জিইডি রিপোর্ট

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:০৭
ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন সঠিক পথে নেই। আর এ জন্য অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং বিশ্বমন্দাকে দায়ী করা হয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৫ অর্থবছরের সময়কে ধরে এ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিলে। কিন্তু প্রথম দুই বছরের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, সঞ্চয় প্রবণতাসহ সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না হওয়ায় দারিদ্র্য হ্রাসের পরিকল্পনাও ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ফলাফল ভিত্তিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে দেখা যায়, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম বছর কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কিছু সূচকে অগ্রগতি থাকলেও পরবর্তী বছর তা ধরে রাখা যায়নি। বিনিয়োগ কিছুটা বাড়লেও তা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ রকম পরিস্থিতিতে লক্ষ্যমাত্রা পরিবর্তন করা হবে কিনা জানতে চাইলে, জিইডি সদস্য ড. শামসুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য পর্যায়ে রয়েছি। ফলাফলের উপর ভিত্তি করে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা পুনর্মূল্যায়ন করা হতে পারে।’ পরবর্তী মূল্যায়নের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান তিনি। মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সামগ্রিক বিনিয়োগ হার এবং অবকাঠামোর সমপ্রসারণে চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা না করলে তা ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যথেষ্ট ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। উল্লেখ্য, গত ২০১১-২০১২ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফসহ খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী তা অর্জন সম্ভব নয়। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা একটি সুষ্ঠু ও সঙ্গতিপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তব সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যসমূহ নির্ধারণ করেছে। প্রথম দুই বছরে একটি মিশ্র ফলাফল পাওয়া গেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২০১১ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা বরাবর ছিলো। কিন্তু ২০১২ অর্থবছরে কিছুটা কম হবে বলে মোটামুটি নিশ্চিত (প্রজেকশন) করা হয়েছে। চলতি হিসাব এবং আর্থিক ভারসাম্য সার্বিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা বরাবর রয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এতে আরো উল্লেখ করা হয়, ২০১২ আর্থিক বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ ভাল এবং তা অনেক উন্নয়নশীল দেশের কার্যসম্পাদন দক্ষতাকে অতিক্রম করে। কিন্তু এটা পরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশের কম। মূল্যস্ফীতিও একটি বিরাট উদ্বেগের বিষয়। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী স্থিতিশীল ও হ্রাসকৃত হওয়ার পরিবর্তে গড় মূল্যস্ফীতির হার ২০১১ অর্থবছর পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ২০১২ অর্থবছরে তা সর্বোচ্চ আকার ধারণ করে। যদি দুর্বল জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামাল দেয়া না যায় তবে তা ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য হ্রাসকরণে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তবে বিনিয়োগ হারের ঘাটতির আড়ালে একটি প্রধান বিষয় হল সম্পদের সীমাবদ্ধতা। কয়েক বছর আগে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়লেও বিগত বছরগুলোতে তা হ্রাস পেয়েছে। এতে জরুরি ভিত্তিতে নজর দেয়া প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত দুই বছরে সরকারি ও বেসরকারি সঞ্চয় প্রচেষ্টা—উভয়েরই অবনতি হয়েছে। ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ও খাদ্য ভর্তুকির ফলে জনগণের ভোগ্যপণ্য ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম দুই বছরে পরিকল্পিত সরকারি সঞ্চয়ের বৃদ্ধি অর্জন হয়নি। ২০১১ অর্থবছর এবং ২০১২ অর্থবছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী বৈদেশিক সহায়তার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) পরিকল্পিত অর্থায়নও বাস্তবায়িত হয়নি। বেসরকারি খাতে ২০১১ ও ২০১২ অর্থবছরে ভোগ্যপণ্য ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বেসরকারি সঞ্চয় হ্রাস পেয়েছে। ২০১১ ও ২০১২ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে ভোগ্যপণ্য ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় সঞ্চয়ের হার হ্রাস পাওয়া এবং স্থিতিশীল বিনিয়োগ হারের কারণে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য তীক্ষভাবে প্রভাবিত হয়েছে। জাতীয় সঞ্চয়ের হার হ্রাসের সমতা আনয়নের লক্ষ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ বৈদেশিক সঞ্চয়ের বৃদ্ধি ছিলো না। বৈদেশিক হিসেবে বর্তমান বছরগুলোতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে সন্তোষজনক ধারা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও বারবার জ্বালানি, খাদ্য ও মূলধন পণ্যের উচ্চ আমদানির কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে চলেছে। এই বাণিজ্য ব্যবধান ২০১২ সালে সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। দারিদ্র্য ও বৈষম্য: ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস করার লক্ষ্য নির্ধারিত ছিলো। ২০১০ অর্থবছরের ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে দারিদ্র্যের হার ২০১৫ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভিত্তিমূল হিসেবে কাজ করবে পরিকল্পনা মেয়াদে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি। এতে আরো উল্লেখ করা হয়, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্রারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য নিবিড় মূল্যায়ন ও নীতিমালা কার্যক্রম প্রয়োজন। ২০১১ অর্থবছরে জিডিপি’র ২ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তাবলয় খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। ২০১৫ অর্থবছরের মধ্যে এ ব্যয়ের পরিমাণ ৩ শতাংশে বৃদ্ধি করারও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। একইভাবে ২০১১ ও ২০১২ অর্থবছরের বাজেটগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের উপর জোর দিলেও বরাদ্দ ব্যয়ের পরিমাণ এ সকল খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাবক হলো মূল্যস্ফীতি যা আয় ও ভোগ বন্টনের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিনিয়োগ: প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, সাধারণভাবে ২০১২ এবং ২০১১ অর্থবছরের উপযুক্ত ক্ষেত্রসমূহে সরকারি বিনিয়োগের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় বেশিরভাগ খাতভিত্তিক কার্যক্রম বাস্তব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে সমস্যায় পড়েছে। জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতের অনেক সরকারি বিনিয়োগ কার্যক্রমই বৈদেশিক সাহায্যের অভাবে বাস্তবতার মুখ দেখেনি। দেশীয় বিনিয়োগের অপর্যাপ্ততাও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্যানিটেশন, নগরব্যবস্থা পরিবহন ও সামাজিক নিরাপত্তাখাতে সমস্যা সৃষ্টি করছে। পিপিপি নীতিকাঠামোর দুর্বল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার কারণে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের পিপিপি লক্ষ্যমাত্রা যথাযথভাবে অর্জিত হয়নি। একইভাবে কয়লা নীতিমালা এবং গ্যাস খাতে নতুন বিনিয়োগের অগ্রগতি পর্যাপ্ত নয়। পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও কিছু নীতি কার্যক্রম রয়েছে যা বাস্তাবয়িত হয়নি।