লাইসেন্স হারালো কিংফিশার

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:২৬
ভারতের তৃতীয় শীর্ষ ধনী বিজয় মালয়ের বেসরকারি বিমান কোম্পানি কিংফিশারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। দেনার দায়ে জর্জরিত এ প্রতিষ্ঠানটিকে ভবিষ্যত আর্থিক পরিকল্পনা জমা দিতে কয়েক দফা সময় দিয়েছিল সে দেশের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। এর প্রেক্ষিতে কিংফিশার যে পরিকল্পনা জমা দেয় তাতে সন্তুষ্ট হয়নি কর্তৃপক্ষ। সিদ্ধান্ত হয় লাইসেন্স বাতিলের। তবে কিংফিশার কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এ নিয়ে আমরা মোটেই চিন্তিত নই। তাদের যুক্তি, বিমান পরিচালনা সংক্রান্ত আইনে লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই বছরের মধ্যে পুনরায় নবায়ন করার বিধান আছে। জৌলুসপূর্ণ জীবনের অধিকারী বিজয় মালয়ের সময় ভালো যাচ্ছে না। দেবীর সুদৃষ্টি পেতে সমপ্রতি বিজয় তার ৫৭ তম জন্মদিনে এক মন্দিরে তিন কেজি স্বর্ণ উপহার দেন। চলে আসেন আবারো আলোচনার কেন্দ্রে। এতো কিছুর পরও শুভ সূচনা হয়নি নতুন বছরের। সমস্যা কবলিত বিমান কোম্পানিটির লাইসেন্স বাতিল হলো এ বছরের পহেলা জানুয়ারি। দেনার দায়ে জর্জরিত কিংফিশারের বিমান পরিচালনা বেশ কয়েকমাস ধরেই বন্ধ ছিল। কর্মীদের বেতন-ভাতা কয়েক মাস ধরে বকেয়া রয়েছে। আর বকেয়া বেতনের দাবিতে বিমানের পাইলট, কেবিন ক্রু থেকে শুরু করে সবশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ধর্মঘট পালন করে আসছিল। প্রায় এক দশমিক চার বিলিয়ন ডলার দেনা আছে কোম্পানিটির। কিংফিশার যাতে উড়তে পারে সেজন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে ধরনা দিয়েছিলেন বিজয়। কিন্তু নতুন করে কেউ অর্থ ধার দিতে রাজি না হওয়ায় লাইসেন্স হারালো কিংফিশার। প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, আরব আমিরাত ভিত্তিক ইত্তিহাদ এয়ারওয়েজের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চলছে কিংফিশারের। ইত্তিহাদ ২৪ ভাগ শেয়ার কিনতে পারে কিংফিশারের। যার মূল্য হতে পারে ১৫ থেকে ১৮ বিলিয়ন রুপি। সংশ্লিষ্টরা ্বলছেন, ইত্তিহাদ শেয়ার কিনলে সুদিন ফিরতেও পারে কিংফিশারের। এদিকে গত ৫ জানুয়ারি কিংফিশার কর্তৃপক্ষ স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াসহ অন্য ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আগের পরিকল্পনার মতো একই ধরনের একটি পরিকল্পনা দেন। বলেন, পুনরায় এয়ারলাইনসটি চালু করতে চান। তবে এই পরিকল্পনা তারা গ্রহণ করেনি। ইউনাইটেড ব্রিওয়ারস (ইউবি) কোম্পানির অঙ্গ সংস্থা কিংফিশার এয়ারলাইনসের জন্ম ২০০৩ সালে। ২০০৫ সালের ৯ মে মুম্বাই থেকে দিল্লির উদ্দেশে উড়াল দেয় এর প্রথম ফ্লাইট। ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর নাম লেখায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে। ২০১২ সাল পর্যন্ত এর কর্মী সংখ্যা ৫ হাজার ৬৯৬। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি কখনই লাভের মুখ দেখেনি। বাংলাদেশেও ২০০৯ সালে কিংফিশার ঢাকা-কলকাতা রুটে ফ্লাইট চালু করে। সবচেয়ে কম মূল্যে সেবা দিবে সার্ভিসটি- এ শ্লোগানে ফ্লাইট চালু করলেও ক্রমাগত লোকসানের মুখে ২০১২ সালে বাংলাদেশে ফ্লাইট সেবা বন্ধ করে দেয় এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষের প্রধান অরুন মিরশা বলেন, কিংফিশারের উড্ডয়নের অনুমতি বাতিল হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গত মাসে যে পরিকল্পনার ফিরিস্তি দিয়েছিল তাতে অর্থের যোগানের বিষয়ে বিস্তারিত এবং স্পষ্ট করে কিছু উল্লেখ করেনি। মিরশা এর আগে বলেছিলেন, এয়ারলাইন্সটি তার ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পরিকল্পনা প্রদানে ব্যর্থ হলে তার লাইসেন্সও বাতিল করা হতে পারে। মূলত অনেক দিন বেতন-ভাতা না হওয়ায় পরিবারের আর্থিক দুরাবস্থা সহ্য করতে না পেরে কিংফিশারের এক কর্মীর স্ত্রী সমপ্রতি আত্মহত্যা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক পরিকল্পনার বিষয় জানতে চায়। গত পাঁচ বছর ধরেই ব্যবসায় লোকসান দিচ্ছিল কিংফিশার। বিমানবন্দর, কর কর্তৃপক্ষ ও এবং পাওনাদারদের অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না কিংফিশার। গণমাধ্যমে জৌলুসপূর্ণ বলে যে শব্দটি ব্যবহূত হয়, এই শব্দটি বিজয় মালয়ের জন্য অত্যন্ত সাজুয্যপূর্ণ। বিকিনি পরা নারীদের সঙ্গে ছবির পোজ দেয়া, বলিউডের সেলিব্রিটিদের আড্ডায় হাজির হওয়া, দেহমন চাঙ্গা করতে ব্যক্তিগত ইয়টে ভ্রমণ করা তার শখ। কিংফিশার নিয়ে কিছুটা বিপাকে পড়লেও বিজয় মালয়ের আছে ভারতের সবচেয়ে বড় পানীয়ের ব্যবসা। বিজয় মালয় ১৯৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৩ সালে তার বাবা ভিত্তল মালয় হঠাত্ মারা গেলে মাত্র ২৮ বছর বয়সে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন তিনি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ২০০২ ও ২০১০ সালে কর্ণাটক থেকে রাজ্যসভার সদস্যও নির্বাচিত হন তিনি। অদ্ভুদ কিছু খেয়ালের জন্যও তাকে মনে রাখবেন ভারতীয়রা। ২০০৪ সালে লন্ডনে এক নিলাম থেকে তিনি টিপু সুলতানের তলোয়ার কেনেন। নিউইয়র্কে একটি নিলামে তিনি পেয়ে যান মহাত্মা গান্ধীর ব্যবহার্য কিছু জিনিস। ১৮ লাখ ডলারে তিনি কেনেন গান্ধীর চশমা, একটি পকেট ঘড়ি, গান্ধীর নিজ হাতে তৈরি চামড়ার স্যান্ডেল। শেষ বার গান্ধী যে প্লেট ও বোলে খেয়েছেন সেগুলোও রয়েছে বিজয় মালয়ের কাছে। ভারত সরকার এগুলো তার কাছ থেকে কিনতে অনেক চেষ্টা করলেও বিক্রি করতে রাজি হননি বিজয়।