সিইএস চমক অব্যাহত

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:২০
প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য বলতে গেলে এটা এক রকম নিয়ম হয়েই দাঁড়িয়েছে। ১৯৬৭ সালে নিউইয়র্ক সিটিতে কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স অ্যাসোসিয়েশন আয়োজন করে বিভিন্ন প্রযুক্তি পণ্য নিয়ে এক প্রদর্শনীর। গত ৪৫ বছরে সেই প্রদর্শনী সমযের সাথে সাথে বেড়েছে আকারে, আয়তনে। আর পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ প্রযুক্তি পণ্যের প্রদর্শনীতে। আর বছরের শুরুতেই এই প্রদর্শনীর পণ্যগুলো যেন সারা বছরের প্রযুক্তি বাজারের হেডলাইন হিসেবেই থেকে যায়। প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের শুরুতেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেল কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স শো ২০১৩। জানুয়ারির ৮ তারিখ থেকে শুরু হয়ে চার দিনের এই প্রদর্শনী শেষ হলো ১১ জানুয়ারি তারিখে। লাস ভেগাস কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনী আকারে-আয়তনে ছাপিয়ে গেছে আগের আয়োজনকে। সেই সাথে দর্শনার্থী এবং অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে সময়ের সাথে নিয়ম মেনেই। কী ছিল সিইএস ২০১৩-তে কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স শোতে কী প্রদর্শিত হয়, এমন প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই পাল্টা প্রশ্ন করে থাকেন, এতে কী প্রদর্শিত হয় না। সত্যিকার অর্থেই প্রায় সব ধরনের প্রযুক্তি পণ্যের সম্মিলন এই সিইএস। ব্যতিক্রম ছিল না এবারের আয়োজনও। মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে স্মার্ট টিভি, ট্যাবলেট পিসি, ল্যাপটপ, স্মার্টওয়াচ, স্মার্ট রেফ্রিজারেটরসহ নানা ধরনের পণ্যের সমাহার ছিল সিইএস-২০১৩-তে। তবে স্বীকার করতেই হয়, সব ধরনের পণ্যের মধ্যেই স্মার্ট শব্দটি যুক্ত হয়ে গেছে এই স্মার্টযুগে। তাই সিইএস-এও তাই স্মার্ট সব পণ্যের জয়জয়কার। এর পাশাপাশি নতুন সব প্রযুক্তির প্রদর্শনীও ছিল এই আয়োজনে। টাচ ও জেশচারনির্ভর ডিভাইস গত দুই বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরেও থাকবে টাচস্ক্রিন ডিভাইসের জয়জয়কার, যার প্রমাণ ছিল সিইএস-এ। গত বছরের শেষ ভাগে মাইক্রোসফট উইন্ডোজ ৮ অবমুক্ত করার পর থেকেই ল্যাপটপ, আল্ট্রাবুকগুলোতে টাচস্ক্রিন যুক্ত হওয়ার প্রবণতা ছিল লক্ষ্য করার মতো। এই প্রদর্শনীতেও এই ধরনের আল্ট্রাবুক ও ল্যাপটপ প্রদর্শিত হয়েছে। মাইক্রোসফট নিজে এই প্রদর্শনীতে উপস্থিত না থাকলেও উইন্ডোজ ৮ নিয়ে থার্ড-পার্টি ডিভাইসের অভাব ছিল না। আর টাচস্ক্রিনের পাশাপাশি এবারে ডিভাইসগুলোতে জেশচার রিকগনিশন সুবিধা যুক্ত হয়েছে। অর্থাত্ এসব ডিভাইসকে ইশারার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। ট্যাবলেটের আকার সীমাহীন মূলত কম্পিউটিং ডিভাইসকে হাতের নাগালে নিয়ে আসার চিন্তা থেকেই ট্যাবলেট পিসি’র আবির্ভাব বাজারে। আর বাজারে আসার পর থেকেই বাজারমাত করতে থাকে এই ট্যাবলেট পিসি। শুরুতে ১০ ইঞ্চি আকৃতিতে বাজারে আসলেও গত বছরে ৭ ইঞ্চি আকৃতির ট্যাবলেট পিসির জয়জয়কার দেখা গেছে। তবে সিইএস দেখাল ভিন্ন অভিজ্ঞতা। ১৮ ইঞ্চি তো বটেই, ২৭ ইঞ্চি আকৃতির ট্যাবলেট পিসিও প্রদর্শিত হয়েছে এই আয়োজনে। অত্যাধুনিক প্রসেসর ব্যবহার করে লেনোভোই নিয়ে এসেছে ২৭ ইঞ্চি ট্যাবলেট পিসি। আর যাদের ২৭ ইঞ্চিতেও পোষাবে না, তাদের জন্য ৩এম নিয়ে এসেছে ৮৪ ইঞ্চির ট্যাবলেট স্ক্রিন! স্মার্টফোনেও বৈচিত্র্য ট্যাবলেট পিসির মতো স্মার্টফোনেও আকারের দিক থেকে যুক্ত হয়েছে নানা বৈচিত্র্য। পর্যায়ক্রমে স্মার্টফোনগুলো