পেশাজীবীদের গোপন আয়ের সন্ধান করবে এনবিআর

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২৯
পেশাজীবী বিশেষত চিকিত্সক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টদের গোপন আয় ও কর ফাঁকি ধরতে এবার কঠোর হচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই লক্ষ্যে সকল কর কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছে এনবিআর। দেশের সিটি করপোরেশন এলাকা, পৌরসভাসহ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত এলাকায় এ কার্যক্রম চালিয়ে তাদের আয় মূল্যায়ন করবে। পেশাজীবীদের কর ফাইলও দৈবচয়ন ভিত্তিতে নিরীক্ষা করা হবে। এনবিআর মনে করে, পেশাজীবীরা তাদের বেতন-ভাতার বাইরেও অনেক অর্থ উপার্জন করেন যা করের বাইরে থেকে যায়। এসব অর্থ ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেশের বাইরে পড়াশোনা করা ছেলে-মেয়েদের জন্য ব্যয় করার নামে মোটা অংকের অর্থ বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই সাথে এ সকল অর্থের উত্সও খোঁজ করতে আরো কঠোর হবে রাজস্ব আদায়কারী এই প্রতিষ্ঠান। সম্পতি এনবিআরের কর কমিশনারদের সাথে এক বৈঠকে মাঠ পর্যায়ে পেশাজীবীদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নেয়ার নির্দেশ দেন এনবিআর চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন। সেই সাথে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি। গতকাল এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা সকল কর সার্কেলে পাঠানো হয়েছে। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। কর সার্কেলগুলোতে পাঠানো এনবিআরের চিঠিতে বলা হয়, ডাক্তার, প্যাথলজিস্ট, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী বেতন-ভাতার বাইরে বিপুল অর্থ আয় করে থাকেন। এ সকল অর্থের উত্স খুঁজে বের করতে হবে। পেশাজীবীরা সাধারণত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে থাকেন এবং ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য অনেকে বিদেশে অর্থ প্রেরণ করে থাকেন। এ সকল গোপন অর্থের উত্স খুঁজে বের করতে হবে। এছাড়া অপ্রদর্শিত অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করতে নতুন নতুন ক্ষেত্র উদ্ভাবন করতে নির্দেশ দেয়া হয়। এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থ বছরের প্রথমার্ধে আয়কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে কিছুটা পিছিয়ে আছে এনবিআর। আলোচ্য সময়ে ১৩ হাজার ১৫ কোটি টাকার আয়কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১২ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। এছাড়া সদ্য সমাপ্ত ডিসেম্বর মাসেও আয়করের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি আয়কর অণুবিভাগ। এর ওপর নতুন করে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রায় আরো ৮ হাজার কোটি টাকা যোগ করতে প্রাথমিকভাবে নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এই অবস্থায় চলতি ২০১২-১৩ অর্থ বছরে আয়করের লক্ষ্যমাত্রার (৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা) কলেবরও বাড়াতে হবে। এছাড়া আমদানি কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এবং কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায় না হওয়ায় আয়কর বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এ লক্ষ্যে আয়কর আদায় বাড়ানোর উপায় খুঁজছে এনবিআর। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, চিকিত্সক, আইনজীবী, প্রকৌশলীদের মতো পেশাজীবীরা তাদের প্রকৃত আয়ের বিরাট অংশ গোপন করেন। তবে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ মনে করেন, পেশাজীবীদের কাছে এনবিআর সঠিক ভাবে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে বিপুল পরিমাণ কর আদায় করা সম্ভব হয়নি। তিনি গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, অন্যদের তুলনায় ডাক্তার, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট— এই ধরনের পেশাজীবীরা সমাজে তুলনামূলক বেশি সম্পদের অধিকারী। কর্মকর্তারা আন্তরিক হলে তাদের কাছ থেকে বেশি কর আদায় করা সম্ভব। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এনবিআর সদস্য এম এ কাদের সরকার ইত্তেফাককে বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হচ্ছে এনবিআরকে। সেই লক্ষ্যেই এনবিআর চেয়ারম্যান আমাদের কিছু নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, শুধু পেশাজীবী নন, বাড়িওয়ালাদের কাছ থেকে এনবিআরের কাঙ্ক্ষিত করের অর্থ আদায় করতে ডেসা, ডেসকো, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গা থেকে তথ্য নিয়ে বহুতল ভবন চিহ্নিত করে তাদের মালিকের কাছ থেকে যথাযথ করের অর্থ আদায়ের জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাত্ করযোগ্য সব খাত চিহ্নিত করতে এখন থেকে কাজ করতে হবে। এছাড়া মামলায় আটকে থাকা কর আদায় ও কর অফিসে করদাতাদের যাতে কোনো কর্মকর্তা হয়রানি না করেন সেজন্য কমিশনারদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে অপ্রদর্শিত অর্থ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিনিয়োগে আসছে না। অপ্রদর্শিত অর্থকে আরো বেশি পরিমাণে বিনিয়োগে নিয়ে আসতে নতুন নতুন বিনিয়োগের খাত চিহ্নিত করতে চায় এনবিআর। এ অর্থ বিনিযোগে নিয়ে আসতে নতুন সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করতে কমিশনারদের ওই বৈঠকে তাগিদ দিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। গত ২০১১-১২ অর্থ বছরে শেয়ার বাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হলেও পুরো বছরে মাত্র ৩৮২ কোটি কালো টাকা বিনিয়োগে এসেছে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্র আরো কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। তবে এতেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া মিলছে না।