স্বপ্নের মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৩
অনেকেই রয়েছেন, যারা দেশের বাইরে গিয়েই কাজ করতে চান। তুলনামূলকভাবে একটু বেশি আয়ের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে শুরু করে পশ্চিমা দেশগুলোতে যাওয়ার ইচ্ছে থাকে এমন অনেকেরই। আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে চিন্তা করলে মালয়েশিয়া এমন একটি দেশ, যেখানে যাওয়ার জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় ছিলেন অনেকেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ ছিল। তবে নতুন বছরের সুখবর, চার বছর পর মালয়েশিয়া আবার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া শুরু করতে যাচ্ছে। আর এবারে দেশটিতে কর্মী যাবেন দুই দেশের সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যার নাম দেওয়া হয়েছে জি টু জি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট)। ফলে এবার ৪০ হাজার টাকায় কর্মীরা সেখানে যেতে পারবেন। মালয়েশিয়ায় চার বছর ধরে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ ছিল। দীর্ঘ কূটনৈতিক যোগাযোগের পর এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে দেশটি। গত ২৬ নভেম্বর এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারকও (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। মালয়েশিয়া জানিয়েছে, আগামী কয়েক বছরে বনায়ন (প্লান্টেশন), কৃষি (এগ্রিকালচার), উত্পাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং), নির্মাণ (কনস্ট্রাকশন) এবং সেবা (সার্ভিস)—এ পাঁচ খাতে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ লাখ কর্মী নেবেন তারা। তবে শুরুটা হবে বনায়ন খাত দিয়ে। ইতিমধ্যে মালয়েশিয়া ১০ হাজার কর্মীর চাহিদাপত্রও পাঠিয়েছে। আগামী দুই মাসে এ খাতে আরও ২০ হাজার চাহিদাপত্র আসবে। বনায়ন খাতে যারা কাজ করতে যেতে চান, তাদের জন্য ১৩ জানুয়ারি থেকে নাম নিবন্ধন শুরু হয়েছে। মনে রাখতে হবে, নাম নিবন্ধন ছাড়া কোনো কর্মী এবার মালয়েশিয়া যেতে পারবেন না। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা বনায়ন খাতের কর্মী হিসেবে যারা মালয়েশিয়া যেতে চান, তাদের মোট সাতটি যোগ্যতা থাকতে হবে। এগুলো হলো—বাংলাদেশের নাগরিকত্ব, কৃষিকাজে অভিজ্ঞতা, বয়স ১৮ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে, গ্রাম এলাকার প্রকৃত বাসিন্দা, উচ্চতা পাঁচ ফুট বা তদূর্ধ্ব, ওজন কমপক্ষে ৫০ কেজি এবং ২৫ কেজি মালামাল হাতে করে বহনের ক্ষমতা। এ যোগ্যতার বাইরে কেউ বনায়ন খাতে যেতে পারবেন না। নিবন্ধনের দিন-তারিখ-স্থান মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য ১০ জানুয়ারি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। এরপর বিভাগ অনুযায়ী নাম নিবন্ধন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। নিবন্ধনের জন্য খরচ মাত্র ৫০ টাকা। প্রতিটি বিভাগের ইচ্ছুক ব্যক্তিরা নিবন্ধনের জন্য তিন দিন করে সময় পাবেন। নাম নিবন্ধনের সময় শেষ হওয়ার পরদিনই ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে, কারা কারা নিজ বিভাগ থেকে এবার মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য যোগ্য হলেন। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, কোনো সাইবার ক্যাফে বা বাড়ির ইন্টারনেটে নয়, কেবল ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রে গিয়েই নাম নিবন্ধন করা যাবে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো জায়গায় নিবন্ধন করার সুযোগ দিলে প্রতারণা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর তাই কেবল ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রেই নিবন্ধনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত নিবন্ধন করা যাবে। আগেই বলা হয়েছে, নিবন্ধন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। নিবন্ধনের শুরুটা হয়েছে ঢাকা ও বরিশাল বিভাগ দিয়ে। গত ১৩ জানুয়ারি থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চলে এই দুই বিভাগের নিবন্ধন প্রক্রিয়া। নিবন্ধন প্রক্রিয়া যথেষ্ট সাড়াও জাগায় সকলের মাঝে। বাংলাদেশ জনশক্তি ও কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সাথে যোগাযোগ করে জানা যায়, ঢাকা এবং বরিশাল বিভাগ থেকে তিন দিনে ৪ লক্ষাধিক ব্যক্তি আবেদন করেছেন। তাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিতদের