দেশের ২০টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক মুনাফা দেখানোর ক্ষেত্রে গরমিল করেছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই ব্যাংকগুলোর মুনাফা যাচাই-বাছাই করবে। জানা গেছে, খেলাপি ঋণ গোপন করে অথবা বাড়িয়ে মুনাফা দেখানোর মাধ্যমে কোনো ব্যাংক বিশেষ সুবিধা নিচ্ছে কিনা তা পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে মোট ৩০টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে এ ২০টি ব্যাংককে কিসের ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়েছে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা জানাতে পারেননি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, এসব ব্যাংকের কিছু তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে এসব ব্যাংকের মুনাফা পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
উল্লেখ্য, একটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যত বেশি থাকে ওই ব্যাংকের নিট বা প্রকৃত মুনাফা তত কমে যায়। খেলাপি ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা মেনে চললে কোন ব্যাংকের বেশি মুনাফা হবার কথা নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে এ বিষয়ে বলেছেন, একটি ব্যাংক বছর শেষে ১০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলে তা থেকে প্রথমেই সাড়ে ৪২ শতাংশ কর্পোরেট কর পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া পরিচালন মুনাফা থেকে বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি বা সংরক্ষিত রিজার্ভ রাখতে হয় ২০ শতাংশ। বাকি থাকে সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে জেনারেল রিজার্ভ রাখতে হয় আরো এক শতাংশ। বাকি ৩৬ কোটি টাকা থেকে সংরক্ষণ করতে হয় ঋণের নিরাপত্তা বা সঞ্চিতি।
জানা গেছে, যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যত বেশি সেই ব্যাংকের প্রভিশনও সংরক্ষণ করতে হয় সে হারে। কোনো ব্যাংকের ৩০০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১০০ কোটি টাকা খেলাপি হলে ঋণের শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী সে ব্যাংককে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই সূত্র বলছে, ঋণ নিম্নমান হলে ওই ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক হলে ওই ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণ হলে ওই ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। কোনো ব্যাংক ১০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলে কর, বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি ও জেনারেল রিজার্ভ সংরক্ষণ করার পর বাকি থাকে সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের কারণে ওই ব্যাংকের প্রভিশন সংরক্ষণ করতে যদি ১৫ কোটি টাকা চলে যায় তাহলে বাকি থাকে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা। এই সাড়ে ১৬ কোটি টাকা থেকে আবার অনেক ব্যাংক তাদের ব্যাংকের মূলধন বাড়ানোর জন্য ২ থেকে ৩ শতাংশ রিজার্ভে রেখে দেয়। এরপর বাকি থাকে সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। অর্থাত্ কোনো ব্যাংক ১০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলে সব বাদ দিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য থাকবে মাত্র সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। এই সাড়ে ১৪ কোটি টাকার ভাগিদার হলেন ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকরা। এই সাড়ে ১৪ কোটি টাকার ওপরই ব্যাংক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলে তার অধিকাংশেরই সুবিধাভোগী হন পরিচালকরা।
উল্লেখ্য, প্রকৃত খেলাপি ঋণ গোপন করাসহ নানা কারসাজির আশ্রয় নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা নেয়ার প্রমাণ পেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন করে এমন ৮টি ব্যাংককে চিহ্নিত করেছিল। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে দেখতে পায় আলোচ্য আটটি ব্যাংক প্রকৃত খেলাপি ঋণকে গোপন করে তা নিয়মিত দেখিয়েছিল। এর ফলে খেলাপি ঋণ দেখালে যেখানে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হতো, নিয়মিত দেখানোর ফলে ওই ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংক্ষণ করতে হয়নি। এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তাদের প্রকৃত মুনাফা বেশি দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তাদের আর্থিক বিবরণী দাখিল করেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিষয়টি চিহ্নিত হওয়ার পর ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। এবারও বাংলাদেশ ব্যাংক একই ব্যবস্থা নেবে বলে জানা গেছে।
