রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি’র পক্ষে এবং বিপক্ষে আন্দোলন ও সহিংস ঘটনার জের ধরে বৃহস্পতিবার রাতে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পর গতকাল শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও আন্দোলনরত দুর্নীতি বিরোধী মঞ্চ পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার জন্য একে অপরকে দায়ী করে।
রংপুর সদর থানা পুলিশ গতকাল রাতে ড. তুহিন ওয়াদুদের ওপর এসিড নিক্ষেপের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রকে গ্রেফতার করেছে। তারা হলো—মেহেদী হাসান শিশির, মো. আলী রাজ ও হাদীউজ্জামান হাদী। ড. তুহিন গতকাল বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন।
অপরদিকে গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের সময় ব্যাটারি ভেঙ্গে এসিডে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ শিক্ষক আহত হওয়াসহ সহিংস ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতাদের জড়িত করে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও রংপুর জেলা ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, সিনিয়র সহ-সভাপতি মনোয়ারুল ইসলাম মাসুদ, ছাত্রলীগ নেতা সোহেল রানা ইমন জানান, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কোন সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই। ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে কতিপয় দুষ্কৃৃতকারী নানা অপকর্ম করছে। ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ সহিংস ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত তাদেরকে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ভিসি বিরোধী আন্দোলন কিংবা তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব ছাত্রলীগের কাজ নয়।
এ ব্যাপারে রংপুরের পুলিশ সুপার আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সহিংস ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান শুরু হয়েছে। মামলা হলে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অফিস কাম-রেসিডেন্স ভবনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে প্রফেসর ড. মু. আব্দুল জলিল মিয়া লিখিত বক্তব্যে বলেন, ১০ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশকে যারা ভণ্ডুল করার চেষ্টা করেছে তারা স্বাধীনতার শত্রু। একটি মহল জামায়াত-শিবিরকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দাবি আদায়ের অজুহাতে বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ওইদিন বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে সভার আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা। একই দিনে আন্দোলনকারী গুটিকয়েক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী দুর্নীতি বিরোধী মঞ্চ করে ওই সমাবেশ ভণ্ডুল করার চেষ্টা করে। ফলে শিক্ষার্থীরা সচেতন শিক্ষক সমাজের শিক্ষকদেরকে আন্দোলন বন্ধ করে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের অনুষ্ঠানে যোগদানের অনুরোধ জানায়। এতে তাদের সাথে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সমাবেশস্থলের মাইক ভাংচুর করে। একপর্যায়ে মাইকের ব্যাটারি ভাঙ্গা হলে সেই ব্যাটারি থেকে এসিড ছিটকে গিয়ে ২ জন শিক্ষক আহত হন। তিনি বলেন, আমি যতটুকু শুনেছি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এসিড নিক্ষেপ করেনি। এ ঘটনায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, শীঘ্রই বিষয়টি তদন্ত করার জন্য কমিটি গঠন করা হবে এবং তদন্তে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে গতকাল দুপুরে দুর্নীতি বিরোধী মঞ্চের উদ্যোগে স্থানীয় একটি হোটেলে ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুল জলিলের অপসারণের দাবিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ শনিবার রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন। আগামীকাল রবিবার সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ডিসি-এসপি অফিসে স্মারকলিপি প্রদান। এছাড়া যেদিন বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হবে ওইদিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমরণ অনশন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ অন্যান্য আন্দোলন আবার শুরু করা হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
এ ব্যাপারে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুল জলিল মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইত্তেফাককে জানান, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত ও নিয়মবিধি মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগসহ সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গত ৩ বছর থেকে একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ করছে। যার কোন ভিত্তি নেই। এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সদস্য, শিক্ষক সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, দুর্নীতি বিরোধী মঞ্চের অন্যতম সংগঠক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সানওয়ার সিরাজ ভিসি’র অপসারণের জন্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীর সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
