ডিজিটাল প্রকাশনায় সরকারের উদ্যোগ সমস্যা ও বাস্তবতা

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫২
মহাজোট সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার দেশকে ডিজিটালে রূপান্তর। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দিক থেকেও বেশ এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকার দেশকে ডিজিটালে পরিণত করতে ইতিমধ্যেই নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছেন যা প্রশংসার দাবিদার। দেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে সরকার যথেষ্ট মনোযোগী—যাকে আমরা এক কথায় ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় হিসেবেই বিবেচনা করতে পারি। অফিস-আদালত, স্বাস্থ্য-চিকিত্সা এমনকি শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেকাংশেই বাংলাদেশ ডিজিটালকরণে এগিয়ে গেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠ্যবইসমূহ ইতিমধ্যেই ডিজিটাল করা হয়েছে। কম্পিউটারে বসে অনায়াসে একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বই পড়তে পারে। তবে সরকারিভাবে এমন উদ্যোগ যথাযথ হলেও তা সীমিত আকারেই জনসম্মুখে উপস্থাপিত হচ্ছে। নির্দিষ্ট পর্যায়ের নির্ধারিত কিছু বই ছাড়া আর কোনো বই কিংবা শিক্ষা উপকরণ অনলাইনে যথাযথভাবে পাওয়া যায় না। উচ্চস্তরের কোনো শিক্ষা উপকরণ এখনও ডিজিটালকরণে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারেনি। সরকার বা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারি উদ্যোগে তেমন কোনো প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে খুব একটা কাজও করছে না। এমনকি এ ধরনের কাজে সরকারের উত্সাহেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে আমার মনে হয়। ‘এক্সেস টু ইনফরমেইশন প্রোগ্রাম’ প্রধানমন্ত্রীর র্কাযালয়ের ebook.gov.bd ওয়েবসাইটে সহায়ক পাঠ্যবইয়ের ট্যাবে মিনা কমিক বই ছাড়া আর কোনো বই দেখা যায় না। আবার এই ebook.gov.bd ওয়েবসাইটটির লিংক রিডাইরেক্টকরণ বা অন্য কোনো প্রকাশকে ওয়েবসাইটে রিডাইরেক্ট ট্যাব ব্যবহারের ব্যধ্যবাধকতা না থাকায় ওয়েবসাইটটি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারছে না। প্রকাশকদের ওয়েবসাইটে পাঠ্যবই ট্যাব হিসেবে যদি সরকারি এ সাইটটির লিংক রিডাইরেক্ট করার সুযোগ করা হয় তাহলে খুব অল্প সময়ে সাইটটি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এবং বেসরকারি উদ্যোগে পাঠ্যবইয়ের সহায়ক বইসহ সব ধরনের বই ডিজিটাল আকারে প্রকাশকরণে প্রকাশকদের উত্সাহ যোগানো সরকারের উচিত বলে মনে হয়। বেসরকারি বা ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকেই অনলাইন জার্নাল প্রকাশ করে থাকে । এসব জার্নালের চাহিদাও প্রিন্ট মাধ্যমে প্রকাশিত জার্নালের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। যদি প্রকাশক শ্রেণি প্রিন্ট প্রকাশনার পাশাপাশি ই-বুক প্রকাশ করেন তবে এর চাহিদা পাঠকদের মধ্যে তৈরি হওয়ারও যথেষ্ট সুযোগ হবে। প্রিন্ট প্রকাশনায় যেমন প্রকাশক ও লেখক বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হয়ে থাকেন, তেমনি ই-বুক প্রকাশনার মাধ্যমেও প্রকাশক ও লেখক বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হতে পারেন। আমার মনে হয়, ই-বুক প্রকাশনায় তারা আরো বেশি লাভবান হবেন। কারণ প্রিন্ট প্রকাশনার ব্যাপ্তি খুবই সামান্য কিন্তু ই-বুকের ব্যাপ্তি হবে সহজেই বিশ্ব জুড়ে। দেশীয় এবং প্রবাসী উভয়ই খুব সহজেই এর সুফল ভোগ করতে পারবে, যে যার অবস্থান থেকে বাংলা ভাষায় বা বাংলাদেশে প্রকাশিত যে কোনো বই ন্যূনতম নিবন্ধন ফি দিয়ে সদস্য হওয়ার মাধ্যমে সহজেই পড়তে পারবেন। অতি সমপ্রতি বাংলাদেশে ব্যক্তি উদ্যোগে ই-বুক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশবাসীর পরিচয়ের সূচনা হয়েছে। এ রকম একটি প্রতিষ্ঠানের নাম DiGibook Publications. তাদের URL :http://digibook.com.bd. বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার সুবাদে প্রবন্ধকারের রচিত এবং সম্পাদিত তিনটি বই তারা ই-বুক আকারে প্রকাশ করে। তাদের প্রকাশনার গুণগত মান বিবেচনায় উদ্যোগটিকে সাধুবাদ না জানিয়ে উপায় নেই। ব্যবসায়িক ও লেখক রয়ালটি পলিসি প্রিন্ট প্রকাশনার চেয়ে কোনো অংশে খারাপ বলে মনে হয়নি। এমনকি প্রকাশনা ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। বাংলা ভাষার জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমী আয়োজিত একুশে বইমেলাসহ বিভিন্ন বইমেলায় ই-বুকের জন্য স্টল থাকলে বেসরকারি উদ্যেক্তাগণ আরো বেশি উত্সাহিত হবেন। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। অনেক ইতিহাস এবং ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে এই মাতৃভাষা বাংলার সঙ্গে। এই ইতিহাস আর ঐতিহ্যের কারণেই এটি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে সম্মান অর্জন করেছে। তাই বাংলা ভাষায় ই-বুক প্রকাশিত হলে আন্তর্জাতিক পরিসরে মাতৃভাষার সম্মান আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ই-বুকের যথেষ্ট কদর রয়েছে। এমনকি ই-বুকের বদৌলত আমরা বিশ্বের অন্য যে কোনো ভাষার বই অনলাইনে সহজেই দেখতে এবং পড়তে পারি। কিন্তু বাংলা আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়া সত্ত্বেও অনলাইনে বাংলা কোনো বই পড়া সম্ভব হয় না। এমনকি ইতিপূর্বে কখনো একুশে বইমেলাতে এমন সম্ভাবনাময় প্রকাশক প্রতিষ্ঠানকে স্টল নিতে দেখা যায়নি। প্রকাশকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই—আপনারা প্রিন্ট প্রকাশনার চেয়ে ডিজিটাল প্রকাশনার দিকে নজর দিন তাহলে খুব সহজেই বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষায় ই-বুকের সম্প্রসারণ ঘটবে যা বাঙালি জাতিকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করে তুলবে। সরকার যেহেতু দেশকে ডিজিটালকরণে অঙ্গীকারবদ্ধ কাজেই যথাযথ কর্তৃপক্ষের উচিত একুশে বইমেলাসহ সকল বইমেলায় ই-বুক স্টল বরাদ্দের সুযোগ করে দেয়া। এতে বাংলাদেশে ই-বুকের প্রতি লেখক, পাঠক এবং প্রকাশকদের আগ্রহ যথেষ্ট বাড়বে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়