা পাওয়া ফ্যাকাশে চাঁদের মতো মনে হচ্ছিল। ঢাকায় গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সকালের দিকে বাতাসের ঝাপটা ছিল অসহনীয়। দুপুরে কনকনে বাতাসের দাপট একটু কম মনে হয়েছে। কিন্তু বিকাল হতেই তা আবার বেড়ে যায়। এই ঠাণ্ডায় সবচে বেশি কষ্টের মধ্যে পড়ে গেছে মহানগরীর বস্তিবাসী নিম্নবিত্ত মানুষ। সকালের দিকে বস্তি এলাকায় মানুষকে আগুন পোহাতে দেখা যায়।
ঠাণ্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগে মৃত্যু:আমাদের দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, গতকাল কনকনে ঠাণ্ডা ও শীতজনিত রোগে ভুগে দামুড়হুদায় তারক মন্ডলের স্ত্রী চিনি বিবি (৭০) মারা গেছেন। কালকিনি (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, মাদারীপুরের কালকিনিতে বুধবার রাতে তীব্র শীতে ঠাণ্ডাজনিত রোগে আবুল কাশেম ঘরামী (৭৫) নামের এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। নীলফামারী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বুধবার রাতে কিশোরীগঞ্জ উপজেলার কেশবা গ্রামের ময়েজ উদ্দিনের স্ত্রী মালা খাতুন (৭৫) শীতে মারা গেছেন। মহেশপুর (ঝিনাইদহ) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, মহেশপুরে প্রচণ্ড ও হাড় কাঁপানো শীতে ৮ জানুয়ারি প্রচণ্ড শীতে উপজেলার যুগিহুদা গ্রামের আব্দুল আজিজ (৫০) শীতে অসুস্থ হয়ে মারা যান। গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তীব্র শীতে গোপালগঞ্জে ২ বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে কাশিয়ানী উপজেলার চাপ্তা গ্রামের বৃদ্ধা আয়তন বিবি (৬৫) এবং বুধবার রাতে কোটালীপাড়া উপজেলার দীঘলিয়া গ্রামের ওহিদ মুন্সির স্ত্রী ছকিনা বেগম (৬০) শীতে মারা গেছেন ।
মিঠাপুকুর (রংপুর) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুদিনে উপজেলার নাসিরাবাদ গ্রামের জালালউদ্দিন (৮৫) এবং সেরুডাঙ্গা গ্রামের খালেদা খাতুন (৪৫), আয়েশা বিবি (৩৫) ও মালেকা (৩৭) ঠাণ্ডাজনিত রোগে মারা গেছেন।
