আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও-পাগলা) আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ক্যাপ্টেন (অব) গিয়াস উদ্দিন আহমেদ। ‘আমাকে চেনেন? আমি মেজর জিয়াকে গুলি করা লোক, আমি জিয়া হত্যার আসামি’- এই মন্তব্যের জন্য বিএনপি তাকে জিয়ার ‘আত্মস্বীকৃত খুনি’ আখ্যায়িত করে তার বিচার দাবি করেছে। অবিলম্বে তাকে গ্রেফতার করে সরকার বিচার না করলে, বর্তমানে জনতার আদালতে এবং ভবিষ্যতে প্রকৃত আদালতে তার বিচার করা হবে বলেও দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। অন্যদিকে গিয়াস উদ্দিনের ‘বিতর্কিত’ ও ‘গণবিরোধী’ ভূমিকার বিরুদ্ধে এবং তার পদত্যাগ দাবিতে গতকাল গণমিছিল ও সমাবেশ করেছে গফরগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশ।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সমন্বয়ক তরিকুল ইসলাম বলেছেন, আজ (শুক্রবার) গণমাধ্যমে খবর এসেছে, গফরগাঁওয়ের আওয়ামী লীগ নেতা সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে নিজের কাজ করিয়ে নেয়ার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি দিয়েছেন, তিনি তাদের বলেছেন- আমি জিয়াউর রহমানকে খুন করেছি। আমি ফাঁসির আসামি। কাউকে ভয় পাই না। আমার কাজ দ্রুত করে দিন। তরিকুল বলেন, আমি সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, এই আত্মস্বীকৃত খুনিকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচার করুন। আত্মস্বীকৃত এই খুনির বিচার যদি সরকার না করে তাহলে জনগণের আদালতেই তার বিচার হবে। পরবর্তী সময়ে প্রকৃত আদালতে তার বিচার করা হবে। এমপি গিয়াস উদ্দিন নিজের এলাকায় মানুষ খুন করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তরিকুল। জিয়াউর রহমানের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল জিয়ার মাজারে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাস আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ দাবি জানান বিএনপির সমন্বয়ক।
গিয়াস উদ্দিন এমপি গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রশ্নই ওঠে না, আমি এই ধরনের কোনো কথা বলিনি। একদম মিথ্যা কথা। আমি যে ঐ কথা বলেছি এর কোনো সাক্ষী আছে! আমি কী পাগল যে জিয়াকে গুলি করে হত্যা করার মত কথা বলতে যাব! আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করা লোক। বলেন, আমি এই ধরনের কথা বলতে পারি!’
জিয়াউর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনি উল্লেখ করে বিএনপির তরিকুল ইসলাম তার যে বিচার দাবি করেছেন, সে সম্পর্কে গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘জিয়া মারা যান ১৯৮১ সালে, আর এখন ২০১৩ সাল। এরমধ্যে বিএনপি দু’বার ক্ষমতায় ছিল। তারা কেন জিয়া হত্যার বিচার করেনি। জিয়া হত্যার বিচার আমিও চাই, সারা জাতি চায়। এই ঘটনায় আমার বিরুদ্ধে ট্রায়াল হয়েছিল। তবে সেটি জিয়া হত্যা মামলা ছিল না, তা ছিল সেনা বিদ্রোহের অভিযোগে। ঐ ট্রায়ালে আমার ১৪ বছর জেল হয়, পরে ৮ বছর জেল খেটে বের হয়েছি। সুতরাং এক গরু তো দু’বার জবাই করা যায় না।’ এই প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন ‘বিএনপি খুঁজে বের করুক, জিয়াকে কারা হত্যা করেছে, তাদের পার্টিরও কারা কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল, ট্রায়াল করুক, প্রয়োজনে আমাকে ডাকলে সাক্ষ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি।’
