প্রবাসে আগুন পিছু ছাড়ছে না নবীনগরের শ্রমিকদের!

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৯
প্রবাসে আগুন যেন পিছু ছাড়ছে না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের শ্রমিকদের! অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মরা যেন তাদের নিয়তি হয়ে গেছে। এই নবীনগরেরই ৫ জন শ্রমিক এর আগে মালয়েশিয়ায় অগ্নিকাণ্ডে মারা গিয়েছিলেন। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে নবীনগরের ৫ শ্রমিক এবারও অগ্নিকাণ্ডে মারা গেলেন। হতভাগ্য শ্রমিকদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় সেলানগর জেলার পুচং শহরে গত বছরের ৭ জুলাই রাতে একটি ভবনে আগুন লেগে দুই সহোদরসহ পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছিল। তাদের বাড়ি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বড়িকান্দি ইউনিয়নে। ওই ইউনিয়নের ধরাভাংগা গ্রামের ২ জন, নূরজাহানপুর গ্রামের ১ জন ও বাড়িকান্দি গ্রামের ২ সহোদরসহ ৫ জন মারা যায়। তাদের পরিবারের সদস্যদের শোকের ছায়া মিলিয়ে না যেতেই একই ঘটনায় রবিবার বাহরাইনে নবীনগরের দুই সহোদরসহ পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যু হলো। সন্তান হারা পিতা-মাতার কান্না যেন ঠাঁই নিয়েছে গোটা নবীনগরবাসীর চোখে। বাহরাইনে অগ্নিকাণ্ডে মৃত শ্রমিকরা হচ্ছেন- উপজেলার কাইতলা গ্রামের শহিদ মিয়ার দুই পুত্র স্বপন (২৬) ও সাইফুল ইসলাম সবুজ (২০), গোয়ালী গ্রামের আবু নাসের মিয়ার পুত্র শাহজাহান ওরফে জসিম (৪৫), নাটঘর ইউনিয়নের খরিয়ালা গ্রামের চান মিয়ার পুত্র জারু মিয়া (৩০) এবং গুড়িগ্রাম গ্রামের আবুল বাশার মিয়ার পুত্র আনোয়ার হোসেন (৩০)। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম নাজিম উদ্দিন জানিয়েছেন, জনশক্তি ব্যুরোর কুমিল্লার আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের সাথে কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, বাহরাইন থেকে তাদের লাশ আনার ব্যাপারে সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। প্রতিটি পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। গতকাল উপজেলার কাইতলা, বিটঘর ও নাটঘর এই তিনটি ইউনিয়নের পাঁচ পরিবারে গিয়ে দেখা যায় এক হূদয়বিদারক দৃশ্য। প্রতিটি ঘরে চলছে আহাজারি। কাইতলার সাজেদা বেগম তার তিন পুত্রের মধ্যে দু’জনকে হারিয়ে পাগল প্রায় । অনেক কষ্ট করে জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। তিনি বার বার বলছিলেন, ‘আল্লাহ আমার সব কাইড়া নিল’। বার বার বলছেন, আমার ছেলের লাশ এনে দাও। ৯ বছর আগে তার বড় ছেলে স্বপন বাহরাইনে যান। মাত্র গত মাসে তিনি ছোট ভাই সবুজকে নিয়ে যান। বড় ভাই সুমন কাইতলা বাজারে ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, প্রবাসী দুই ভাইয়ের আয়ে সংসারটি বেশ ভাল হয়ে উঠছিল । অপরদিকে, কাইতলা ইউনিয়নের গোয়ালী গ্রামের জসিমদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় পুরো গ্রামের মানুষ ওই বাড়িতে জড়ো হয়েছেন। সান্ত্বনা দেয়ার শক্তি যেন সবাই হারিয়ে ফেলেছেন। সবাই কাঁদছেন। যেদিন দুর্ঘটনাটি ঘটে সেদিন সকালে মা ও স্ত্রীর সাথে মোবাইল ফোনে জসিমের কথা হয় । স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, উনি আমার সন্তানদের জন্য কাপড় চোপড় পাঠিয়েছেন বলে জানান এবং ছোট ছেলেকে ঢাকায় ভাল স্কুলে ভর্তি করাতে বলেন। ছোট ছেলে ২য় শ্রেণীর ছাত্র নাজমুলের সাথেও কথা বলেন তিনি । ছেলে বাবার কাছে একটি খেলনা হেলিকপ্টার আনতে বলেছিল। জসিমের বোন মিনা বেগম বিলাপ করছিলেন। জসিম ৫ বছর আগে বাহরাইন যান। কাইতলা দক্ষিণ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেন, পাঁচটি লাশের মধ্যে তিনটি লাশই আমার ইউনিয়নের। এদিকে, বিটঘর ইউনিয়িনের গুড়িগ্রাম গ্রামের কৃষক আবুল বাশার সংসারের অভাব অনটন দূর করা জন্য ছেলে আনোয়ারকে ৩ বছর আগে বাহরাইন পাঠান। তার চার ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে আনোয়ার দ্বিতীয়। ওই ছেলের আয় ও নিজের সামান্য আয়ে সংসার চালাতেন। দুর্ঘটনার দিন বাড়িতে ফোন করে ছোট ভাই মনিরকে বাহরাইনে আনার জন্য ভিসা পেয়েছেন বলে জানান। নাটঘর ইউনিয়নের খরিয়ালা গ্রামের জারু মিয়া ৫ বছর আগে বাহরাইন যান। দেনা ও ঋণ করে ৪ লাখ টাকা খরচ করে তাকে বাহরাইন পাঠানো হয়েছিল। ওই ঋণ শেষ করা হয়নি। অবুঝ সন্তানদের নিয়ে জারু মিয়ার স্ত্রী এখন দিশেহারা। ঘটনার দিন স্ত্রীর সাথে আলাপ হয় জারুর। তখন তিনি স্ত্রীর অসুখের কথা শুনে বলেন, এখন কারো কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে চিকিত্সা করো। এ মাসের বেতন পেয়ে টাকা পাঠাবো। প্রসঙ্গত, নবীনগর এলাকার বিপুল সংখ্যক শ্রমিক প্রবাসে কাজ করছেন।