দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি, দেশের কল্যাণ, মুসলিম উম্মাহ্র ঐক্য ও বিশ্বশান্তি কামনা করে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে গতকাল রবিবার শেষ হলো তাবলিগ জামাত আয়োজিত বিশ্ব ইজতেমার ১ম পর্ব। বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ এ আখেরি মোনাজাতে আত্মশুদ্ধি ও নিজ নিজ গুনাহ মাফের পাশাপাশি দুনিয়ার সব বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করার জন্য দুই হাত তুলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে রহমত প্রার্থনা করা হয়। এ সময় ‘আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে মধ্যাহ্নের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে মহামহিম ও দয়াময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি লাভের আশায় লাখ লাখ মুসল্লি আকুতি জানান। মোনাজাত পরিচালনা করেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরব্বি দিল্লীনিবাসী মাওলানা জোবায়েরুল হাসান। তিনি আরবি ও উর্দু ভাষায় মোনাজাত করেন। গতকাল প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাতে প্রায় ২৫ লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।
রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান বঙ্গভবনের দরবার হল থেকে, গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও টঙ্গীর এটলাস বাংলাদেশ লি:-এর ছাদে বিশেষভাবে নির্মিত প্যান্ডেলে বসে বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া মোনাজাতে অংশ নেন। গণভবন সূত্র জানায়, মোনাজাতে অংশ নেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার পরিবারের সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণবভনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মোনাজাতে শামিল হন। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী সাহারা খাতুন, রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক, বেবী মওদুদ এমপি, লুত্ফুন নাহার লাইলী এমপি, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আবদুস সোবহান গোলাপ এসময় উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া টঙ্গীর টেলিফোন শিল্পসংস্থার মাঠে অবস্থিত পুলিশ কন্ট্রোলরুমে থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল, আ ক ম মোজাম্মেল হক ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আমির হোসেন আমু মোনাজাতে অংশ নেন। এ ছাড়া সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাসহ দলমত, শ্রেণীপেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মুসলমান আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন।
অপরদিকে বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গতকাল রবিবার ইজতেমা ময়দান সংলগ্ন এটলাস বাংলাদেশ লিঃ -এর ছাদে বিশেষ ভাবে নির্মিত একটি প্যান্ডেলে বসে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন। তিনি পৌনে বারটার দিকে ওই প্যান্ডেলে এসে উপস্থিত হয়ে বয়ান শুনেন। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম এ মান্নান, ডাঃ এজেডএম জাহিদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আমান উল্লাহ আমান, সেলিমা রহমান, হাসান উদ্দিন সরকার, জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন, সাধারণ সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহানশাহ আলম প্রমুখ।
বেলা ১টা ১ মিনিটে শুরু করে ১৭ মিনিট স্থায়ী এ আখেরি মোনাজাত চলাকালে সমগ্র ইজতেমাস্থল ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আমিন আমিন ধ্বনিতে চারপাশ প্রকম্পিত হয়ে উঠে। এ বছর আখেরি মোনাজাতে সারা বিশ্বের সর্বত্র দ্বীন চালু, মুসলিম জাহানের হেফাজত ইসলামের সকল আয়োজন ও পরিশ্রম কবুল করার জন্য মহান আল্লাহতায়ালার অফুরন্ত রহমত কামনা করা হয়। আগামী ১৮ জানুয়ারি বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে।
ইজতেমাস্থলে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়ক, আশুলিয়া-সাভার সড়ক এবং উত্তরা মডেল টাউনসহ আশপাশের এলাকা থেকে অগণিত মুসল্লি মোনাজাতে অংশ নেন। এ ছাড়া অসংখ্য মুুসল্লি স্থানাভাবে ইজতেমাস্থলের খালি জায়গা, মিল-কারখানার অভ্যন্তর ও ছাদে, ঘরবাড়ি, বেড়িবাঁধ, বিভিন্ন যানবাহনে উঠে এবং নৌকায় বসে মোনাজাতে শরিক হন। অনেকেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মোনাজাতে শরিক হন। ইজতেমা ময়দানের বাইরে পর্যাপ্ত মাইক না থাকায় বহু ধর্মপ্রাণ মুসলমান সময়মতো আখেরি মোনাজাতে শামিল হতে গিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন। শনিবার রাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে ও টঙ্গী আশুলিয়া সড়কে যানবাহন চলাচলে বিধি নিষেধ থাকায় ওই সড়কে যাতায়তকারী সাধারণ মানুষ ও মুসল্লিদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। তারা পায়ে হেঁটে ইজতেমা স্থলে আসেন। আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে গতকাল এ এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কল-কারখানাসহ বিভিন্ন অফিস ছুটি ঘোষণা করা হয়।
