সেদিন একটা স্টেশনারি দোকানে বসা ছিলাম। এক বাবা তাঁর কিশোর ছেলেকে নিয়ে দোকানে এলেন। তিনি জানতে চাইলেন, দোকানে ১৫০ টাকা দামের কলম আছে কিনা ? দোকানের মালিক আমার পাশেই বসা ছিলেন। তিনি জবাব দিলেন, “নেই। শেষ হয়ে গেছে।” আমি অবাক হলাম। বাবার কাছে জানতে চাইলাম, এত টাকা দামের কলম দিয়ে কী হবে? তিনি জবাব দিলেন, “আর বলবেন না ভাই, দামি কলম ছাড়া ছেলেটা লিখতেই চায় না।” আমি মনে মনে ভাবলাম, এই ছেলেটাকে কষে একটা চড় দিয়ে বলা উচিত, পড়ালেখা শেখার জন্য দামি কলম অপরিহার্য নয়। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, এই অবুঝ কিশোর বালকটির তো কোনো দোষ নেই। দোষ তার অভিভাবকের, যাঁরা তাকে দামি কলম দিয়ে লেখার অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। আমি ভাবলাম অদূর ভবিষ্যতের কথা, যেদিন এই ছেলে বড় হয়ে তার বাবার কাছে দামি কিছুর বায়না ধরবে আর তা না পেয়ে বাবার গলা চেপে ধরবে। সেদিনের সেই অপরাধের জন্য ছেলেটিকে কি দোষ দেয়া যাবে ? আমার মনে হয় না। কারণ যে বাবা তাঁর সন্তানকে কোনোদিন না পাওয়ার কষ্ট বুঝতে দেননি, অপ্রাপ্তির বেদনায় ক্ষুব্ধ হয়ে সেই সন্তান একদিন বাবার গলায় ছুরি ধরবে—এটাই তো স্বাভাবিক।
একথা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে আমরা একটি অস্থির সময়ে দিন কাটাচ্ছি। দ্রুত বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে পৃথিবীর মানুষগুলোর মন, চিন্তা-চেতনা আর মূল্যবোধ। কিন্তু এই পরিবর্তন আমাদের জন্য কতটুকু ইতিবাচক, তা মূল্যায়নের দায়িত্ব আমাদেরই। জনৈক মার্কিন ঔপন্যাসিক লিখেছিলেন, “All the changes is not growth and all the movements is not developments.” তাই আমাদের ভাবনার সময় এসেছে, কোনদিকে এগুচ্ছি আমরা। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের গন্তব্যস্থলই বা কী হওয়া উচিত?
২০১০ সালে সারা লন্ডন জুড়ে যে দাঙ্গা আর লুটপাট হয়ে গেলো, সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা গেছে তার জন্য দায়ী অধিকাংশই ১৩-১৪ বছরের কিশোর-কিশোরী। পত্রিকার ছবিতে দেখা গিয়েছে, অল্পবয়সী বালকেরা বড় বড় দোকানগুলো থেকে খাবার, মদের বোতল ইত্যাদি লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ ইংল্যান্ড দেশটাকে আমরা পৃথিবীর অগ্রসর সভ্য দেশ হিসেবে জানি। বর্তমান যুগ কম্পিউটার, ইন্টারনেট আর ফেসবুকের যুগ। নতুন প্রজন্ম এখন সামাজিকতা শিখছে ফেসবুকের মাধ্যমে। যে বয়সে সন্তান বাবার হাত ধরে বাজারে কিংবা মেলায় যাবার কথা, সে বয়সে সন্তান এখন কম্পিউটারে ফেসবুক বা টুইটারের মাধ্যমে অজস্র বন্ধুর সঙ্গে ভাব বিনিময় করছে। অসুস্থ মায়ের পাশে সময় না দিয়ে সে ফেসবুকের ছায়াবন্ধুর সঙ্গে অনুভূতি শেয়ার করছে, “প্রে ফর মাই মাদার, সি ইজ সিক।” কিন্তু এর ফলাফল কী দাঁড়াচ্ছে ? আজকের এই প্রজন্ম সামাজিকতা কতটুকু শিখছে? নেটওয়ার্কের গণ্ডির ভেতর আবদ্ধ অল্প কিছু মানুষের সঙ্গে ভাব বিনিময় মানেই সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করা নয়। মানুষ সামাজিক জীব। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে চলাই প্রকৃত সামাজিকতা। সমাজে চলতে গিয়ে এক মানুষ অপর মানুষের সুখ-দুঃখের অনুভূতিগুলো ভাগ করে নেয়। তার মাঝে মানবিকতা জন্ম নেয়। অপরের দুঃখে তার মন কেঁদে ওঠে। সারাজীবন ধরে এই বোধ তার অন্তরে বিরাজ করে।