তালিকা গতকাল প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল। এই লেখা শেষ হওয়া পর্যন্ত অবশ্য লটারি হয়নি। ঢাকা ও বরিশালের বাইরের বিভাগগুলোতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে গতকাল। রাজশাহী, রংপুর ও সিলেট বিভাগের লোকজন গতকাল ১৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে আগামীকাল ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত নাম নিবন্ধন করার সুযোগ পাবেন। আর খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগে নিবন্ধন প্রক্রিয়া চলবে ১৯ জানুয়ারি থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত। লটারির মাধ্যমে কর্মী নির্বাচন মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য বিপুলসংখ্যক লোক অপেক্ষা করছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগ্রহীরা নিবন্ধনের পর লটারির মাধ্যমে তাদের থেকে নির্বাচিতদের তালিকা তৈরি করা হবে। সেক্ষেত্রে জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়ন থেকে কোটা ঠিক করে ওই লটারি করা হবে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, কারও মধ্যে যেন কোনো প্রশ্ন তৈরি না হয়, সে জন্য তিন দিন নিবন্ধনের পর প্রত্যেক জেলায় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে লটারির মাধ্যমে ইউনিয়নের জনসংখ্যার অনুপাতে কোটা অনুযায়ী কর্মীর তালিকা করা হবে। প্রাথমিকভাবে সাড়ে ৩৪ হাজার কর্মীর তালিকা তৈরি করে সেখান থেকে আবার জাতীয় ভিত্তিতে সাড়ে ১১ হাজার কর্মীর একটি তথ্যভাণ্ডার করা হবে। এখান থেকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে আবার লটারির মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে পাওয়া চাহিদা অনুযায়ী ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর চূড়ান্ত তালিকা করা হবে। যে ১০ হাজার ব্যক্তিকে চূড়ান্ত করা হবে, তাঁদের সবার মুঠোফোনে প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠানো হবে। যারা প্রথম দফায় যেতে পারবেন না, তারা পরে চাহিদাপত্র পাওয়ার ভিত্তিতে যেতে পারবেন। কাজেই কাউকে নতুন করে আর নিবন্ধন করতে হবে না। প্রশিক্ষণ নিতে হবে এবার মালয়েশিয়ায় পাঠানোর আগে প্রত্যেক কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেবে সরকার। তবে তার আগে ১৩টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) তাদের সাক্ষাত্কার নেওয়া হবে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত কর্মীদের মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়ে দেওয়া হবে কার কোন টিটিসিতে সাক্ষাত্ ও তথ্য যাচাই-বাছাই হবে। সাক্ষাতের পর কর্মীর স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হবে। এরপর তার আঙুলের ছাপ নেওয়া হবে। এরপর আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম) প্রত্যেক কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা নেবে। শুরুতে ১০ দিনের একটি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ প্রশিক্ষণে তাকে মালয়েশিয়ার ভাষা, খাবার, সংস্কৃতি, আইনকানুন—এসব সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হবে। এ সংক্রান্ত বইপুস্তকও দেওয়া হবে তাকে, যাতে মালয়েশিয়ায় গিয়ে তিনি কোনো সমস্যায় না পড়েন কিংবা কোনো আইন ভঙ্গ না করেন। খরচ আর বেতনের তথ্য সরকারিভাবে এবার মালয়েশিয়ায় যেতে একজন কর্মীর সর্বোচ্চ খরচ পড়বে ৪০ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রে তাকে যাওয়ার বিমানভাড়া দিতে হবে। তবে দেশে ফেরার সময় নিয়োগকর্তা তার বিমানভাড়া দেবেন। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুরুতে নাম নিবন্ধনের জন্য ৫০ টাকা দিতে হবে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য দিতে হবে তিন হাজার টাকা। প্রশিক্ষণ খরচ হিসেবে তাকে দিতে হবে দেড় হাজার টাকা। বহির্গমন ছাড়পত্র ও স্মার্ট কার্ডের জন্য তাকে দিতে হবে এক হাজার টাকা। টেড্র (যে খাতে কাজ করবেন) পরীক্ষার জন্য দিতে হবে ৫০০ টাকা। বিমানভাড়ার জন্য একজন কর্মীর ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাগবে। নিজের খরচেই কর্মীকে যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট বা এমআরপি করতে হবে। বনায়ন খাতে যারা যাবেন, তাদের বেতন ন্যূনতম ৯০০ রিঙ্গিত বা ২৫ হাজার টাকা হবে বলে জানানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে।