হূদয়ে মাটি ও মানুষ আয়োজিত ‘ফিরে চল মাটির টানে’, তৃতীয় বর্ষের বোরো মৌসুম চলছে

শরীরে মাটির গন্ধ মেখে

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৮
হাড় কাঁপানো শীত। ঠক ঠক করে কাঁপছে মানুষ। ঘন কুয়াশার চাদরে মোড়া চারদিক। সূর্যের দেখা নেই। কচি ধানের পাতার উপর শিশির দোলা খাচ্ছে। জুবুথুবু প্রকৃতি। মনে হচ্ছে তখনও ভাঙেনি ঘুম। এর মধ্যেই মাঠে নিত্য দিনের মত কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে কৃষক। মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার আড়িয়াল বিল। বিলের ভেতরের একটি গ্রাম কৈয়টখালি। ওই গ্রামে সাতসকালে এসেছে চার অতিথি। দুজন তরুণ, দুজন তরুণী। পোশাকের আভিজাত্য আর চাল চলন বলে দেয়, ওরা রাজধানীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছে। ওরা গ্রামবাসীর কোনো আত্মীয় নয়। কিন্তু গড়তে এসেছে সম্পর্ক। দোস্তি করতে এসেছে মাটি ও ফসলের সঙ্গে। জানা গেল, দিন মজুরির ভিত্তিতে ওরা মাঠে এসেছে কাজ করতে। হাষাড়ার শ্রমিকের হাট থেকে দরদাম করে ওদের কাজে এনেছেন কৃষক তাজুল ইসলাম। রাতে মেয়ে দু’জন থাকবে তাজুল ইসলামের বাড়িতে। আর ছেলে দু’জন থাকবে আর পাঁচজন কৃষিশ্রমিক যেখানে থাকে, সেখানে- কেয়টখালি গ্রামেই রাস্তার পাশের জরাজীর্ণ এক কুটিরে। স্থানীয় বাজারে একজন শ্রমিকের প্রতিদিনের মূল্য যেখানে চার’শ টাকা আর অন্তত দু’বেলা খাওয়া সেখানে কৃষিকাজে অনভিজ্ঞ ওই চারজনকে নেয়া হয়েছে সর্বমোট চার’শ টাকা আর একবেলা খাবারের চুক্তিতে। কৃষিকাজ না জানার কারণেই ওরা সানন্দেই মেনে নিয়েছে এই মজুরি। এভাবেই একেকটি নতুন নতুন ঘটনা জন্ম দিতে দিতে এগিয়ে চলেছে ‘ফিরে চল মাটির টানে’ নামক নাগরিক শিক্ষার্থীদের গ্রাম ও কৃষিমুখি করে তোলার অনবদ্য এক কার্যক্রম। যেটির আয়োজন করেছে চ্যানেল আই এর হূদয়ে মাটি ও মানুষ। এবার চলছে এ কার্যক্রমের তৃতীয় বর্ষের বোরো মৌসুম। কয়েক দফা বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর দু’জন শিক্ষার্থী আসিফ ও অনন্যা এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস এর ফয়সল ও সাদিয়া। ইতোমধ্যেই তারা নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে কেয়টখালী গ্রামের কৃষক তাজুল ইসলামের দিনমজুর কৃষিশ্রমিক হিসেবে বোরো বীজতলা থেকে চারা তোলা, যন্ত্রলাঙল চালিয়ে মাঠ প্রস্তুত করা, চারা রোপণসহ ধান আবাদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধাপের কাজ শেষ করেছে। ধান রোপণের পনের দিন পর মাঠের আগাছ পরিস্কার করে সারও প্রয়োগ করেছে ওরা। কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের কৃষি বিষয়ক কার্যক্রম হূদয়ে মাটি ও মানুষের ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগের একটি হচ্ছে এই ‘ফিরে চল মাটির টানে’। অনুষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ বলেন, তথ্য প্রযুক্তি ও আকাশ সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ শহরের নতুন প্রজন্মকে অনেকটাই নিজস্বকেন্দ্রিক করে তুলছে। তার ভাবনা ও কাজের জায়গাটি হয়ে পড়ছে জনবিচ্ছিন্ন। কম্পিউটার ও মোবাইল প্রযুক্তি তাকে নিয়ে যাচ্ছে ঘোরের ভেতর। যেখানে তথ্য আছে, আবিষ্কার আছে কিন্তু সমাজ ও জীবন বাস্তবতা নেই। কিন্তু কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের জীবন ও সংস্কৃতির সবকিছুই যেখানে কৃষি ও গ্রামীণ জীবননির্ভর, সেখানে শহরের নানাবিধ সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে যদি সেই জায়গাটিই অনুপস্থিত থেকে যায় তাহলে আমাদের ভবিষ্যত যে খুব বেশি অনুকূল হবে না তা এখনই অনুমান করা যায়। সে কারণেই ফিরে চল মাটির টানের এই আয়োজন। আমি বিশ্বাস করি, আজ শহরের যে ছেলে বা মেয়ে এভাবে গ্রামে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, তারা বাংলাদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের সামনে এক উদাহরণ, এক অনুপ্রেরণা, যা আমাদের একটি উন্নত ভবিষ্যত গড়ার ক্ষেত্রে রাখবে অনেক বড় ভূমিকা। শহরের আবহ থেকে গ্রামের আবহে কাজ করা। ইউনিভার্সিটির পড়াশোনা ছেড়ে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের সাথে সামিল হওয়া। কাজটি মোটেও সহজ নয়। তবু তারা কাজের সাথে মিশে যাওয়ার ক্ষেত্রে দেখিয়েছে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা। কারণ সেখানেও ছিল প্রতিযোগিতা। এ কার্যক্রমে ছিল চার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কৃষি সম্পর্কিত সার্বিক ধারণা অর্জনের বিষয়। কৃষিশ্রমিকের মর্যাদা, শ্রম অনুযায়ী মজুরি, কৃষি কাজের ক্ষেত্রে কৃষকের সমস্যাগুলো, গ্রামীণ জীবনের সংকট ও সমস্যা থেকে শুরু করে নানা বিষয়। ওই চার শিক্ষার্থীকে একরাতের স্বনির্ভর জীবনযাপনের স্বার্থেই তাদেরকে যেতে হয়েছে গ্রামের বাজারে। বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী কিনতে গিয়েই তাদের উপলব্ধিতে এসেছে স্বল্পায়ী মানুষের নিত্যদিনে সংগ্রাম কত কঠিন। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষকের ত্যাগ ও অবদান কত বড়। অংশগ্রহণকারী চারজনই বলেছে, আমাদের জীবনে এ এক অন্যরকম প্রাপ্তি। এ কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ না পেলে এভাবে কৃষি ও কৃষক এবং গ্রামীণ জীবনকে কখনোই দেখা হত না। আমরা জানতামই না, দেশের মূল শক্তি আসলে কোথায়। গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে পৃথক পৃথকভাবে ওই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দু’হাজার শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে প্রাথমিকভাবে ২৬জন করে বাছাই করা হয়। পরে চ্যানেল আই কার্যালয়ে স্বাস্থ্যপরীক্ষাসহ নানামুখী পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয় চারজন। ফিরে চল মাটির টানের প্রথম পর্যায়ে দু’দিনের কার্যক্রমে চার শিক্ষার্থী বীজতলা থেকে বোরো চারা উত্তোলন, চারা রোপণ ও গুটি ইউরিয়া প্রয়োগসহ বিভিন্ন কৃষিকাজে অংশ নেয়। আগামী এপ্রিলে ওই একই ক্ষেতের বোরো ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়া, শুকানো থেকে শুরু করে গোলাজাত করার কাজটিও করবে ওরা। এর মধ্য দিয়েই শেষ হবে ফিরে চল মাটির টানের তৃতীয় বর্ষের বোরো মৌসুমে মাঠ পর্যায়ের ব্যবহারিক কাজ। পরে ওই চার শিক্ষার্থী তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে পৃথক পৃথকভাবে রিপোর্ট তৈরি করবে। রিপোর্ট হস্তান্তর উপলক্ষে ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আয়োজন করা হবে অভিজ্ঞতা বিনিময় অনুষ্ঠান।