নগরীর পিঠা সংস্কৃতি

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৪
পিঠা কেবল উপাদেয় খাবার মাত্র নয়। আমাদের লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। শীত আগমনের প্রস্তুতি প্রকৃতি আর মানুষের মধ্যে যেমন দেখা যায়, তেমনটা অন্য কোনো ঋতুর বেলায় ঘটে না। আমাদের ঐতিহ্যে শীতের সমার্থক নানা আয়োজন থাকে। খাবার, পোশাক উত্সব সব মিলিয়ে শীত একটা অন্যরকম আনন্দ-আমেজ নিয়ে আবির্ভূত হয় আমাদের জীবনে। প্রযুক্তি ব্যবহারে আধিক্য আর পশ্চিমা জীবনধারার ছোঁয়ায় আবিষ্ট থাকলেও আমরা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে পারিনি আমাদের স্বকীয়তা থেকে। তাই নগর জীবনে আমরা যেমন ফাস্ট ফুড, আর চাইনিজ কন্টিনেন্টাল খেতে ভালোবাসি তেমন বুঁদ হয়ে থাকি পিঠার রসে। বাঙালির জীবনে পিঠা ছাড়া শীত ভাবাই যায় না। শীতের অন্যতম অনুষঙ্গ পিঠার কথা হলেই যেখানে কিছুদিনের জন্য গ্রামে যাওয়ার কথা হতো, সেখানে আজ শহরেও সর্বত্রই পিঠার জনপ্রিয়তা দেখা যায়। তাই শীত আসার আগে থেকেই ফুটপাত থেকে শুরু করে পাঁচ তারকা হোটেলের লবিতে বসে বিকালে শহরবাসীর পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে। ড্রইংরুমের নাস্তায়, ছাদের আড্ডায়, পিকনিকে, রাষ্ট্রীয় অতিথি আপ্যায়নে, কোনো প্রদশর্নী উদ্বোধনে শহরে আজকাল পিঠার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তাই এই সময়টায় অলিতে-গলিতে পিঠা বানানোর হিড়িক পড়ে যায়। শীতের পিঠার রকমফের খেজুরের রস পিঠা তৈরির অন্যতম উপাদান। প্রথম দিনের রসকে বলে জিরান কাট। এই রস খুব সুস্বাদু, গুড়ও হয় ভাল। এই গুড়ের পিঠাও তেমনই ভাল। দ্বিতীয় দিনের রসকে দোকাট, আর তৃতীয় দিনের রসকে বলে তেকাট। রস থেকে গুড়, গুড় দিয়ে পিঠা। আবার কখনো রসকে সরাসরি পিঠা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। মোট কথা রস ও গুড় হল পিঠার অন্যতম উপকরণ। চালের গুঁড়া, গুড়, নারিকেল কোরা, মাষকলাইয়ের ডাল, চিনির সিরা, দুধ, কাঁঠাল পাতা এমন আরও নানা উপকরণ ব্যবহার হয় পিঠার ধরনভেদে। নগরজীবনে আমাদের রসনাকে তৃপ্ত করছে যে সকল পিঠা তার মধ্যে ভাপা, চিতই, ভাপা পুলি, রস চিতই, দুধ চিতই, পাটি সাপটা, খির পাটি সাপটা, মাল পোয়া, কলার বড়া, পাতা পিঠা, সেমাই পিঠা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ভাদ্র মাসে আবার আমরা তালের পিঠাও খাই। এছাড়াও আছে যুগযুগ ধরে পুরান ঢাকার পিঠার ঐতিহ্য। শাহী ভাপা পিঠা, খ্যাতা পুরি, গোজা পিঠা, ডিম পিঠা, ঝাল পিঠা প্রভৃতি পিঠা এখানে পাওয়া যায় পরিচিত পিঠার পাশাপাশি। একটি শাহী ভাপা পিঠার দাম ৫০ থেকে ৪০০ টাকা হয় বলে জানান বিক্রেতা মনির। তিন স্তরের হয়ে থাকে এই পিঠা। প্রথমে চালের গুঁড়া দিয়ে তার উপর নারকেল, আবার চালের গুঁড়া এরপর মালাই আবার চালের গুঁড়া ও গুড় দিয়ে বানানো হয় এই শাহী ভাপা পিঠা। চেরি ফল দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করা হয়। শহরের ঘরে কেনা পিঠা