দেশের জন্য ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার উপার্জনকারী প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে সরকার চিন্তিত। প্রতিবছর উল্লেখ-যোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যান। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বা নিয়োগকর্তার দেশের সরকার তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে তেমন খেয়াল রাখেন না। ১৪টি দেশে শ্রমিকদের ভালোমন্দ দেখভাল করার জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং আছে। এসব উইং-এ মোট ২৪ জন লেবার এ্যাটাশে রয়েছে। যে কোম্পানি ভিসা দিচ্ছে সে কোম্পানি শ্রমিকদের কোথায় রাখবে, তাদের থাকার জায়গাটি কেমন তা দেখার দায়িত্ব লেবার এ্যাটাশের হলেও প্রায়ই তিনি এ কাজটি করেন না। অভিযোগ রয়েছে, থাকার জায়গাসহ নানা ইস্যুতে শ্রমিকরা দূতাবাসে অভিযোগ করলেও তাতে ফল হয় না। বাহরাইনে অল্প কয়েকমাসের ব্যবধানে দুটি বড় অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রাণহানির পর শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি অনেকে সামনে নিয়ে এসেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মনি গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, বাহরাইনে নিহত ১১ জন বাংলাদেশির মরদেহ সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। ওই ঘটনায় আহত ২৩ জনের চিকিত্সার ব্যবস্থা নিয়েছে সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস। তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ডে ৬৩ জন বাংলাদেশি তাদের সর্বস্ব হারিয়েছেন। তাদের জন্য দূতাবাস সেখানে আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে। সরকার এবং বায়রা এ লক্ষ্যে একসাথে কাজ করছে।
অভিবাসনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করেন এমন একটি সংগঠন হচ্ছে-রিফিউজি এন্ড মাইগ্রেটরী মুভমেন্টস রিসার্স ইউনিট (রামরু)। বেসরকারি এ সংগঠনের চেয়ারপার্সন তাসনিম সিদ্দিকী ইত্তেফাককে বলেছেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা তদারকি করা সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের দায়িত্ব হলেও বাংলাদেশ সরকারেরও দায়িত্ব আছে এতে। এ কাজটি করার জন্য বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে সরকার শ্রম উইং খুলেছে। তারা ঠিকমতো কাজ করলেই পরিস্থিতি পাল্টে যাবে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জাফর আহমেদ খান ইত্তেফাককে বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। বিভিন্ন দেশের দূতাবাসকে আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। তবে শ্রমিকরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার কারণে অনেক সময় সবার খবর নেয়া সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, বাহরাইনের ঘটনার পর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দূতাবাসগুলোকে বিষয়টি খেয়াল করতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার বাহরাইনের রাজধানীতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১ বাংলাদেশিসহ ১৩ জন শ্রমিক নিহত হয়। গতবছরের মে মাসে সেখানকার আরেকটি ভবনে আগুন লাগলে ১০ বাংলাদেশি শ্রমিক দমবন্ধ হয়ে মারা যায়। এর আগে ২০০৬ সালে অপর একটি অগ্নিকাণ্ডে বাহরাইনে ১৬ জন বিদেশি শ্রমিক মারা যায়।
এদিকে, বিদেশে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ তাদের অন্যান্য অধিকার সুরক্ষায় ২০১১ সালের জুন মাসে ঢাকা ঘোষণা গ্রহণ করা হয়। রামরুসহ বেসরকারি সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সারাদিন বৈঠক করে এ ঘোষণা তৈরী করলেও তা বাস্তবায়নের জন্য সরকার এখনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। উল্লেখ্য, ওই ঘোষণায় মোট ১০টি নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছিলো। এর মধ্যে সাত নম্বর নীতিতে বলা হয়েছে যে, অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ এবং সুষ্ঠু কাজের পরিবেশ থাকবে। এ ঘোষণার নীতি-৮ এ বলা হয়, শ্রমিকদের থাকার জায়গাটি নিরাপদ এবং বাসযোগ্য হতে হবে। ঢাকা ঘোষণার বিষয়টি সরকারকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে তেমন নাড়াচাড়া হয়নি।
উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ৮৩ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। ২০১২ সালে এ সংখ্যা ছিলো ৬ লাখ ৭ হাজার ৭৯৮ জন। ২০১১ সালে গিয়েছিলো ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৬২ জন। এত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনসময় আলোচনা হয়নি। রামরুর প্রধান তাসনিম সিদ্দিকী এ বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশ থেকে যারা চাকরি নিয়ে বিদেশ যান তাদের মধ্যে ৭০ ভাগ যান ব্যাক্তিগতভাবে পাঠানো ভিসায়। অনেকের ভাই বা আত্মীয় এ ভিসাগুলো পাঠান। বাকী ৩০ শতাংশ শ্রমিক যান কোম্পানির অধীনে। যারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে যান তারা কোথায় থাকছেন বা তাদের কর্মপরিবেশ কি-তা শ্রম উইং-এর পক্ষে তদারকি করা সম্ভব হয় না। কিন্তু যারা বিভিন্ন কোম্পানির অধীনে যান তাদেরকে শ্রম উইং তদারকি করতে পারে। কারণ তারা অধিকাংশ সময়ে একসাথে থাকে। তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, শ্রম উইংগুলো এ কাজটিও তদারকি করে না। তিনি শ্রমিকদেরকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিদেশে না গিয়ে একত্রে কোন একটি কোম্পানির মাধ্যমে যাবার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এতে অভিবাসনের হার কিছুটা কমতে পারে বলে তিনি জানান।
জনশক্তি রপ্তানি বিশ্লেষক হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরন বলেন, যেসব দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকরা যাচ্ছে সেসব দেশের দূতাবাসগুলোকে এ বিষয়ে প্রাথমিক উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমিকদের থাকার জায়গা কেমন, কাজের পরিবেশ কি-এসব বিষয়ে তারা বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরী করে সংশ্লিষ্ট দেশ বা কোম্পানির কাছে দিতে পারে। এছাড়া তিনি এ বিষয়ে রিক্রুটিং এজেন্সীগুলোর সতর্কতার ওপরও জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, যারা কর্মী প্রেরণ করবেন তাদের নিজেরও দায়িত্ব আছে। শ্রমিকদের কাজের এবং থাকার জায়গাটা তারা আগে থেকেই দেখে নিতে পারেন।
