হাওড়াঞ্চলে নারীর ভাগ্য পাল্টাচ্ছে

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:০১
হাওরাঞ্চল মানে এক পশ্চাত্পদ জনপদ। যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো সেই মান্ধাতার আমলের। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান প্রতিটি ক্ষেত্রেই হাওরবাসীরা চির অবহেলিত। ‘বর্ষায় নাও, শুকনায় পাও’-যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটিই হল হাওরাঞ্চলের বাস্তবতা। অশিক্ষা আর কুসংস্কার-হাওরবাসীদের মনে ভর করে আছে। আর হাওরাঞ্চলের নারীরা তো চির নিষ্পেষিত, চির নির্যাতিত। কিন্তু যুগের হাওয়া আস্তে আস্তে পাল্টাতে শুরু করেছে। গত দেড়-দুই দশকে হাওরবাসীদের জীবনচিত্র অনেক পাল্টে গেছে। বিশেষ করে হাওর এলাকার নারীদের মধ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। তারা এখন আর শুধু সংসারের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা এখন আর সংসারের বোঝা না। তাদের চোখ-কান খুলে গেছে। তারা এখন তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েছে। হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে। ফলে সংসার ও সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তাদের সেই অন্ধকার গুহা থেকে আলোর পথে টেনে এনেছে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও)। বিশেষ করে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত ‘ফুড সিকিউরিটি ফর দি আলট্রা-পুওর ইন হাওর রিজিয়ন (এফএসইউপি-এইচ)’ প্রকল্পের মাধ্যমে কেয়ার বাংলাদেশ ও পপি হাওরাঞ্চলের হতদরিদ্র নারীদের জন্য সৌভাগ্যের দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে। করিমগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম উরদীঘির কৃষি শ্রমিক মোহাম্মদের স্ত্রী দিলোয়ারা। সংসার জীবনে তাদের তিন ছিলে ও দুই মেয়ে। দিলোয়ারার স্বামী বছরের প্রায় ছয় মাসই বেকার থাকে। অভাব-অনটন ছিলো তাদের নিত্যসঙ্গী। আর এর কারণে স্বামীর দৈহিক নির্যাতন ছিলো যেন দিলোয়ারার ভাগ্যের লিখন। এ ছিলো তিন বছর আগের কথা। কেয়ারের ইউনিয়ন পর্যায়ের মাঠ কর্মীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর তার ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে। তিনি জুস তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। কেয়ার তাকে ৪ হাজার ৭শ টাকা প্রদান করে। এ টাকায় ঘরে বসে জুস তৈরি করে বিক্রি শুরু করেন। এতে তার দিনে ভালো লাভ থাকে। তিনি টাকা সঞ্চয় করতে থাকেন। অবশেষে তিনি বাড়িতে নিজেই দোকান খুলে বসেন। লাভের টাকায় বাছুর প্রতিপালন করে বিক্রি করেন। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আগে ভাঙ্গাঘর ছিলো। ইতিমধ্যে তিনি নতুন করে ঘর তুলেছেন। নতুন ঘরে বিদ্যুত্ এসেছে। ঘরে এখন টিভি-ফ্রিজ আছে। তিনি এখন জমি ‘পত্তন’ রেখে সেখানে চাষাবাদও করছেন। একই গ্রামের আসমা কেয়ারের কাছ থেকে ৪ হাজার ৭শ টাকা পেয়ে পুরাতন শাড়ি কাপড় ক্রয় করে কাঁথা সেলাইয়ের জন্য বিক্রি করেন। লাভের টাকায় তার দুঃখ ঘুচেছে। একইভাবে দুঃখ ঘুচেছে সখিনারও। তিনি মরিচখালী বাজারে দোকান খুলে বসেছেন। একই কথা জানালেন তাড়াইল উপজেলার সিংগুয়ারপাড় গ্রামের রীনা, সালমা খাতুন, রেজিয়া প্রমুখ। তারা কেউ বাঁশ-বেত, কেউ সেলাই মেশিনের কাজ, কেউ হাঁস-মুরগী-কবুতর পালন করে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন। কেয়ার ও পপি সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে হাওরাঞ্চলে এফএসইউপিএইচ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। গত ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। জেলার সাতটি উপজেলার ৩৭টি ইউনিয়নের ২২৪টি গ্রামে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। উপজেলাগুলো হচ্ছে ইটনা, মিঠামইন, নিকলী, করিমগঞ্জ, তাড়াইল, কটিয়াদী ও অষ্টগ্রাম। ইটনায় কেয়ার ও পপি যৌথভাবে, নিকলী ও করিমগঞ্জে কেয়ার এবং বাকি উপজেলাগুলোতে পপি এককভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। হাওরাঞ্চলের চরম দারিদ্র্যতা, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও বিপদাপন্নতা কমিয়ে আনাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। এ সময়ের মধ্যে ১৯ হাজার ৮৬০টি হতদরিদ্র পরিবারের মধ্যে প্রত্যেক পরিবারের একজন নারী সদস্যকে অফেরতযোগ্য ৪ হাজার ৭শ টাকা প্রদান করা হয়। তাদের দেয়া হয় ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ। প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তারা একক কিংবা কমিউনিটিভিত্তিক পশুপালন, হাঁস-মুরগী পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা; যেমন মুদির দোকান, শাক-সবজি, পিঠা বিক্রি, ভাঙ্গারি বিক্রি, শুঁটকি মাছ বিক্রি ছাড়াও, হস্ত শিল্প, জমি-জলাশয় ক্রয় কিংবা বন্ধক, মত্স্য চাষ প্রভৃতির মাধ্যমে তারা আয়-উপার্জনে লিপ্ত হয়েছেন। কেয়ারের এফএসইউপি-এইচ প্রকল্পের টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর (ডকুমেন্টশন এন্ড কমিউনিকেশনস্) স্পেশালিস্ট শাহীনা পারভীন জানান, ইতিমধ্যে আয়ের পথ সৃষ্টি হওয়ায় মহিলারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত, তিন বেলা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পরিবার ও সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্পের প্রজেক্ট ম্যানেজার তৈয়ব আলী জানান, হাওরাঞ্চলের অতি দরিদ্র নারী এবং তাদের ওপর নির্ভরশীলদের খাদ্যে প্রবেশাধিকার, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও বিপদাপন্নতা কমিয়ে নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন সাধনই ছিল এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য এবং ইতিমধ্যে এর সুফল হাওরাঞ্চলের নারীরা পেতে শুরু করেছে।