নানা ঝামেলা এড়িয়ে পিঠা খাওয়ার শখ পূরণ করতে বেইলি রোডের পিঠাঘর থেকে পিঠা কেনেন ইস্কাটনের শায়লা মাহবুব। শায়লা জানান, এখানকার পিঠাগুলোর দাম রাস্তার পিঠার চেয়ে একটু বেশি হলেও মান ভাল। তাই শীতে তিনি পরিবারের জন্য এখান থেকে পিঠা কেনেন। একবার বাসার পার্টিতেও তিনি এই দোকানের পিঠা নিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করেছেন। পিঠার আইটেমকে সবাই স্বাগতও জানিয়েছে। এলিফেন্ট রোডের বাটা সিগন্যালের বিপরীতে গাড়িতে করে পিঠা বিক্রি করেন মনসুর। আশপাশের বাড়ির অধিবাসীরাও তার নিয়মিত ক্রেতা বলে জানান তিনি। প্রায়ই ৫০/১০০ পিঠা, আবার মাঝে মধ্যে তারচেয়ে বেশি পিঠার ওর্ডার থাকে তার। রাস্তা থেকে চিতা পিঠা কিনে বাড়িতে দুধের সিরায় ভিজিয়ে নেন অনেকে বলে জানান আলাউদ্দিন রোডের পিঠা বিক্রেতা মনির। পিঠার আভিজাত্য শুধু শীতে নয়, সারা বছর পিঠা খাওয়ার সুযোগ আছে ব্যস্ত নগর জীবনে। কাজী গোলাম কিবরিয়া ২০০০ সালে বেইলি রোডে ‘পিঠাঘর’ দোকানটি চালু করেন। গুলশানেও এখন একটি শাখা আছে পিঠাঘরের। কাজী গোলাম কিবরিয়া জানান, দিনদিন শহরের মানুষের মধ্যে পিঠার প্রতি আর্কষণ বাড়ছে। তাই শুরুতে তারা যে কয় পদের পিঠা বিক্রি করতেন এখন আরও কয়েক পদ বেড়িয়েছেন। বনানী, ধানমন্ডি, গুলশান উত্তরাসহ নগরীর অভিজাত দোকানগুলোর খাবারের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে বিভিন্ন রকমের পিঠা। আবার প্রায়ই তাদের কারিগরদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ডাক পড়ে। বিটিভির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, দৃকের প্রদর্শনী উদ্বোধন অনুষ্ঠান, রমনার পিঠা মেলাসহ পিকনিকেও তাদের কারিগররা পিঠা বানিয়ে খাওয়ান। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নায়িকা ববিতা শীতে তার বাসার ছাদে পিঠা বানানোর উত্সব করেন। আর এই উত্সবে সামিল হন ভাই-বোন বন্ধুরা। ববিতা বলেন, বড় আনন্দে কাটে পিঠা খাওয়ার সেই দিন। পিঠা উত্সব জামাই পিঠার রেওয়াজ ছিলো গ্রাম বাংলায়। কোনো বাড়িতে নতুন জামাই এলে আশপাশের মেয়ে বউরা অংশ নিতো সেই জামাই পিঠা বানানোর উত্সবে। সারারাত ধরে চলতো পিঠা বানানো। পিঠা বানাতে বানাতে গান করতো তারা। একটি বিখ্যাত ভাওয়াইয়া গান হল, ‘মনটাই মোর পিঠা খাবার চায়’। আবার নাইওরেও পিঠা দেয়া হতো মেয়ের সঙ্গে। যে বউ বাড়ি থেকে যত বেশি রকম ও সুস্বাদু পিঠা নিয়ে আসতো তাদের কদর ততবেশি হতো বলে জানান বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক। আজ তেমন করে সেই রেওয়াজ না থাকলেও হারিয়ে যায়নি একেবারে। গ্রামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেমন পিঠা পাওয়া যাচ্ছে শহরের রাস্তাঘাঠে তেমন করে চলছে পিঠা উত্সব। বিভিন্ন সংগঠন আর পাঁচতারা হোটেলে পর্যটন দিবস, পৌষ সংক্রান্তিতে আয়োজন করা হচ্ছে পিঠা উত্সব। গত বছর পর্যটন দিবসে (২৬ সেপ্টেম্বর) রূপসী বাংলা হোটেল আয়োজন করেছিল পিঠা উত্সবের। হোটেল কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের বিদেশি অতিথিদের পিঠার প্রতি বিশেষ আগ্রহ লক্ষ্য রেখে এই জানুয়ারিতে আবারও আছে এমন আয়োজন। ১৯৯০ সাল থেকে পৌষ সংক্রান্তিতে পিঠা উত্সব করে আসছে ‘ঢাকাবাসী’। এর সভাপতি শুকুর সালেক বলেন, পিঠা উত্সব এই সময় নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে নগরবাসীর জীবনে। বিলুপ্ত পিঠা বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, আবহমান বাংলায় ছিলো প্রায় দুশ আড়াইশ রকমের পিঠা। যার অনেকগুলো এখন আর নেই। বাঙালি নারীদের রন্ধনশিল্পে বিশেষ অবদান ছিলো। নারীরা বসে মনের মাধুরি মিশিয়ে নানা রকমের নকশি পিঠা বানাতেন। নকশি পিঠা, ফুলপিঠা, চন্দ্রপুলি, পাকনপিঠা, মোরগ সমসা, চিলি পিঠা, দুধ কুলি পিঠা, খিরশা পিঠা, গোকুল পিঠা, রসফুল লবঙ্গ লতিকা, বিবিখানা পিঠা প্রভৃতি এখন আর তেমন দেখা যায় না। মোরগের মাংস রান্না করে চালের গুড়ার সেদ্ধ খামির করে মোরগের মতো ডিজাইন করা হতো আর ভেতরে দেয়া হত রান্না করা সেই মাংস, তারপর ভাজা হত গরম তেলে। কত না সুস্বাদু ছিল সেই পিঠা! নগরের নারীদের পিঠা বানানো শেখা পড়াশুনা আর ক্যারিয়ারের ভাবনায় আজকের শহুরে নারীরা পিঠা বানানো কিংবা ঘরকন্নার কাজ শেখার অবকাশ পাই না। তবে প্রিয়জনদের নিজের হাতের পিঠা খাওয়াতে এবং পিঠা উত্সবে অংশ নিতে আজকাল রান্না শেখার স্কুলগুলোতে ভীড় জমাচ্ছেন আধুনিকারা। সাকসেস মহিলা ট্রেনিং সেন্টারের স্বত্বাধিকারী আফরোজা জামান জানান, শীত এলেই তার স্কুলে নারীরা পিঠা বানানো শিখতে আসেন। পিঠাশিক্ষার্থী নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অনলাইনে পিঠা আজকাল তথ্য-প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন কেনাকাটার ধুম পেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এখন নগরীতে অনলাইনে পিঠা কেনা-বেচা চলছে। বিভিন্ন দোকানের ওয়েবসাইটে ঢুকে দেশ-বিদেশ থেকে পিঠা কেনা যায়। এরকমই একটি ওয়েবসাইটের ঠিকানা হলো www.giftinbangladesh.com. উত্সব হবে তাত্পর্যপূর্ণ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন কিশোরগঞ্জের নকশি পিঠাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। পৌষ পার্বনে তখন থেকে ঢাকায় সেই পিঠার রেওয়াজ শুরু হয় বলে জানায় বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের পরিচালক সুবির চৌধুরী। তিনি বলেন, অঞ্চল ভেদে পিঠার ঐতিহ্য আলাদা। যেমন কিশোরগঞ্জ, বরিশাল, হবিগঞ্জ, বিক্রমপুর প্রভৃতি এলাকায় নানা ধরনের পিঠার প্রচলন ছিল এবং আছে যা আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ। বাংলা একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী এবং বেঙ্গলের মতো প্রতিষ্ঠান যারা দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেন, তাদের উচিত অঞ্চল ভেদে পিঠার ঐতিহ্যকে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করা। আমরা চাই বিলুপ্ত পিঠাগুলোও থাকবে আমাদের উত্সবগুলোতে।