বিশ্ব ইজতেমা ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা এবং ২০১৩ সুষ্ঠু নির্বাচন

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:১৭
ঈমান, আকিদা, ধর্মের দাওয়াত ইত্যাদি দ্বারা মানুষকে কল্যাণের পথে আনাই হলো তাবলিগের উদ্দেশ্য। অন্যের ধর্ম কর্ম পালনে বাধা না দিয়ে মুসলমানদের ধর্ম প্রচার এবং তাহাদের ঈমান আমল মজবুত করার উদ্দেশ্যেই কহরদরিয়া তুরাগ পারে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন। শান্তি-শৃংখলা, নিরাপত্তা, সুব্যবস্থাপনা, যানজট নিরসন, দূরের মেহমানের অংশগ্রহণ ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে দু’দফায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে পবিত্র বিশ্ব ইজতেমা। প্রথম দফায় ১১ তারিখ শুরু হয়ে ১৩ তারিখ আখেরি মোনাজাত এবং দ্বিতীয় দফায় ১৮ জানুয়ারি শুক্রবার শুরু হয়ে জানুয়ারি ২০ তারিখ সর্বশেষ মোনাজাত। প্রথম দফায় বরফ কণা পড়া শীতেও মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে দেশ-বিদেশের ১৫ লাখ মুসল্লি অংশ নিয়েছে দ্বীনের দাওয়াতে। শতাধিক রাষ্ট্রের অতিথিসহ আরো প্রায় ১০ লাখ লোক দ্বিতীয় দফায় ইসলামের বাণী বিনিময়ে শরীক হবে। বিশ্ব ইজতেমা হতে অনেক কিছু শিখতে হবে আমাদেরকে। ইজতেমার বৃহত্ ময়দানে স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মীরা যেভাবে মেহনত করেন তা রাষ্ট্রের নির্বাচন পরিচালনা ও বৃহত্ রাজনৈতিক দলগুলোর মহাসমাবেশের জন্যও অনুস্মরণীয় হতে পারে। ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচন হতে শুরু করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত হানাহানি, খুনাখুনি বন্ধের নিমিত্তে বিশ্ব ইজতেমার ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা যায়। দেশে দেশে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ, সিভিল ওয়ার, ড্রোন হামলা, সীমান্ত হত্যা, ইসরায়েলী বর্বরতা শীতল পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে রেখেছে। পাক-ভারত সীমান্তে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব, সেনায় সেনায় হত্যা, প্রতি-হত্যা, ধর্ম-কর্মে-বাধা ইত্যাদির কোনটাই মনুষ্য ধর্মে পড়ে না। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চোরাচালান, নেশা জাতীয় পণ্য, ইয়াবা, ফেনসিডিল, মদ্য পান দু’একটি ধর্ম ছাড়া কোন ধর্মেই প্রশ্রয় দেয় না। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ, অন্যের প্রতি গিবত গাওয়া, ব্যক্তি ও রাজনৈতিক মিথ্যা আচরণ পাপ কার্যের সামিল। জানা-অজানা সব পাপ মুক্ত করার কামনা নিয়েই আমরা আল্লাহর কৃপা ও দয়া চাই। লাখ লাখ মানুষ প্রচন্ড ঠান্ডার মাঝে সবুজ মাঠে চাটাই বিছিয়ে জায়নামাজের উপর দাঁড়িয়ে আদায় করছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ বিশেষ নামাজ ও দোয়া। ভারী ও ঘন কুয়াশায় আগতদের পড়তে হচ্ছে অনেক রকম দুর্ঘটনার কবলে। ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে সৈয়দপুরসহ দেশের অন্যান্য স্থানে তাপমাত্রা ছিল সর্বনিম্ন। সে দিন সৈয়দপুরের তাপমাত্রা ৩০ সে.সি. নিচেও এক সময় চলে গিয়েছিল। পুরো দেশটাই ঢাকা ছিল ঘন কুয়াশার বরফ কণার সাদা চাদরে। ইজতেমা মাঠে মারা গেছে ২০ জন। রোগ শোকে আক্রান্ত হয়ে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি আছেন প্রায় ২০০ জন। মানিকগঞ্জ, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শ্রীমঙ্গল, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রচন্ড শীতে মারা গেছেন প্রায় ১১৩ জন। ডায়রিয়া ও নিমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা হাসপাতালে চিকিত্সা পেলেও বিনামূল্যে ওষুধ পাচ্ছে না। হতদরিদ্র মানুষের কম্বল, শীতবস্ত্র, খাদ্য বিতরণে এগিয়ে এসেছেন বিত্তবান ও ঈমানদারগণ। