তাঁর ডাকনাম ছিলো বঙ্গ দুলাল। কিন্তু কেউই তাকে এ নামে ডাকতো না। জামালপুরের অজগ্রাম বালুআটা থেকে সে ছুটে এসেছিলো রাজধানী শহরে। তখন তার চোখে ছিলো অনেক স্বপ্ন। ঢাকার রাজপথ ঘুরেছে, ঠাঁই খুঁজেছে পরিচিতদের আশ্রয়ে। কিন্তু ঠাঁই মেলেনি। শৈশবে তাঁর ছবি আঁকার ভীষণ শখ ছিলো। শহরে এসে ভাবছিলো ছবি আঁকা শিখবে এবং লেখাপড়া করবে। কিন্তু কেউ তাকে বলে দেয়নি ঢাকায় ছবি আঁকার জন্য একটি চারুকলা ইনস্টিটিউট আছে। সেখানে ভর্তি হয়ে ছবি আঁকা-আঁকি করা যায়।
বেশ কিছুদিন পর ছেলেটি কোনকিছু না ভেবে নিজের সুন্দর হস্তাক্ষরের জোরে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা খুলে বসলো। পাশাপাশি চললো তা ছবি আঁকার কাজ। তখন তাকে কেউ চেনে না। ঢাকার শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের প্রায় সকলেই অপরিচিত। দিন যায়—। ইতোমধ্যে পরিচিতি লাভ করলো ছেলেটি অনেকের কাছে। একসময় আঁকা-আঁকি ও বিজ্ঞাপনের কাজ বাদ দিয়ে যুক্ত হলো বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাথে। শিল্প নির্দেশক হিসেবে ধারাবাহিক নাটকে বেশ কিছুদিন কাজ করে ফিরে এলো বিজ্ঞাপনী সংস্থায়। তখন ছেলেটি পুরোপুরি একজন স্বশিক্ষিত ছবি আঁকিয়ে। ইতোমধ্যে ছেলেটি স্মারক ডাকটিকিট, স্কুল বুক বোর্ডের বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ এবং শিশুতোষ বইয়ের ছবি এঁকে সুনাম কুড়িয়েছে। অনেকেই তখন তাকে দুলাল ভাই, কখনো নজরুল ইসলাম দুলাল, কখনো শিল্পী বলে সম্বোধন করেন। আর এরই মাঝে তার আঁকা ছবি অলঙ্করণ হিসেবে অনেক দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাবাজার থেকে বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণের জন্য তাগিদ আসে তার।
এভাবেই তার সুনাম ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কচি-কাঁচার আসরের অলঙ্করণ শুরু করলেন। নিয়মিত তিনি আসরের অলঙ্করণসহ দৈনিক ইত্তেফাকের অন্যান্য বিভাগেরও অনেক কাজ করেন। প্রতিকৃতি আঁকায় তিনি ছিলেন সবার থেকে আলাদা। হুবহু ছবি আঁকতেন তিনি তুলি দিয়ে। তার তুলি ছিলো জাদুকরী। একসময় ইত্তেফাকের পাশেই ছবি আঁকার জন্য একটি ছোট ঘর ভাড়া নিলেন। তখন চারদিকে নামডাক। ছবি আঁকার পাশাপাশি কবিতা লেখেন ও ছড়া লেখেন। এভাবেই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
বঙ্গ দুলাল বা দুলালের পুরোনাম নজরুল ইসলাম দুলাল। অলঙ্করণের পাশে ন.ই. দুলাল স্বাক্ষর করতেন। নজরুল ইসলাম দুলাল ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ মার্চ জামালপুর জেলার বালুআটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব-কৈশোরে তিনি স্থানীয় বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ঢাকায় এসে তিনি অনেক কিছু করতে চেয়েছেন। ব্যবসায় মন টেকেনি। সর্বশেষ ছবি আঁকাআঁকিই ছিলো তার প্রধান কাজ। এ কাজ করে কোন রকমে জীবন নির্বাহ করেছেন। অভাব-অনটনে চলেছে তার সংসার। কিন্তু কারো সাহায্য নেননি। শত শত বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ তার। জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রকাশিত একাদশ শ্রেণীর বাংলা ও ইংরেজি বইয়ের প্রচ্ছদ একসময় তার আঁকা ছিলো। বোমা সন্ত্রাসে দেশ যখন আতঙ্কিত, তখন দুলাল জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে এর প্রতিবাদ জানান হাতের তুলি দিয়ে। এছাড়া জাতীয় জাদুঘরে তার দু’টি একক চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় নব্বই দশকে। শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিটের প্রতিকৃতিও তিনি এঁকেছেন। কবি হিসেবেও তিনি ছিলেন সুপরিচিত। তার জীবদ্দশায় দেবতার কাব্য নয়, ভালোবাসা এই শব্দটি নিয়ে, ভালোবাসার ছাপচিত্র ও অদৃশ্য সিঁড়িতে রেখেছি পা বইগুলো প্রকাশিত হয়।
নজরুল ইসলাম দুলাল ছিলেন একজন আদর্শবান ছবি আঁকিয়ে। সত্ ও প্রচারবিমুখ দুলাল দেশকে ভীষণ ভালোবাসতেন। ছেলেমেয়ে ও সংসারের প্রতি কোনদিন দৃষ্টি দেননি। কারো কাছে হাত পাতেননি। কাগজ, কালি ও তুলিই ছিলো তার জীবনের প্রকৃত বন্ধু। আমাদের দুর্ভাগ্য, নজরুল ইসলাম দুলাল অকালেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কচি-কাঁচার আসরে তিনি সাত বছর ছবি এঁকেছেন। আমরা অনেকেই তাকে ভুলে গেছি। আমরা তাকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।