কোনো এক প্রশিক্ষণশিবিরে একজন ট্রেইনার তাঁর অধীনে থাকা প্রশিক্ষণার্থী এক কর্মকর্তাকে তুচ্ছ কারণে কষে এক চড় দিয়েছিলেন। বলাবাহুল্য, ঐ ট্রেইনার ছিলেন নিম্নপদের এক পুলিশ কর্মচারী। কিছুদিনের মধ্যে প্রশিক্ষণপর্ব সমাপ্ত হলো। অন্যায় শাস্তির শিকার ঐ কর্মকর্তা প্রমোশন পেয়ে কর্মস্থলে আসার পর সেই নিম্নপদের পুলিশকে ডেকে পাঠালেন। কর্মকর্তা সেদিনের সেই শাস্তির কথাটি মনে রেখেছিলেন। ট্রেইনার পুলিশকে তার কারণ জিজ্ঞেস করতেই তিনি জবাব দিলেন—তুচ্ছ কারণে আমার এই নির্মম শাস্তি আপনার মনে আজীবন রেখাপাত করবে। বিনা দোষে বা সামান্য কারণে কোনো নিরাপরাধ মানুষ শাস্তি পেলে সে হূদয়ে কীরূপ বেদনা বয়ে বেড়াবে, সেটা এখন আপনি ছাড়া আর কে ভালো বুঝবে ? অপর মানুষের দুঃখ বোঝার জন্য এটা হয়তো ভালো উদাহরণ হয়নি। কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে যেতে বসা এই সমাজে এর চেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ খোঁজার প্রয়োজন আছে কি?
হেমসা শহরে যুদ্ধের সময় সৈনিকের খাদ্য ফুরিয়ে যাওয়ায় সেনাপতি এক কৃষকের বাড়িতে উপস্থিত হলেন। কৃষক সেনাপতিকে সঙ্গে নিয়ে অনেক দূরে একটা খেত দেখিয়ে দিলেন। সৈনিকেরা ঐ খেত থেকে ফসল তুলে নিলেন। অতঃপর সেনাপতি কৃষককে জিজ্ঞেস করলেন, পথে আসতে অনেক ভালো ভালো খেত দেখলাম, তুমি সেগুলো দেখিয়ে না দিয়ে এখানে আনলে কেন ? কৃষক জবাব দিল, সে খেতগুলো তো আমার ছিল না। আমাদের বর্তমানের ভোগবাদী সমাজে উল্লিখিত কৃষকের মতো সত্ মানুষের বড়োই অভাব। বাবাদের উচিত সন্তানকে এধরনের আদর্শের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেওয়া। যে বাবা তার সন্তানের সামনে এই বলে বাহাদুরি করেন, “আমার কি কম আছে নাকি ?” অথবা “তার থেকে আমি কোনো অংশে কম কিসে?” সেই বাবা প্রকারান্তরে নিজেরই সর্বনাশ ডেকে আনেন। বরই গাছ রোপণ করে যেমন আমের আশা করা যায় না, তেমনি যে সন্তানকে কোনোদিন মানবতাবোধ শিক্ষা দেওয়া হয়নি, সে সন্তানের কাছে মানবীয় গুণাবলি আশা করা উচিত হবে না।
কিছুদিন আগের ঘটনা। আশা করি পত্রিকার কল্যাণে সবারই জানা। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুজন সহপাঠী হোস্টেলে একই রুমে থাকে। একজন অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের ছেলে। তার দামি ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন আছে। অন্যজন সেমিস্টার ফির পঞ্চাশ হাজার টাকা অসদুপায়ে খরচ করে ফেলেছে। এখন বন্ধুকে প্রস্তাব দিয়েছে ওর ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন বিক্রি করে এই পঞ্চাশ হাজার টাকা যোগাড় করে দিতে। কী অদ্ভুত অযৌক্তিক প্রস্তাব ! বন্ধুত্বের এই নির্মম ও অযৌক্তিক মূল্যশোধের প্রস্তাবে স্বাভাবিক কারণেই সে রাজি হয়নি। ফলাফল—বন্ধুর হাতেই করুণ মৃত্যু। পাষণ্ড বন্ধুটি শুধু মেরেই ক্ষান্ত হয়নি, চেহারা যেন কেউ চিনতে না পারে সেজন্য নির্মমভাবে মৃত বন্ধুর চেহারাও ছুরি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। আরেকটি ঘটনাও ঠিক এরকমই। পল্ল¬বীতে সন্তানকে বাসায় রেখে এক ভদ্রলোক তাঁর অসুস্থ স্ত্রীকে ভারত নিয়ে গিয়েছিলেন। সন্তানের বন্ধুরা ঐ বাসায় এসে মদ-গাঁজা সেবন করে। বিত্তশালী বন্ধুর টাকা-পয়সা, সম্পদ দেখে তারা মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে অসত্ বন্ধুরা কিশোর ছেলেটিকে নির্মমভাবে খুন করে টাকা-পয়সা, দামি মোবাইল ফোন ইত্যাদি নিয়ে পালিয়ে যায়। টাকার লোভে বন্ধুর কঙ্কাল বিক্রি করার জন্য এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে খুন করে সিমেন্টের ভেতর লাশ লুকিয়ে রাখে। আশা করি এ ঘটনাটিও কারো অজানা নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুই বন্ধুই ছিল মেডিকেলের ছাত্র। সমপ্রতি গাড়িতে প্রচুর ফেনসিডিল ও অস্ত্রসহ ধরা পড়েন একজন জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ। বিভিন্ন জায়গায় এগুলো পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। টাকার অঙ্কটা নেহায়েত মন্দ ছিল না—এক লাখ টাকা মাত্র।
আমরা সাধারণত বলে থাকি, পরিবারই হচ্ছে শিশুর প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু আধুনিক একটি পরিবার থেকে শিশু কী শিখতে পারছে? আজকালকার বেশিরভাগ পরিবারই একক পরিবার। এইসব পরিবারে কোনো প্রবীণ মুরুব্বী থাকে না। থাকে শুধু কর্মব্যস্ত বাবা আর মা। প্রচুর টাকা-পয়সা উপার্জনের আশায় বাবা ব্যস্ত থাকেন তাঁর ব্যবসা অথবা চাকরি নিয়ে। মা ব্যস্ত থাকেন নিজেকে নিয়ে অথবা সাংসারিক নানা কাজকর্ম নিয়ে। তাহলে এই পরিবারের সন্তান সামাজিকতা বা মূল্যবোধ শিখবে কার কাছ থেকে?
যে সন্তান জন্ম থেকেই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করে আসছে, সে অভাবী মানুষের কষ্ট বুঝতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। আর যে পরের দুঃখ বুঝতে পারে না, সে ভবিষ্যতে দেশের জন্য, সমাজের জন্য কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে পারবে সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। কাজেই সন্তানকে সবসময় শুধু প্রাপ্তির আনন্দ নয়, মাঝে-মধ্যে না পাওয়ার বেদনাও বুঝতে দিতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে, কীভাবে অপর মানুষকে ভালবাসতে হয়, অসহায় মানুষের কাছে দাঁড়াতে হয়। প্রিয়জনকে হারানোর ব্যথা কত কষ্টের, তা যদি আমার সন্তানকে না শেখাই, তাহলে আমার সন্তানও একদিন আমাকে ছেড়ে অন্যত্র সুখের সন্ধান করবে। এতে সে কোনো কষ্ট পাবে না। আর এর জন্য দায়ী হবো আমিই। কারণ আমি তাকে কষ্ট পেতে শেখাইনি। তাই আসুন, সন্তানকে ভালোবাসা শেখাই। অপর মানুষকে সম্মান করতে শেখাই।
ঢাকা
