শেয়ারবাজারে লেনদেনের খরা প্রকট হয়ে উঠেছে। তীব্র তারল্য সঙ্কটে গত ১২দিন ধরে লেনদেন হচ্ছে দুশ’ কোটি টাকার নিচে। গতকাল বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হয়েছে ১৩৪ কোটি টাকা। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছে ১০৪ কোটি টাকা। যা গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ দুই বছর আগেও বাজারের দৈনিক (গড়) লেনদেন ছিল দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা।
লেনদেন অব্যাহতভাবে কমে যাওয়াকে বাজারের জন্য বড় সমস্যা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, লেনদেন কমে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর আয় কমে যাওয়ায় তারা বিপাকে পড়ে গেছে। ইতিমধ্যে অনেকে লোক ছাঁটাই শুরু করেছে। তাছাড়া বাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমে যাওয়ায় তারা বিনিয়োগেও আসতে পারছে না। ফলে তারল্য সঙ্কট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এ অবস্থায় বিদেশি বিনিয়োগকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরকে বাজারে ফিরিয়ে আনতে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ইত্তেফাককে বলেন, শেয়ারবাজারে সূচকের ওঠানামা থাকবে। তবে লেনদেনের পরিমাণ এতো কমে যাওয়া বড় চিন্তার বিষয়। লেনদেন কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আস্থার অভাবে শেয়ারের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকার পরও বিনিয়োগ বাড়ছে না। তাছাড়া মিউচুয়াল ফান্ড ও ব্রোকারেজ হাউসসহ বাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমে যাওয়ায় তারা নিজেরাই সমস্যায় রয়েছে। তার উপর দীর্ঘদিন ধরে দরপতনের ফলে অনেকের বিনিয়োগ আটকে পড়েছে। তাই তারা বিনিয়োগ করতে পারছে না। এরপরও যেসব প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সুযোগ রয়েছে তারা বাজারে আসছে না। তাই তাদেরকে বাজারে নিয়ে আসতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা না আসলে বাজার স্থিতিশীল হবে না। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ১৯৯৬-এর শেয়ার ধসের পর পর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাজারে আসলেও দ্রুত লাভ করে বাজার ছাড়ার প্রবণতায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ প্রসঙ্গে ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের মতো বাজারগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বল্প মেয়াদে মুনাফা করে চলে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তবে বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
এদিকে গত দুই বছর ধরে শেয়ারবাজারের পরিস্থিতি নাজুক থাকায় বাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ সঙ্কটে রয়েছে। মার্জিন লোনের (শেয়ার লেনদেনকারীদেরকে দেয়া ঋণ) ইকুইটি ঋণাত্মক হওয়ায় মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো বেশ সঙ্কটের মুখে পড়ে গেছে। জানা গেছে, অব্যাহত ধসের কারণে এ ঋণের অন্তত ৩০ শতাংশ ইকুইটি ঋণাত্মক হয়ে গেছে। অর্থাত্ মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের শেয়ার ক্রয়ে যে পরিমাণ ঋণ দিয়েছিল গ্রাহকদের সব শেয়ার বিক্রি করলে তাদের ঋণের ৩০ শতাংশই ফেরত পাওয়া যাবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ৫০ শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মার্চেন্ট ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজারে ধস শুরু হওয়ার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ায় তারা অতিরিক্ত মার্জিন লোন সমন্বয় করতে পারেননি। আবার সুদও দিতে পারছেন না। এতে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো বিভিন্ন উত্স থেকে যে ঋণ করেছে তারা তা শোধ করতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। তার উপর মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর নিজস্ব পোর্ট ফোলিও বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি মোহাম্মদ এ হাফিজ বলেন, মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে সাবসিডিয়ারি কোম্পানি করার পর আমাদের বিনিয়োগের ক্ষমতা কমে গেছে। এরপরও যতটুকু ক্ষমতা রয়েছে তা অব্যাহত দরপতনের কারণে শেয়ারবাজারে আটকে রয়েছে। আর মার্জিন লোনের টাকা জোগাড় করতেই অনেক মার্চেন্ট ব্যাংক বিপাকে পড়ে গেছে। তাই মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো খুব একটা বিনিয়োগ করতে পারছে না।
এদিকে লেনদেনের খরার কারণ অনুসন্ধানে ডিএসই শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করছে। ইতোমধ্যে ব্রোকারেজ হাউস ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর সাথে বৈঠক করেছে। এরপর শেয়ার ডিলার, ব্যাংকার ও ব্যাংক মালিকদের সঙ্গেও বৈঠক করা হবে। বৈঠকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন কারণ ও সমাধানের উপায় লিপিবদ্ধ করে তা বিএসইসিকে দেয়া হবে। এ প্রসঙ্গে ডিএসই’র ভাইস প্রেসিডেন্ট রশিদ আহমেদ লালী ইত্তেফাককে বলেন, লেনদেন কমে যাওয়ার কারণ ও তা সমাধানের উপায় জানতে ডিএসই বাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করছে। তাদের পরামর্শগুলো পর্যালোচনা করে ডিএসই’র পক্ষ থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। যেন যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়। তিনিও বাজার স্থিতিশীলতায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরকে বাজারে নিয়ে আসার উপর জোর দেন।
এদিকে ডিএসই’র প্রেসিডেন্ট রকিবুর রহমানও শেয়ারবাজারের লেনদেন কমে যাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন কোন খারাপ পরিস্থিতিতে নেই যে, শেয়ারবাজারের লেনদেন এত নেমে যাবে। আস্থা সঙ্কটের কারণেই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারে আসছেন না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
