রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফসহ ১৬ জনকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। গ্রেফতারের ২৪ ঘন্টার মধ্যে আদালতে হাজির করারও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার দুর্নীতি মামলার শুনানির পর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মুহাম্মদ চৌধুরী এ নির্দেশ দেন। আসামিদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়েছে। তবে দেশটির তথ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তারা এ ধরনের আদেশ পাননি। এ ঘটনায় দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সেনাবাহিনী এবং বিচার বিভাগ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আদালতের এই নির্দেশের পর করাচি শেয়াবাজারের সূচক ৩ শতাংশ পড়ে যায়। পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি আজ বুধবার ক্ষমতাসীন জোটের সব দলের বৈঠক আহ্বান করেছেন। খবর বিবিসি, ডন ও রয়টার্সের।
এর আগে বিচার বিভাগের এক আদেশের কারণে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছিল ইউসুফ রাজা গিলানিকে। এরপর ২০১২ সালের ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী হন রাজা পারভেজ আশরাফ। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে এখনই পদ
ছাড়তে হচ্ছে না বলে আইন-জীবীরা
জানিয়েছেন। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ জানিয়েছে, গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হওয়াকে সমর্থন করে না মুসলিম লীগ। তবে তেহরিক-ই-মিনহাজুল কুরআনের (টিএমকিউ) নেতা ড. তাহির-উল-কাদরী সুপ্রিম কোর্টের এ আদেশকে স্বাগত জানিয়েছেন। এর আগে তিনি গতকাল সকাল ১১টার মধ্যে দেশটির সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। সরকার তার দাবি প্রত্যাখ্যান করে। প্রভাবশালী এই ইসলাম ধর্মীয় নেতার নেতৃত্বে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে চলা দুর্নীতি বিরোধী মিছিলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাধা দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সর্বোচ্চ আদালত প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারের আদেশ জারি করে। বর্তমান অবস্থায় আগামী মে মাসে দেশটির সংসদ নির্বাচন ঠিক সময়ে অনুষ্ঠিত হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। ডনের রিপোর্টে বলা হয়, পাকিস্তান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। তবে প্রধান বিচারপতি নির্বাচন সঠিক সময়ে হবে বলে জানিয়েছেন।
আইনজীবী আমির আব্বাস বলেন, প্রধান বিচারপতি মামলার সকল আসামিকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়ে বলেন, কেউ দেশত্যাগ করলে দুর্নীতি দমন সংস্থা, এনএবি চেয়ারম্যান ও তার তদন্তকারী দলের সদস্যরা এর জন্য দায়ী থাকবেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আদালত মামলার শুনানি স্থগিত করে।
বিদ্যুত্ কেন্দ্র দুর্নীতি : প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, রাজা পারভেজ পানি ও বিদ্যুত্মন্ত্রী থাকাকালে ২০১০ সালে ঘুষ নিয়েছিলেন। এই মামলায় নয়টি ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্প প্রতিষ্ঠানকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, কোনো বিদ্যুত্ প্ল্যান্ট স্থাপন ছাড়াই এই প্রকল্পের জন্য অগ্রিম দুই হাজার দুইশ কোটি রুপি নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান কয়েকটি স্থাপন করলেও সেগুলো অনেক দেরিতে করা হয়েছে। ২০১২ সালের মার্চে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত অস্বচ্ছতার অভিযোগে এ চুক্তিটি বাতিল করার নির্দেশ দেন। ওই সময় আদালত দেশটির এনএবির চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল (অব.) ফাসিহ বোখারিকে ২০০৬ ও ২০০৮ সালে বিদ্যুত্ ঘাটতি কমাতে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্পের অস্থায়ী পদক্ষেপ হিসেবে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগপত্র দাখিলের নির্দেশ দেন। এ মামলার অভিযোগে বলা হয়, রাজা পারভেজ আশরাফসহ অভিযুক্তরা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে দায়িত্বপালন কালে ঘুষ নিয়ে কম মূল্যে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্পের কাজ দেন। এ কারণে বিদ্যুতের মূল্য পরবর্তীতে ৭ থেকে ১৪ শতাংশ বেড়ে যায়। এমনকি এনএবি’র চেয়ারম্যান এর আগে অভিযোগ করেছিলেন, মামলায় প্রধানমন্ত্রীর নাম দেয়া হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে তার নাম বাদ দেয়ার চেষ্টা হয়। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়ার পর তেহরিক-ই-মিনহাজুল কুরআনের নেতৃত্বে রাজধানী ইসলামাবাদে হাজার হাজার মানুষ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভকারীরা সুপ্রিম কোর্টের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে উল্লাস করে।
মে মাসের নির্বাচনের আগে দেশটির অবস্থা খুব অশান্ত হয়ে উঠছে। দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ হচ্ছে। অনেক পর্যবেক্ষক এটাকে কাকতালীয় ঘটনা বলে মানতে নারাজ। তারা মনে করছেন সামনের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানে এখন বড় রাজনৈতিক খেলা চলছে। নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল পিপিপিরই জয়লাভের সম্ভাবনা। কিন্তু পাকিস্তানে অনেক বিরোধী দলই চাইছে একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হোক এবং সেই সরকারে সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগের একটা বড় ভূমিকা থাকুক। গতকালের বিক্ষোভে যিনি নেতৃত্ব দেন, তিনি কানাডা প্রবাসী এক পাকিস্তানী ধর্মীয় নেতা তাহির-উল-কাদরি। তার মূল দাবিও তাই। মাত্র মাসখানেক আগে দেশে ফিরে তিনি হঠাত্ রাজনীতির মাঠে ভীষণ সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এই দাবিতে। এ নিয়ে তিনি দেশের নানা প্রান্তে বড় বড় সভা-সমাবেশ করছেন। পাকিস্তানে অনেক পর্যবেক্ষকই মনে করছেন, তাহির-উল-কাদরি সেনাবাহিনী এবং বিচার বিভাগের একটি অংশের মদদেই এটা করছেন। তাদের আশঙ্কা, পাকিস্তানে বিচার বিভাগ, সরকার, এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে আরেক দফা সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার বক্তব্য : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ফাওয়াদ চৌধুরী আদালতে আদেশের নিন্দা করে এটাকে অসাংবিধানিক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, সেনাবাহিনী এবং বিচার বিভাগ সরকারকে উত্খাত করতে একত্র কাজ করছে।
নির্বাচন ঠিক সময়েই : নির্বাচনী সংস্কার বিষয়ে দেশটির ওয়ার্কার্স পার্টি অব পাকিস্তানের এক আবেদনের মামলায় প্রধান বিচারপতি বলেন, নির্বাচন ঠিক সময়েই অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। এর আগে এই আবেদনের শুনানির আগে সুপ্রিম কোর্টে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ফখরুদ্দিন জি ইব্রাহিম বলেন, নির্বাচন ঠিক সময়েই অনুষ্ঠিত হবে এবং এ নিয়ে বিলম্বের কোনো কারণ নেই।
পিএমএল (এন) এর বক্তব্য : সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করে এমন কোনো কিছুকে সমর্থন করে না মুসলিম লীগ। দল চায় গণতন্ত্র শক্তিশালী হোক। গতকাল তেহরিক-ই-মিনহাজুল-কুরআনের (টিএমকিউ) লংমার্চের প্রেক্ষিতে দলের নেতাদের বৈঠক শেষে দলটির তথ্য সচিব আহসান ইকবাল এ কথা বলেন। তিনি টিএমকিউ এর হুমকিকে ‘বেআইনি এবং অসাংবিধানিক’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, ফেডারেল এবং প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙ্গে দেয়ার এখনো আট সপ্তাহ বাকি আছে। এ সময়ে কাদরির লংমার্চ এবং পরিষদ ভেঙ্গে দেয়ার দাবি আগামী নির্বাচনকে ভন্ডুল করার উদ্দেশ্য ছাড়া আর কিছু নয়।
ইমরান খান: তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের প্রধান সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান আগামী আট দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ঘোষণা না আসলে সারাদেশে প্রতিবাদ বিক্ষোভ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন।
