হাড়কাঁপানো শীতের রাতটা ফুরাতে চায় না ফুটপাতের বাসিন্দাদের

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২৯
হাড় কাঁপানো শীতের রাত। ফুটপাতে সারি সারি ঘুমন্ত মানুষ। আবার কোথাও কাগজ কুড়িয়ে আগুন লাগিয়ে শরীর একটু গরম করার চেষ্টা। শীতে কাঁপতে কাঁপতে কারো কারো দাঁত মুখ লেগে যায়, কথা বলতে পারে না। এমনিতেই নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মলমূত্রের পাশে রাত কাটাতে হয় তাদের। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভয়াবহ শীত। দরিদ্র এ মানুষগুলোর অধিকাংশ দিনরাত কাটে অর্ধাহারে অনাহারে। গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে দেখা গেছে, খোলা আকাশের নিচে, পলিথিন গায়ে দিয়ে কেউ ফুটপাতে বসে আছেন কেউ শুয়ে আছেন। কাওরান বাজার, মতিঝিল সরকার কলোনী (চার কলোনী), কমলাপুর, নিলক্ষেত ও সদরঘাট ফুটপাতে সবখানেই একই চিত্র। তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন দুর্বিষহ দিনরাত্রির কথা। বলেন, হাড় কাঁপানো শীতের রাত যেন ফুরাতে চায় না। প্রতি মিনিট মনে হয় যেন এক একটি ভয়ংকর রাত। এদের অনেকেই শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত। মাঝে মাঝে দয়াবশত কেউ কেউ কম্বল দেন। আবার সে কম্বলও এক শ্রেণীর মাদকাসক্ত ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ঐ রাতে জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ফুটপাতের বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে। কাওরান বাজার কাওরান বাজার কাঁচাবাজারে পরিবহন থেকে তরিতরকারী উঠা নামানোর কাজ করে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। এদের মধ্যে দুই সন্তানের জনক শাহ আলম (২৫) তরকারি ট্রাকের অপেক্ষায় ওয়াসার সামনে ফুটপাতে বসে আছেন। গায়ে মাত্র একটি ফুল শার্ট। নোংরা ও ময়লা। শীতে সে কাঁপছিল। দুইটি শিশু সন্তানের আহার জোগাড় করতে হবে শাহ আলমের। প্রতিদিন কাঁচা তরিতরকারি উঠানামা করে সে ৫শ টাকা পায়। এ দিয়ে চলে সংসার। ভ্যান চালক বাবুল (২৮) অপেক্ষায় ছিল কখন তরকারি বহনকারী ট্রাক আসবে। সেও শীতে কাঁপছে। ভোর পর্যন্ত সে ট্রাক থেকে মাল আড়তে পৌঁছে দেয়। ৫ জনের পরিবারে জন্য আহার জোগাড়ে সে ব্যস্ত। দিনমজুর রফিক কাওরান বাজারে তরকারি কুড়ায়, সেগুলো তিনি বিক্রি করেন। থাকেন ফুটপাতে। শীতে হাঁটু মুড়ে বসে তিনি কাঁপছিলেন। শ্বাসকষ্ট তার। এই শীতে তার এ রোগ দেখা দিয়েছে বলেন। বৃদ্ধা শাহনাজ বেগমও (৫২) তরকারি কুড়ান। চার মেয়ে চলে তার আয়ের উপর। স্বামী নেই। এ আয় দিয়ে এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ১৫ বছর কাওরান বাজার ফুটপাতে থাকছেন তিনি। মতিঝিল কলোনী মতিঝিল চার কলোনীর মাঝে ফুটপাতের বাসিন্দা শামসুন নাহার (৫০), শাহিদা বেগম (৫৩), রহিমা বেগম (৬০), জুলেখা বেগম (৬২), হামিদা বেগম (৬৫), খোদেজা বেগম (৭০) ও আনোয়ারা বেগমের (৬৫) কথা বলার সময় তারা শীতে কাঁপতেছিল। গায়ে কাপড় পর্যন্ত পড়ে যাচ্ছিল। থর থর করে তাদের হাঁটুসহ কাঁপানোর শব্দ। মাঝে মাঝে কম্বল কয়েক দানশীল কিংবা বিভিন্ন সংস্থা দিয়ে গেছে। ঐ সব সংস্থা যাওয়ার পর মাদকাসক্ত একশ্রেণীর তরুণরা ঐ কম্বল নিয়ে যায়। তারা ছেড়া কাথা কিংবা পলিথিন দিয়ে কোন রকমে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাত কাটেন। শিশু সন্তানদের চিত্কারে তাদের রাত কাটে চোখের জলে। মাদকাসক্ত তরুণদের কথার বাইরে কিছু বললে তারা সেখানে থাকতে পারবে না। নানা নির্যাতন তাদের ওপর চলে আসে। এ ভয়ে তারা নীরবে সব অত্যাচার ও নিপীড়ন সহ্য করে যান। এমন প্রতিক্রিয়া তারা জানান। তাদের মধ্যে বেশির ভাগ শ্বাসকষ্ট ও খোচ-প্যাঁচড়া রোগী। কমলাপুর রেল স্টেশন কাশেম (৬৫) ও তার স্ত্রী আসমাকে নিয়ে রাত কাটান কমলাপুর রেলস্টেশনে। দিনে কাওরান বাজার ফুটপাতে তরকারি বিক্রি করে। এক যুগ কাটিয়ে দেন ঐ ফুটপাতে। তাদের চার মেয়ে এক ছেলে। জামালপুর বাহাদুরাবাদ এলাকায় তাদের বাড়ি। শীতে স্বামীকে কাঁপতে দেখা যায়। সমর আলী (৫৫), শরীফ মিয়া (৬০), রুহুল আমিন (৬৫), ইদ্রিস আলী (৭৫), খাদিজা খাতুন (৬০), সুরুজ আলী (৭০) ও আব্দুল মতিন (৬৫) শীতে থর থর করে কাঁপতে ছিল। তাদের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। কম্বল দিয়েছিল এবং ঘণ্টা খানেক পরে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। সদরঘাট ও নিলক্ষেত ফুটপাতে রাতে বাসিন্দাদের একই দৃশ্য দেখা যায়। তাদের মধ্যে অনেকে ক্ষুধা নিবারণ কিংবা পরিবারের আহার জোগাড়ে কম্বল বিক্রি করে দিয়েছেন। তাদের কাছে শীতের চেয়ে পেটের জ্বালা অনেক বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ আগুন পোহাইয়ে কিংবা চিপা পথে কিংবা সিড়ির নীচে গায়ে লুঙ্গি দিয়ে কোন রকমে রাত পার করে দেন। এমন দৃশ্য দেখা যায়। জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত হাড় কাঁপানো শীতের রাতে ফুটপাতের বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়ান। কম্বল বিতরণ করেন। ড. বারাকাত ফুটপাতে বাসিন্দার কাছে বসে তাদের শারীরিক খোঁজ-খবর নেন। ঐ রাত পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের উদ্যোগ সহস্রাধিক কম্বল ফুটপাতের বাসিন্দাদের মাঝে বিতরণ করা হয়। বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন জনতা ব্যাংকের সিইও ও এমডি এসএম আমিনুর রহমানসহ শীর্ষ ব্যাংক কর্মকর্তাগণ।