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তার কল্যাণ তহবিল এবং মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বেশ কদিন ধরে রাতের বেলায় বিতরণ করে যাচ্ছেন শীতবস্ত্র। রাজনৈতিক ও বিত্তবানদের অংশগ্রহণ দেখে শীতবস্ত্রের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে উত্পাদক ও সরবরাহকারীরা। চাহিদা বেশি থাকলেও বাজারে দামস্তর ঠিক রেখে তারা সরবরাহ বাড়াতে পারতেন। আর তা হলেই হতো ইসলাম ও কল্যাণকর রাষ্ট্রের কার্য। বাঘ কাঁপা শীত বাঘ ও হাতিকেও বাঁচতে দিচ্ছে না। পশুপাখির পরিচর্যা করা নবী ও রাসূলদের গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশ ছিল। চার দিনের হাড় কাঁপানো শীতে মানুষের কষ্টের পাশাপাশি ফসলেরও ক্ষতি হচ্ছে। চারা বীজতলায় পচন শুরু হয়েছে। সাইবেরিয়া ও হিমালয় থেকে আসা হিমশীতল বায়ুপ্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে করছে ক্ষতিগ্রস্ত। কর্ণফুলী, মেঘনা, পদ্মার পারে বসে আছে লাইটার ও মাদার ভেসেল জাহাজগুলো। ফেরি পারাপারেও ঘটছে ব্যাপক বিঘ্নতা। সামাজিক ব্যবসায় গতি আসছে না। শ্রমিক ও মধ্যম শ্রেণীর ঘর ছেড়ে বেরুতে পারছে না। কৃষক-কৃষাণি মাঠে মই-বপন কোনটাই দিতে পারছে না। বিশ্ব ইজতেমার শপথে আগামী দিনগুলোতে কঠোর পরিশ্রম না করলে জাতীয় প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৫% এর নীচে। উপরোক্ত এ বছরটা শুরু হয়েছে আন্দোলনের গতি দিয়ে। বিরোধী দল সমূহ আন্দোলন করছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুন:প্রতিষ্ঠা, তেল-গ্যাস, বিদ্যুত্, ঔষধ, বেসরকারি শিক্ষা ব্যয় হ্রাসের দাবিতে, প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলন হচ্ছে চতুর্দিকে। বিমান, নৌযান, শিক্ষক, ডাক্তারদের ন্যায্য পাওনা আদায়, ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলন করছে চাকরি প্রবেশের বয়স বাড়ানোর দাবিতে। জাতি-উপজাতি আন্দোলন করছে কল্পনা চাকমা, ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফেরত পেতে। আলোচিত হত্যাকাণ্ড বিশ্বজিত্ দাসের খুনীদের যেন ফাঁসি হয় সে দাবি হিন্দু-মুসলমান সকলের। ডাক্তার এবং পুলিশের আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ হবার কারণে প্রতিবাদ উঠেছে সুশীল সমাজে। কে হিন্দু, কে মুসলমান বিষয়টি বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য হলো কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে নয়; কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করতে পারে না। সাগর রুনি হত্যা অপরাধীদের গ্রেফতারের দাবিতে সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমগুলো রাজপথ ছাড়ে নাই। শীত যতই বাড়ছে আন্দোলন ততই জমে বসছে। দেশ পরিচালনায় আমলা, মন্ত্রীরা অনেকে অযোগ্যতার প্রমাণ দিতে শুরু করেছেন। অনেকের তার/ভেইন ছিঁড়ে গেছে বলে নিন্দুকেরা বলে বেড়াচ্ছে। এটা কোন রাষ্ট্র পরিচালকের চাওয়ার হতে পারে না। দেশে তারল্য সংকট, বিনিয়োগযোগ্য তহবিল না থাকা, বিদেশি বিনিয়োগ শূন্যের কোটায় নেমে আসা, মানি লন্ডারিং/হুন্ডি, যথেচ্ছা ঋণ দানে লুটপাট, উচ্চ সুদহার, ঋণ নিয়ে বেতন ভাতা প্রদান রাষ্ট্রকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই শত দেশের মানুষের দোয়া ও সহযোগিতা চাওয়ার উপযুক্ত স্থান হলো তুরাগ পারের পবিত্র ইজতেমা মাঠ। সকলে মিলে আল্লাহর কাছে কায়মনো বাক্যে জিকিরের মধ্য দিয়ে চাইতে হবে, সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকার অধিকার এবং ২০১৩ সালে সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ও স্বাধীন নির্বাচন। লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক ট্রেজারার শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন