আমরা সবাই অবগত আছি
যে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার
পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার বেশী থাকাকে ডায়াবেটিস রোগ বলা হয়। চিকিত্সা বিজ্ঞানের
অগ্রগতির তথা জনগনের সচেতনতার কারণে ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিত্সা আজ অনেক সহজসাধ্য ব্যাপার। তবুও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং এর ফলস্বরূপ চোখের সমস্যা তথা প্রতিকারের উপায় ইত্যাদি
সম্পর্কে চোখের ডাক্তার
হিসেবে পাঠক মহলকে
অবহিত করার প্রয়োজন
বোধ করছি।
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি কি
আমাদের চোখের পিছনে
স্নায়ুদ্ব্বারা তৈরী একটি পর্দা আছে যাকে আমরা রেটিনা বলি। বস্তু থেকে আলোক রশ্মি চোখের
ভেতরে ঢুকে ওই বস্তুর প্রতিবিম্ব রেটিনায় পড়ে বিধায় বস্তটি
আমরা দেখতে পাই। রেটিনা হল চোখের সবচেয়ে সংবেদনশীল
পর্দা যাতে অল্প একটু সমস্যা
হলেই আমাদের দৃষ্টি কমে যায়। বহুদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত
ডায়াবেটিস রোগের কারণে রেটিনার সমস্যাকেই ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি বলা হয়।
এই রোগ কেন হয়
ডায়াবেটিস রোগের কারণে
শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছোট
রক্তনালী সরু হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিক রোগীদের চোখের রেটিনার রক্তরালী সরু হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এতে রেটিনাতে অক্সিজেনের অভাবে অপুষ্টিজনিত কারণে প্রদাহ তৈরী হয়। নতুন রক্তনালী তৈরী
হয় যা হতে রক্তপাত হয়, রেটিনাতে পানি জমে ফুলে যায়, ভিট্টিয়াসে রক্তপাত হয় এবং পরবর্তীতে রেটিনা আলাদা হয়ে সরে আসে এবং চোখের চাপ বেড়ে গ্লুকোমা রোগ সৃষ্টি করে বলে অবশেষে রুগী দৃষ্টিহীন হয়ে পড়ে।
এই রোগের লক্ষণ
++এই রোগে আস্তে আস্তে (একসাথে অথবা পর্যায়ক্রমে দ’চোখে) দৃষ্টি কমে যায়। রেটিনা সরে আসার কারণে দৃষ্টি সীমানার যে কোন পাশ কালো দেখা যেতে পারে।
++ভিট্টিয়াসে রক্তপাতের কারণে হঠাত্ করে এক চোখ দৃষ্টিহীন হতে পারে।
++রেটিনাতে পানি জমে ফুলে যাওয়ার কারণে দৃষ্টি ঝাপসা হতে পারে।
++চোখের চাপ বেড়ে গিয়ে ব্যথা বেদনা হতে পারে।
রোগ প্রতিরোধে করণীয়
++প্রথমত চিকিত্সকের পরামর্শ মত পরিমিত ব্যায়াম এবং খাদ্যে অভ্যস্ত হতে হবে।
++ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রিণে চিকিত্সকের পরামর্শে প্রয়োজনে ওষুধ সেবন করতে হবে।
++ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ আছে কিনা তা দেখার জন্যে নিয়মিত রক্তে শর্করার পরিমাণ দেখতে হবে।
++প্রতিটি ডায়াবেটিক রোগীকে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করাতে হবে। ডাক্তার সাধারণত: রিফ্রাকশন করে চোখের পাওয়ার পরিবর্তন হচ্ছে কিনা, স্লিটল্যাম্পের মাধ্যমে ছানি রোগ হল কিনা এবং অফথালমোসকোপের মাধ্যমে চোখের রেটিনার পরীক্ষা করে থাকেন।
যাদের অনেকদিন ধরে
ডায়াবেটিস আছে, তাদের রেটিনোপ্যাথি হওয়া সম্ভাবনা
বেশী থাকে। যে সব রোগী অল্প বয়স হতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অর্থাত্ যারা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইনসুলিন নির্ভর তাদের
পরবর্তীতে রেটিনোপ্যাথি হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে। এসব রোগীদের প্রতি ৪ মাস অন্তর
অন্তর চোখ পরীক্ষা করিয়ে
নেয়া উত্তম।
রোগের প্রতিকার
++অবশ্যই ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
++যদি চোখ পরীক্ষা করে
দেখা যায় যে, রেটিনোপ্যাথি হয়েছে, তাহলে রেটিনার
ছবি এবং এনজিওগ্রাম করিয়ে
নেয়া ভাল। এতে পরবর্তীতে রেটিনার পরিবর্তন এবং রেটিনোপ্যাথির অবস্থান নির্ণয়ে সুবিধা হয়। এনজিওগ্রামের
মাধ্যমে রক্তপাত এবং ভঙ্গুর রক্তনালীর অবস্থান এবং রক্তহীন এলাকা পরিমাপ করা যায়।
++রেটিনোপ্যাথির পরিমাণ যদি খুবই সামান্য থাকে তাহলে কোন চিকিত্সার প্রয়োজন পড়েনা।
++যদি রেটিনায় পানি জমে ফুলে যায়, সেক্ষেত্রে এনজিওগ্রামের মাধ্যমে সমস্যাযুক্ত রক্তনালী
চিহ্নিত করে লেজার চিকিত্সার মাধ্যমে ওই রক্তনালীর রক্তপাত
বন্ধ করা যায় অথবা ভিট্টিয়াসে ট্টাইম সিনোলোন এসিটোনাইড ইনজেকশন অথবা এভাসটিন ইনজেকশন প্রয়োগ করেও
চিকিত্সা করা যেতে পারে।
++যদি রেটিনাতে রক্তহীন এলাকা বেশী থাকে অথবা ভঙ্গুর রক্তনালী বেশী তৈরী হয়, তাহলে পুরো রেটিনা (কেন্ত্রীয় রেটিনা ব্যতিত) লেজার রশ্মির সহায়তায় পুড়িয়ে দেয়া হয়। একে প্যান রেটিনাল ফটোকোয়াগুলেশন বলা হয়।
পরিশেষে বলতে হয়, ডায়াবেটিক রোগী নিয়মিতভাবে চোখ পরীক্ষা করালে তড়িত্ রোগ নির্ণয় এবং চিকিত্সার মাধ্যমে অন্ধত্ব থেকে চোখকে রক্ষা করা যায়।
