১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই নভেম্বর আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলে গর্কি প্রচণ্ড আঘাত হানে। এতে পটুয়াখালি, ভোলা, হাতিয়া ও সন্দ্বীপসহ চর এলাকার লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। সাপের ফনার মতো উঁচিয়ে আসা জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় ঘর, বাড়ি ও সহায়-সম্পদ। গোর্কির খবর পেয়ে উপদ্রুত এলাকায় ছুটে যান সদ্য প্রয়াত বিশিষ্ট সাংবাদিক নির্মল সেন। ঐ সময় তিনি নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠান পত্রিকায়। সংকলিত এই লেখাটিও তিনি লিখেছিলেন আজ থেকে তেতাল্লিশ বছর আগে মাসিক কচি ও কাঁচার নভেম্ব্বর সংখ্যায়। সম্ভবত ছোটদের জন্য এটিই তার একমাত্র লেখা। তাঁর স্মরণে এটি সংকলন করা হলো।
আর সেখানে আমার হয়তো যাওয়া হবে না। অগ্রহায়ণ কেটে পৌষ আসবে। তারপর মাঘ। তারপর ফাল্গুনে নদী আবার বাতাসের সাথে নাচতে থাকবে। গলাচিপা থানার বঙ্গোপসাগরের তীরের ইউনিয়নগুলি আবার বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বছরের ছ’মাস নির্বিঘ্নে সে পথে যাবার কোন ব্যবস্থা নেই। হয়তো ফাল্গুন-চৈত্র বৈশাখের হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে আবার একদিন ট্রানজিস্টার চীত্কার করতে থাকবেঃ মহাবিপদের প্রস্তুতি নিন....।’ তখন ওরা কি করবে। দ্বীপ চরের সূর্য্যবিবি, আবদুর রাজ্জাক, গাববুনিয়ার সিরাজ, ছমেদ আর চর কাজলের হারুন অর-রশিদ। বাহারচরের আলেয়া বেগম, রাঙ্গাবালীর নেতা গ্রামের সেই চারটি ছেলেমেয়ে আর ফুলখালীর ছমেদের দু’টি ছেলে-ওরা কি তখনও বেঁচে থাকবে।
আম গাছ, গাব গাছ, তেঁতুল আর পাকুড় গাছ, নারকেল খেজুর আর মাদার গাছ। গাববুনিয়ার চম্পা বলবে, না-না-না— মৌফল গাছ। আমিও মৌ-ফল গাছে ছিলাম, বলবে গাববুনিয়ার এমদাদ খানের বাড়ীর রেখা...
পটুয়াখালী, ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপের হাজার হাজার চম্পা, রেখা, আলেয়া, রাজ্জাক, সিরাজ, ছমেদ ১২ই নভেম্বরের সেই কাল রাতে বেঁচেছিল বানরের মত গাছের শাখায় ঝুলে। যদি ওদিকে আজকে কেউ যাও, তা’হলে দেখবে ওরা ভীড় জমাবে। তোমার কাছে আসবে। কাঁদবে না। কখনও হয়তো শুকনো চোখটা ছলছল করে উঠবে আর বোলবে, আমার কথা লিখে নিন।
হাসবে ছোট্ট সূর্য্য বিবি। বছর পাঁচেক বয়স হয়েছে। পরণে ছোট একখানা শাড়ী। নাকে নথ। সে বোলবে “বায়ে মোরে বাইন্দ্যা দিছিল ট্যাঙ্গা গাছে?” অর্থাত্ সূর্য্য বিবির বাবা ঝড় আসবে ভেবে তাকে তেঁতুল গাছে বেঁধে দিয়েছিল। আর আলেয়া বেগম? তাকে তুলে দিয়েছিল তার পিতা টিনের চালা থেকে একটা গাছে। তারপর দম নিয়ে আলেয়া বেগম বলবে, তার কেউ নেই— সে-ই একমাত্র বেঁচেছে।
দ্বীপ চরের দশ বছরের রাজ্জাক ছোট দুটি শিশি বগলে নিয়ে আসবে রিলিফ নিতে। সে তেল চায়। যদি আল্লার ওয়াস্তে একটু তেল পাওয়া যায়...। তারপর হাত দিয়ে আলেয়া বেগমকে তোমার কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলবে, আমি ছিলাম গাব গাছে। ১২ই নভেম্বর সন্ধ্যায় গাছে উঠেছিল সে। আস্তে আস্তে পানি বাড়ল। বাড়ল বাতাস। পানি চারিদিকে থৈ থৈ করছিল। কিন্তু রাত ১২টা পর্যন্ত কোনমতে পানিতে জেগে থাকতে পারলেও রাত বারটার পর এল উত্তরের হাওয়া। সাথে এল যেন ঠাণ্ডা আর ঠাণ্ডা! সে ঠাণ্ডায় যেন বেহুঁস হয়ে গেল রাজ্জাক। এক ডুব দিয়ে গাছের গোড়ায় চলে গেল। সেখানে পানিটা গরম। প্রায় সারারাত রাজ্জাক একবার ডুব দিয়েছে আবার ভেসে উঠেছে। তারপরের কাহিনী তার মনে নেই।
