বিগত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদের শেষ সময় ৪ কোটি টাকার ব্যাগ ক্রয়ের কাজে রীতিমতো ‘পুকুর চুরি’ হয়েছে বলে প্রমাণ মিলেছে। এ সংক্রান্ত তদন্তে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজে তথ্য সংগ্রহকারীদের জন্য ব্যাগ কেনার পুরো প্রক্রিয়াই ছিল অস্বচ্ছ। ঘুষ প্রদান ও আইন লংঘন করে প্রায় ৭২ হাজার ব্যাগ ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। অনিয়ম তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাগ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জাল ব্যাংক গ্যারান্টি ও অভিজ্ঞতার জাল সনদ দাখিলের মাধ্যমে কাজ পেয়েছিল। এজন্য কমিশনের অধীনস্থ স্ট্রেংদেনিং ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ (এসইএমবি) প্রকল্পের ৩ জনসহ ব্যাগ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে কমিটি। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম-সচিব জেসমিন টুলি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন।
জানা গেছে, ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভোটার তালিকা হালনাগাদের জন্য তথ্য সংগ্রহকারীদের ব্যাগ প্রদানের লক্ষ্যে ৭২ হাজার ব্যাগ কেনার সিদ্ধান্ত নেয় এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন তত্কালীন নির্বাচন কমিশন। প্রায় ৪ কোটি টাকায় কমিশনের অধীনস্থ ‘স্ট্রেংদেনিং ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ (এসইএমবি)’ প্রকল্পের আওতায় এসব ব্যাগ কেনার কথা ছিল। এজন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও তত্কালীন কমিশনের শীর্ষ এক ব্যক্তির আত্মীয় হওয়ার সুবাদে ব্যাগ সরবরাহের কার্যাদেশ দেয়া হয় ‘মেসার্স জামান অ্যান্ড ব্রাদার্স’কে। অথচ সকল যোগ্যতা থাকার পরও দরপত্রে অংশ নেয়া সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়নি। এই ঘটনায় কমিশন ও সচিবালয়ের মধ্যে এক ধরনের দূরত্বের সৃষ্টি হয়।
গত বছরের ১০ মার্চ শুরু হওয়া ভোটার তালিকা হালনাগাদ কাজের জন্য মোট ৭২ হাজার ব্যাগের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ব্যাগ সরবরাহ পাওয়ার পর সচিবালয়ে অভিযোগ আসে ব্যাগগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের। এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে অনিয়ম পাওয়ায় গত বছরের ২৯ মার্চ কমিশনের সভায় ব্যাগ সরবরাহের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি দীর্ঘদিন অনুসন্ধান চালিয়ে ব্যাগ ক্রয়ে অস্বচ্ছতা ও ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করে। ১৬ জানুয়ারি কমিটির প্রতিবেদন কমিশন সভার আলোচ্যসূচিতে রাখা হলেও এ নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে কোনো আলোচনা হয়নি। আগামী কমিশন সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
তদন্ত প্রতিবেদন :ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেসার্স জামান অ্যান্ড ব্রাদার্সের গত ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর দাখিলকৃত পত্রের দ্বিতীয় শর্তে উল্লিখিত ব্যাংক গ্যারান্টির বিষয়টি নিষ্পত্তি না করে ডাচ বাংলা ব্যাংকের ২০১১ সালের ২৭ ও ২৮ ডিসেম্বরের ব্যাংক গ্যারান্টি যাচাই না করে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। মেসার্স জামান অ্যান্ড ব্রাদার্সের দরপত্রের সাথে দাখিলকৃত সনদপত্র যাচাই করা হয়নি। এক্ষেত্রে কমিটির তদন্তে উক্ত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নিপোর্ট (niport)-এর সনদ জাল বলে প্রমাণিত হয়। ব্যাগ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারণে জাল ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে চুক্তি করা হয়। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী ব্যাংক গ্যারান্টি যাচাই-বাছাই করা হয়নি। অপরদিকে নিম্নমানের মাল সরবরাহকালে ব্যাংক গ্যারান্টির বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হলে তা যাচাই করে ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত নয় মর্মে ঘোষিত হয়। জাল ব্যাংক গ্যারান্টির কারণে ৩৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব হয়নি।
অনিয়মে জড়িত যারা:কমিটির তদন্তে অনিয়মের সঙ্গে ৪ জনের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এরা হলেন:এসইএমবি প্রকল্পের ফাইন্যান্স এক্সপার্ট মো. নূরুল আলম, এসইএমবি প্রকল্পের সাবেক প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর মো. আব্দুল আলীম, এসইএমবি প্রকল্পের সাবেক এনপিডি এবং ইসির উপ-সচিব মো. শাহজাহান মিয়া এবং ব্যাগ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স জামান অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী।
নূরুল আলমের ব্যাপারে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রকল্পের ফাইন্যান্স এক্সপার্ট অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তিনি কার্যাদেশ দেয়ার সাথে সাথে নমুনা ব্যাগ ফেরত দেন, নিম্নমানের ব্যাগ গ্রহণ করে সঠিক মর্মে প্রত্যয়ন এবং ব্যাংক গ্যারান্টির বিষয়ে তার বক্তব্য প্রতারণা ও দুর্নীতিমূলক। এজন্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ইউএনডিপিকে অনুরোধ করা যায়।’
অপরদিকে এসইএমবি প্রকল্পের সাবেক প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর মো. আব্দুল আলীমের ব্যাপারে বলা হয়, ‘তিনি সরাসরি এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। ব্যাগ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিধি বহির্ভূতভাবে পারফরমেন্স সিকিউরিটির অপারগতার বিষয়টি জানতেন। বিষয়টি নথি উত্থাপনের সময় তিনি গুরুত্ব দেননি। তিনি বিধিবহির্ভূতভাবে কার্যাদেশের অতিরিক্ত ৪ লাখ ৪ হাজার টাকা বিল পরিশোধের জন্য উত্থাপন করেন। তার বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ইসির উপ-সচিব মো. শাহজাহান মিয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘তিনিও অনিয়মে সরাসরি জড়িত। ব্যাংক গ্যারান্টির বিষয়ে তার বক্তব্য স্ববিরোধী। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে প্রকল্প থেকে অনুরোধ করা যেতে পারে।
এছাড়াও ব্যাগ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মেসার্স জামান অ্যান্ড ব্রাদার্সে’র অভিজ্ঞতার সনদ জাল। প্রতিষ্ঠানটি জাল ব্যাংক গ্যারান্টির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পের ফাইন্যান্স এক্সপার্টকে দুই লাখ টাকা ঘুষ প্রদানে সম্মতি প্রদান করেছেন। এক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী প্রকল্প থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও তার প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
এ বিষয়ে এসইএমবি প্রকল্পের পরিচালক ও ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে প্রতিবেদন কমিশন সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। আশা করছি আগামী সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