ইজতেমার বয়ান :গতকাল রবিবার ফজরের পর থেকে বয়ান করেন বাংলাদেশের মাওলানা জমির উদ্দিন। আখেরি মোনাজাতের আগে বয়ান করেন তাবলিগ জামাতের অন্যতম মুরুব্বি ভারতের হযরত মাওলানা মোহাম্মদ শা’দ। বাংলায় তা তরজমা করেন বাংলাদেশ তাবলিগের মজলিসে শূরার সদস্য কাকরাইল মসজিদের ঈমাম হাফেজ মাওলানা জোবায়ের। আখেরি মোনাজাতের আগে হযরত মাওলানা জোবায়েরুল হাসান দ্বীনের দাওয়াতে তাবলিগের গুরুত্ব তুলে ধরে বয়ান করেন।
বিদেশি মেহমান ১৬ হাজার :এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ কমপক্ষে ৯০টি দেশের তাবলিগ জামাতের প্রায় ১৬ হাজার বিদেশি মেহমান এবারের ইজতেমায় অংশগ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক বিদেশি মেহমান আগমন করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তাবলিগের কাজে বের হওয়ার জন্য এবার ইজতেমা স্থলে প্রথম পর্বে প্রায় ৫ হাজার জামাত তৈরি হয়েছে বলে ইজতেমার আয়োজক সূত্রে জানাগেছে। আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে এসব জামাত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে জানিয়েছে তাবলিগ সূত্র ।
আরো সাত মুসল্লির মৃত্যু :শনি ও রবিবার দুপুর পর্যন্ত টঙ্গীর তুরাগ তীরে আসা মুসল্লিদের মধ্যে একজন ভারতের পশ্চিম পরগনার নাগরিকসহ মোট ৭ জন মারা গেছেন। এরা হচ্ছেন- রংপুর কোতয়ালি থানার জলচর গ্রামের খলিলুর রহমান (৬০), ফরিদপুরের বোয়ালমারি থানার মাকাদা গ্রামের আলাউদ্দিন শেখ (৫০), চাঁদপুর জেলার উত্তর দামদী গ্রামের আবুল খায়ের পাটোয়ারী (৬০), যশোরের মনিরামপুর থানার তেঁতুলিয়া গ্রামের সৈয়দ আলী খান (৬৫), শেরপুর জেলা সদরের সারোয়ার হোসেন (৬০), ভারতের পশ্চিম পরগনার বিদেশি নাগরিক রফিক উদ্দিন (৬৩) ও যশোরের কেশবপুরের আনছার আলী ( ৭৫)। এরা সকলেই ইজতেমা ময়দানে হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। এ নিয়ে প্রথম পর্বে ইজতেমায় মুসল্লিদের মৃতের সংখ্যা ১২ জনে দাঁড়িয়েছে।
৫৩ মুসল্লি হাসপাতালে ভর্তি :সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ মোঃ হাবুিল্লাহ জানান, রবিবার বিকাল পর্যন্ত ৪ দিনে ইজতেমায় আগত ১০ হাজার ৩২৯ জন মুসল্লি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হলে টঙ্গী সরকারি হাসপাতাল ও সরকারি ভাবে স্থাপিত ৪টি অস্থায়ী চিকিত্সাকেন্দ্রে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে। তন্মধ্যে ৯৪ জন মুসল্লিকে টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং ২৫ জন রোগীকে উন্নত চিকিত্সার জন্য ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে।
আরো ১৩ পকেটমার আটক:ইজতেমা মাঠ ও আশপাশের এলাকা থেকে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা চুরি, ছিনতাই, পকেটমারসহ বিভিন্ন অপরাধে গতকাল রবিবার বিকাল পর্যন্ত আরো ১৩ জনকে আটক করেছে। তাদেরকে গাজীপুর কোর্টে প্রেরণ করা হয়েছে। এ নিয়ে গত ৪ দিনে আটকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৫ জনে।
মুসল্লিদের দুর্ভোগ :এ বছর ইজতেমা মাঠের বাইরে পর্যাপ্ত মাইক সংযোগের অভাবে বহু ধর্মপ্রাণ মানুষ বয়ান শুনতে এবং মোনাজাতে শামিল হতে দারুণ অসুবিধা ও ভোগান্তিতে পড়েন। ইজতেমা ময়দানের প্যান্ডেলের বাইরে মাইক সংযোজন ব্যবস্থা না নেয়ায় অনেক মুসল্লি ক্ষোব প্রকাশ করেন। বিশ্ব ইজতেমা মাঠে মহিলাদের কোন প্রকার সুযোগ সুবিধা না থাকলেও মোনাজাতে শরিক হতে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মহিলা টঙ্গীর আশপাশে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে অবস্থান নিয়ে মোনাজাতে অংশ নেয়। আবার অনেকে নদীর পাড়ে বা আশপাশে খোলা আকাশের নীচে অবস্থান নেন তারা। অজু, গোসল, খাওয়া-দাওয়াসহ ভোগান্তির শেষ ছিল না তাদের।
মোনাজাত শেষে যানজট :আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থান থেকে আশা মানুষ নিজ গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করে। আগে যাওয়ার জন্য মুসল্লিরা তাড়াহুড়া করতে শুরু করে। এতে টঙ্গীর আশপাশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ জনজট ও যানজট।
