বই-এর বিকল্প বই

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৩
অনার্স এবং এমএ ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের কাছে যখন কোনো প্রথিতযশা লেখকের গ্রন্থ সম্বন্ধে জানতে চাই তারা না পারার লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল সম্বন্ধেও এদের জ্ঞান যত্সামান্য। সারা ক্লাসে দু’একজন সাহস সঞ্চয় করে উত্তর দিতে দাঁড়ালেও কাব্যকে বলে উপন্যাস—উপন্যাসকে বানিয়ে ফেলে কাব্য। তখন নিজেরই লজ্জা লাগে, শিক্ষক হিসাবে কী আমরা শিক্ষা দিচ্ছি! জাতি কি তবে এভাবেই নিম্ন মানের শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাবে? যেতে পারবে? এর জন্য দায়ী কারা? এককভাবে ছাত্রছাত্রীদের দোষ দিয়ে আমরা কি পার পাবো? এই সমস্যার সমাধান কী? একটি কথা অবশ্যই বলতে হবে—এই প্রতিযোগিতার যুগে আমরা ছাত্রছাত্রীদের যেন ফার্মের মুরগি বানিয়ে ফেলছি। মুরগিগুলোর অন্যদিকে তাকাবার ফুরসত্ নেই— খাও দাও—ডিম পারো ব্যাস। পাঠ্যপুস্তক গিলিয়ে আমরাও ছাত্রদের তা-ই করছি—সর্বনাশটা হচ্ছে এখানেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কথা যদি ধরি তাহলে বলতে হয় তাদের সঙ্গে একশোটা কথা বললে আটানব্বইটা হচ্ছে— পড়, পড় এবং পড়, স্কুলে যাও, পরীক্ষা দাও, পাস করো। ব্যাস, আর কোনো দিকে তাকাবে না। সেজন্যই এদের এমন কলেজ বা সাধারণ জ্ঞানের অবস্থা নাজুক। পহেলা জানুয়ারি এদেশে এক ব্যতিক্রমী উত্সব হয়ে গেলো—বই উত্সব। বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে চললো পাঠ্য পুস্তক বিতরণ উত্সব। স্বাভাবিকভাবেই এ উত্সবে সবাই খুশি, মহা খুশি। তবে প্রদীপের নিচে যেমন অন্ধকার (অবশ্য সে-প্রদীপ এখন প্রায় অচল) তেমনি একটু অন্ধকার রয়ে গেলো যেন। পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে শ্রেণির সামঞ্জস্য রেখে একটি করে ছড়া বা গল্পের অথবা জ্ঞান-বিজ্ঞানের কৌতূহল উদ্রেককারী পুস্তক দেয়া গেলে ভালো হতো। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ঐ বিশেষ পুস্তক সম্বন্ধে প্রশ্ন করলে জানতে পারতেন ছাত্রটির অন্য বইয়ের প্রতি আগ্রহ কেমন। অবশ্য এ ব্যাপারে শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের ওপর দায় চাপানো আমার উদ্দেশ্য নয়। এখানে ভূমিকা রয়েছে বিশেষ করে অভিভাবকের, শুভাকাঙ্ক্ষী আত্মীয়স্বজনদেরও। কিন্তু এ কথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই—ছাত্রছাত্রীদের মানসিক বিকাশ পরিবারের চেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশি। তাই তার দায়িত্বটাও বেশি। যারা এই কোমলমতি ছেলেমেয়েদের গড়ে তোলার দায়িত্বে নিয়োজিত তাদের মনে রাখতে হবে—এরাই একদিন বড় হবে জীবনের দায়-দায়িত্ব তারা বহন করবে—জীবনের প্রতিমুহূর্তে কত না প্রশ্নের সম্মুখীন হবে—সেগুলো তারা কীভাবে মোকাবেলা করবে? তার একটি পরিকল্পনা করেই তাদের লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে হবে। শিশুকাল থেকে যাকে যে অভ্যাস করানো যাবে সেটি আর সে সহজে ছেড়ে দেবে না। বই পড়ার অভ্যাসটিও তেমনি একটি ব্যাপার। এই ব্যাপারটিকে যদি ফলপ্রসূ করতে হয় তা হলে কী করতে হবে? প্রথমেই বুঝতে হবে—শিশু কারা? তাদের গড়ে তোলার দায়িত্ব কাদের? তাদের মনস্তত্ত্ব বুঝে শিক্ষা দেয়া—শিশুর বয়স অনুযায়ী বই পড়তে দেয়া। বই পড়ে শিশু সব বুঝতে পারবে না—তাকে তার মতো করে বুঝিয়ে দেয়া। রঙিন বই, রূপকথার বই কিনে দিয়ে তাকে স্বপ্নের রাজ্যে বিচরণ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া এবং বই পাঠে আগ্রহী করা। আগ্রহটা অভ্যাসে পরিণত হলে হয়তো জীবনের শেষ বেলা পর্যন্ত তা লালন করে জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে। অভিভাবকেরা বাচ্চাদের যখন খেলনা কিনে দেন তখন যেন তাদের পছন্দের বইও কিনে দেন। যদি বই না পড়তে চায় তাকে এমনভাবে বোঝানো উচিত যে যত খেলনাই থাক না কেন বই-এর ওপর কিছু নেই। বই তার সারা জীবনের সেরা বন্ু্ল। অবসরে বিনোদনে, আপদে বিপদে বইকে করে যেন নিত্য সঙ্গী। পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই দেখা যায় কোনো অনুষ্ঠানে পুরস্কার হিসেবে দেয়া হচ্ছে তৈজসপত্র—প্লেট, গ্লাস, মগ। পুরস্কার দেখে উত্সাহ লাগবে কি? বরং বিরক্ত লাগে। এই পুরস্কার কি ছাত্রছাত্রীদের দেয়া হয়—নাকি তাদের মায়েদের এ সবের পরিবর্তে বই দিলে তারা পড়তো এবং নিজের সুকৃতিতে পাওয়া পুরস্কার বিধায় সযতনে রক্ষা করতো। উত্সাহ নিয়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত পুস্তকখানা আগ্রহভরে অন্যদের সামনে তুলে ধরতো। সুতরাং পুরস্কার হিসাবে বই অনন্য, অবশ্যই বই দিতে হবে। চার দশক আগের ধ্যান-ধারণা অনেক কিছুই বদলে গেছে—আগে হয়তো মনে করা হতো—এমন একটা কিছু উপহার হিসাবে দিতে হবে যা সংসারের কাজে লাগে—এই ধারণা পাল্টাতে হবে। আগের দিনের কবি লিখেছেন— ‘রাখাল গরুর পাল নিয়ে যায় মাঠে—শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।’ আজ কিন্তু তা মনে করা হচ্ছে না। রাখালও শিশু— তারও আছে লেখাপড়ার অধিকার—সে শুধু গরু চরাবে না শিক্ষিত হয়ে দেশের জন্য আরো বেশিকিছু করবে। উচ্চ বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় যে যেখানেই লেখাপড়া করুক না কেন তাদের জন্য বিশেষ প্রয়োজন মানসম্মত পাঠাগার। মনের মতো অথবা প্রয়োজনীয় বইটি যেন সে সহজেই পেতে পারে তা হলেও হয়তো পড়ার আগ্রহ করবে। সমাজের যাঁরা মাথা তাঁরা যদি মহল্লাভিত্তিক বই পড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে এগিয়ে আসেন তা হলে যাঁরা কর্মজীবী নারী-পুরুষ আছেন তাঁরাও বই পড়বেন, জ্ঞানার্জন করবেন এবং পুরস্কার পেয়ে উত্সাহিত হবেন। ব্যাপারটি ভেবে দেখার জন্য সবাইকে অনুরোধ করছি। মননশীল জাতি গড়তে বই এর বিকল্প নেই—যদিও বই-এর বিকল্প হিসাবে নানান যন্ত্রপাতির নাম করা হয়— কিন্তু সবার উপরে বই এবং বই। ঢাকা