আকারে বড় হয়ে যাচ্ছে। ফলে স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট পিসির মাঝামাঝি এক ধরনের ফ্যাবলেট তৈরি হয়ে যাচ্ছে। স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি নোটের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্যামসাং ছাড়াও সনি, জেডটিই, লেনোভো, হুয়াওয়ে, ভিজিওসহ অনেক প্রতিষ্ঠানেই সিইএস-এ প্রদর্শন করেছে এমন ধরনের ফ্যাবলেট। এই প্রদর্শনীতে যে পরিমাণ ফ্যাবলেট ধরনের স্মার্টফোন প্রদর্শিত হয়েছে, তাতে করে চলতি বছরটা ফ্যাবলেটের দখলে থাকবে বলেই ধারণা প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের। টেলিভিশনে নতুন প্রযুক্তি গত বছরের কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স শো’তেই আল্ট্রাএইচডি বা ৪কে টেলিভিশনের প্রধম প্রদর্শনী হয়। তবে গত বছর ৪কে টেলিভিশন সত্যিকার অর্থে প্রস্তুত ছিল না। এবারের প্রদর্শনীটি এক কথায় নিজের দখলেই রেখেছিল এই প্রযুক্তি। সনি, প্যানাসনিক, স্যামসাং, এলজি, শার্প, তোশিবা সবাই ঝুঁকে পড়েছে এই ৪কে টেলিভিমনের দিকে। এর মধ্যে অবশ্য ৪কে ও এলইডি টিভি (৫৬ ইঞ্চি) বানিয়েছে প্যানাসনিক। স্যামসাং আবার ৮৫ ইঞ্চি এবং ১১০ ইঞ্চির আল্ট্রা এইচডি টিভিও প্রদর্শন করেছে। ৪কে টিভির দাপটে থ্রিডি টিভিও অনেকটাই ম্লান ছিল প্রদর্শনীতে। গেম কনসোলে এনভিডিয়া এবারের সিইএস-এ চমক হিসেবে গ্রাফিক্স তৈরির বিশ্বখ্যাত কোম্পানি এনভিডিয়া নিয়ে আসে নিজস্ব গেম কনসোল। প্লেস্টেশন, এক্সবক্স এবং নিনটেনডোর বাইরে নিজস্ব একটি বাজার তৈরিতে আশাবাদী এনভিডিয়া তাদের গেম কনসোলের নাম রেখেছে ‘প্রজেক্ট শিল্ড’। অ্যানড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমে চালিত এই গেম কনসোলটি ডিজাইন করা হয়েছে একটি ঝিনুকের আকৃতিতে। নিজস্ব ডিসপ্লে ছাড়াও একে বাইরের যেকোনো স্মার্ট টিভিতেও যুক্ত করা যাবে। আর নানা ধরনের অ্যানড্রয়েড গেম খেলা এবং অ্যানড্রয়েড অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের সুবিধাও আছে এতে। অন্যান্য কনসোলগুলোর তুলনায় এনভিডিয়ার এই কনসোলে গ্রাফিক্স পারফরম্যান্স ভালো পাওয়া যাবে বলেই আশাবাদী এনভিডিয়া। এনভিডিয়া ছাড়াও অবশ্য নতুন আরও কিছু প্রতিষ্ঠান গেমিং বক্স নিয়ে এসেছে এতে। নতুন প্রসেসর বাজারের হিসেবে ইন্টেলের চাইতে পিছিয়ে থাকলেও নতুন প্রসেসর নির্মাণে জুড়ি নেই এএমডি’র। এবারের সিইএস প্রদর্শনীর তারা তাদের নতুন এপিইউ (অ্যাকসেলারেটেড প্রসেসিং ইউনিট) নিয়ে আয়োজন রেখেছিল। এএমডি’র পাশাপাশি ইন্টেল অবশ্য এমবেডেড মার্কেটের জন্য অ্যাটম প্রসেসরের প্রদর্শনীও করে। প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রযুক্তি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীরা অনেক সীমাবদ্ধতাই অতিক্রম করতে সমর্থ হয়েছে। এর কিছু নমুনাও ছিল প্রদর্শনীতে। অন্ধরাও যাতে কম্পিউটিং ডিভাইস ব্যবহার করতে পারে, সেরকম বেশকিছু প্রযুক্তি প্রদর্শিত হয়েছে মেলায়। আবার শ্রবণ-প্রতিবন্ধীদের জন্য ছিল বিশেষ থ্রিডি হেডফোন, আবার মুকদের হয়ে কথা বলার মতো অ্যাপ্লিকেশনও প্রদর্শিত হয়েছে এখানে। অ্যাকসোসরিজ আর গ্যাজেটের সমাহার মূল ধারার প্রযুক্তি পণ্যের পাশাপাশি এক বৈচিত্র্যময় অ্যাকসেসরিজ আর গ্যাজেটসের সম্ভার ছিল এই সিইএস-এ। স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিদের জন্য যেমন ছিল নানা গ্যাজেটস, তেমনি খাদ্যগুণ নিশ্চিত করতে ছিল স্মার্ট চামচ। এ ছাড়া হরেক রকমের ফ্ল্যাশ ড্রাইভ, ক্যামেরা, খেলনা তো ছিলই। চলতি বছরে আবার স্মার্ট হাতঘড়ির প্রচলনের সম্ভাবনা নিয়ে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান স্মার্টওয়াচও প্রদর্শন করেছে এতে।