কিন্তু বার বছরের হারুনর রশিদ কম কথা বলে। তার একমাত্র ভাই আর ছোট বোনের কোন খোঁজ নেই। মা-বাবা গিয়েছে আগেই। সে বেঁচেছে গাব গাছে উঠে। কথা বলে না সে। শুধু তাকায় আকাশের দিকে। তাকায় দিগন্তের দিকে। দেখবে ভীড়ের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে আর একটি ছেলে— কলম খানের পুত্র ছমেদ। ছমেদ ঝড়ের রাতে ছিল বোনাই আব্দুল মালেকের বাড়ী। বোনাইয়ের বাড়ী বঙ্গোপসাগরের চরমন্তাজে। ঝড়ে ছমেদ ভেসে গিয়েছিল আণ্ডার চরে। ফিরে এসেছে ছমেদ। ফেরেনি বোনাই হাকিম আলী আর বোনের কন্যা। দেখবে রাঙ্গাবালী ইউনিয়ন। পটুয়াখালীর সর্ব-দক্ষিণের ইউনিয়ন। তারপর বঙ্গোপসাগর! রাঙ্গাবালীর পাশে ছোট বাইশদিয়া ইউনিয়ন। মাঝখানে বাহিন খালীর খাল। নৌকায় যেতে হলে অনেক দূর যেতে হবে। তাই প্রয়োজন হলে দারচিরা নদীর তীরে নয়াডাঙ্গি গ্রামের কাছে নৌকা রেখে হেঁটে যাবে। হেঁটে যাবে ফুলখালী। ফুলখালী গ্রামে ঢুকে গহিনখালী খালের পাশে হাঁটতে হাঁটতে দেখবে একটা বাড়ী। তুমি যখন যাবে হয়তো দেখবে দু’একটা চালা উঠেছে। কারো সাহায্যে। অথবা কেউ নেই। ভিটাশূন্য। আমি দেখেছি সেখানে শুধু পড়ে আছে ভিটি। সে বাড়ীর সামনে তিনটি কবর। বাবা-মা আর মেয়ে।
আর লাশ পাওয়া যায়নি। হয়তো কাঁচা কবর তিনটি শুকিয়ে গিয়েছে। তুমি একটু খোঁজ করে দেখবে সেই ছমেদ গাজীর বাড়ির শিশু দু’টি বেঁচে আছে কিনা। বাবা নেই, মা নেই, ভাই নেই, বোন নেই। পরিবারের দশজনের আটজনকে ছিনিয়ে নিয়েছে প্রলঙ্করী ঝড়। বেঁচে আছে দশ আর আট বছরের দু’টি শিশু। আমি পাইনি তাদের খুঁজে। জানি না তুমি গেলেও শূন্য বাড়ীটা তোমার কণ্ঠের প্রতিধ্বনী করবে কিনা।
হয়তো সর্বত্র যেতে পারবে না। কেউ কোনদিন পারবে না বলে আমারও বিশ্বাস। তবু আমার অনুরোধ, সময় হলে আরো একটু এগিয়ে যাবে রাঙ্গাবালীর নেতা গ্রামে। হয়তো ভাববে ভূতের বাড়ী। আমার মনে হয়েছে, কারা যেন ছায়ার মত ঘুরছে। কাছে আসে না। মানুষ দেখলে পালায়। সে বাড়ীর চারটি ছেলেমেয়েকে পেলে তুমি একটু খবর নিয়ে আসবে। ওদের বয়স ৮ হতে ১৩। ও বাড়ীতে ১৭ জন মানুষ ছিল। আজ আছে মাত্র ৪ জন। ওরা কোথায় আছে— কেমন আছে সকলে?
এত একটি নয়— অনেক কাহিনীর এক একটি। তবু যদি কোনদিন বড় বাইশ দিয়া ইউনিয়নের গাব বুনিয়ায় যাও, তাহলে খোঁজ করে দেখবে। আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদারের বাড়ীতে গাবগাছ লাগান হয়েছে কিনা। সে বাড়ীতে গাছ ছিল না বলে বুড়ি ছেলে-মেয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন পাশের বাড়ী। সেখানে বেঁচেছিলেন গাছে চড়ে। আমি বুড়িকে ধমক দিয়েছিলাম। বলেছিলাম গাছ লাগাতে। খোঁজ করে দেখো বুড়ি গাছ লাগিয়েছে কিনা।
কারণ আবার মাঘ মাসের পর ফাল্গুন আসবে। নদী উত্তাল হবে। ট্রানজিস্টার বলবে ‘মহা বিপদের প্রস্তুতি নিন।’ জানি না তখন রাজ্জাক হাওলাদারের বাড়ীর গাছ বড় হবে কিনা। জানি না শেষ হবে কিনা আমগাছে আর গাবগাছে চড়ে বাঁচার জীবন। যদি কেউ যাও একটু খোঁজ নিয়ে এসো। আমার হয়তো আর যাওয়া হবে না।
