গ্যাস -বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কট, উচ্চ সুদের হার, শ্রমিক অসন্তোষ ও বিশ্বমন্দার প্রভাবের পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এ খাতের ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পোশাক খাতের প্রতিবন্ধকতা, ষড়যন্ত্র ও শ্রমিক অসন্তোষের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জেনারালাইজ্ড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) সুবিধা প্রত্যাহারের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এটা পোশাক খাতকে সরাসরি প্রভাবিত না করলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব রয়েছে। এ অবস্থায় পোশাক খাতের উন্নয়নে সরকারকে সুসংহত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। পোশাক খাতের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়ও গঠন করা যেতে পারে।
পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ খাতের জন্য দীর্ঘদিন থেকে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি করা হলেও সরকার এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়নি। ফলে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ খাতের কাজ সম্পন্ন করতে হয়। দেশের অর্থনীতিতে পোশাক খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এ খাতের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি করে পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ২০ বিলিয়ন ডলার আয় অর্জনকারী এই খাতের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় নেই। এটা থাকলে আমরা খুব দ্রুত কাজ করতে পারতাম। এখন আমাদেরকে শিল্প, শ্রম, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দৌড়াতে হয়। তাছাড়া পৃথক মন্ত্রণালয় থাকলে পোশাক খাতের উন্নয়নেও ত্বরান্বিত হতো। সময়ের প্রয়োজনে সরকারের উচিত এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা।
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে রফতানি বাণিজ্যের সিংহভাগই আসে পোশাক খাত থেকে। এ অবস্থায় এ খাতের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈদেশিক বাণিজ্যের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও এ খাতের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই এ খাতটি রক্ষায় ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে থাকা হোতাদেরকে চিহ্নিত করার পাশাপাশি এ খাতের সব সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করার ব্যাপারে সরকারের নজর বাড়ানো দরকার।
সামপ্রতিক সময়ের গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সম্পর্কে তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএ তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে ষড়যন্ত্র ও নাশকতার ঘটনা বলে উল্লেখ করেছে। তবে শ্রম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিজিএমইএ’র এ প্রতিবেদনের সমালোচনা করেছে। সে যাই হোক, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার পাশাপাশি দেশের গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কট তথা অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এমনিতেই দেশের তৈরি পোশাক খাত বেশ ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছুদিন পর পর শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় এ খাত ধাক্কা খাচ্ছে।
২০১০ সালে হামীম গ্রুপ ও গরিব অ্যান্ড গরিব গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ও গত কয়েকদিনে একাধিক গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এ খাতে বড় ধরনের অশনি শঙ্কেত দেখা দিয়েছে। তাই দেশের অর্থনীতিতে পোশাক খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এ খাতের পেছনে প্রকৃতই কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কিনা তা সঠিকভাবে তদন্ত করে বের করা প্রয়োজন। যেন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের যে সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে তা নষ্ট না হয়ে যায়। কারণ গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ও শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় দেশের পোশাক খাত নিয়ে বিশ্ববাজারে নেতিবাচক মেসেজ যাচ্ছে। যা এ খাতের উন্নয়নে একটি বড় বাধা। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ ঘটনা ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের গুরুত্ব অনেক বেশি, তাই অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষায় এ খাতের উন্নয়নে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ খাতের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে ও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হতে পারে। অনেকে প্রতিযোগী দেশের ষড়যন্ত্রের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাই পোশাক খাতের উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা ও ষড়যন্ত্রের প্রকৃত তথ্য ও এর সমাধান করা প্রয়োজন। তাছাড়া পোশাক খাত নিয়ে দেশের ইমেজ ধরে রাখতে কিছু করণীয়ও সরকার নির্ধারণ করতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্বের পোশাক খাতের সবচেয়ে অগ্রগামী দেশ চীন ধীরে ধীরে পোশাক খাত থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পোশাক ক্রেতারা বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছেন। সমপ্রতি বড় বড় কয়েকটি ক্রেতা (বায়ার) কোম্পানিও বাংলাদেশ সফর করেছে। এ অবস্থায় গার্মেন্টস শিল্পের সামপ্রতিক ঘটনা তাদের সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ক্রেতাদেরকে পোশাক খাতের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি সামপ্রতিক ঘটনার নেপথ্য ষড়যন্ত্রকারীদেরকে বের করতে হবে।
জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চার হাজার ৮৮০টি পণ্যে ১২৯টি দেশকে জিএসপি সুবিধা দিয়ে আসছে। বাংলাদেশও কিছু পণ্যে এ সুবিধা পায়। তবে পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের জন্য দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশ চেষ্টা করছে। এজন্য লবিস্টও নিয়োগ দেয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত এ সুবিধা পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় অন্য পণ্যের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা বাতিল করা হলে তা বাংলাদেশের রফতানি খাতের জন্য নেতিবাচক হবে। ২০০৭ সালে বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা বাতিলের আবেদন করেছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শ্রমিক সংগঠনের ইউনিয়ন আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার অ্যান্ড কংগ্রেস অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশন (এএফএল-সিআইও)। ওবামা প্রশাসন সেই আবেদনটি গ্রহণ করেছে। জানা গেছে, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও শ্রম-অধিকার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশে পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিল করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তা জানিয়েও দেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এটি বাতিল হলে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি নেতিবাচক মেসেজ যাবে ক্রেতাদের কাছে। যা রফতানি খাতের জন্য বড় চিন্তার কারণ। তাই এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এমনিতেই শ্রমিক অসন্তোষ, তাজরীনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ও শ্রমিক নেতা আমিনুল নিহত হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ সম্পর্কে বেশ নেতিবাচক মেসেজ বিশ্বে প্রচারিত হয়েছে। এ অবস্থায় এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা বাতিল করা হলে এটি বাংলাদেশের অবস্থানকে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ করবে। তাই জিএসপি সুবিধা বাতিল হলে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব কম হলেও এর পরোক্ষ প্রভাব কম নয়।