সরকার দলীয় এই এমপি আরও বলেন ‘বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আমি ঐসব কথা-বার্তা বলিনি। এটা স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের সাজানো নাটক। দেশে যখন যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে তখন ঐ চক্র কিছু না কিছু বের করার নামে এসব কাণ্ড করছে।’
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার কথা বলায় গিয়াস উদ্দিন এমপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এখন আরও প্রিয়ভাজন হয়ে উঠতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। গতকাল রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ ীয় কার্যালয়ে সংবাদিক সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন, প্রকাশ্যে সরকার দলীয় একজন এমপি স্বীকার করেছেন, তিনি জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী। তারপরও এ নির্লজ্জ সরকারের টনক নড়ছে না। দেখা যাবে, এ কথা বলার কারণে তার আরও প্রমোশন হয়েছে।’
অভিযোগ উঠেছে, বৃহস্পতিবার একটি কাগজ ফটোকপি ও ফ্যাক্স করে দিতে দেরি হওয়ায় সচিবালয়ের ভেতরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার অপারেটর মাইনুদ্দিন ভুঁইয়াকে গিয়াস উদ্দিন এমপি বলেছেন ‘তোর এত বড় সাহস। তুই আমার কাজে দেরি করছস। তোরে গুলি কইর্যা মারব। পরে গণশিক্ষা মন্ত্রী আফছারুল আমীনের কক্ষে বসে তার সামনেই এই এমপি বলেছেন ‘আপনি জানেন, আমি মেজর জিয়া হত্যার আসামি। তাকে গুলি করেছি। তারপরও এরা আমার কাজ করে না। আপনার কর্মকর্তাদের বলে দেন, আমি কে। আমি ফাঁসির আসামি। কাউকে ভয় পাই না। আমি আসার সঙ্গে-সঙ্গে কাজ করে দিতে হবে।’
সচিবালয়ে সরকারি কর্মচারীকে এমপি গিয়াসের গুলি করে মারার হুমকি দেয়ার ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে বৃহস্পতিবারই গিয়াস উদ্দিনের নির্বাচনী এলাকা গফরগাঁওয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
এর আগে ২০১২ সালের ১৮ মে গফরগাঁও উপজেলার কান্দিপাড়া বাজারে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে এমপি গিয়াস উদ্দিন গুলি চালান। পরদিন গণমাধ্যমে এর সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ পেলে এনিয়ে সারাদেশে তোলপাড় হয়। ঘটনার সময় বিক্ষুব্ধ দলীয় কর্মীরা এমপির গাড়ি ভাংচুর করেন। জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ার বিষয়ে সংসদে বক্তব্য রাখেন বিএনপির এমপিরা। তখন তারা তার বিচার দাবি করেছিলেন।
আমাদের গফরগাঁও সংবাদদাতা আতাউর রহমান মিন্টু জানান, গিয়াস উদ্দিনের ‘বিতর্কিত’ ও ‘গণবিরোধী’ ভূমিকার বিরুদ্ধে এবং তার পদত্যাগ দাবিতে গণমিছিল ও সমাবেশ করেছে উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশ। গতকাল বিকালে উপজেলার কান্দিপাড়া বাজারে তৃণমূল আওয়ামী লীগের ব্যানারে উপজেলা চেয়ারম্যান ফাহিম গোলন্দাজ বাবেল সমর্থিত উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা নাদিরুজ্জামান, শফিউল বাশার মনি, রুবেল খান, শফিকুল খোকন ও ফখরুলের নেতৃত্বে এই মিছিল-সমাবেশ হয়।
জিয়াউর রহমান হত্যার ঘটনায় দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ৯০ দশকের শুরুতে মুক্তি পেয়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দিন আহমেদ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হন। তখন উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ছিলেন তত্কালীন দাপুটে এমপি আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ। তার সঙ্গে ২০০৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর যুগ্ম আহবায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াস শুরু করেন গিয়াস উদ্দিন।
২০১১ সালের ২৭ মার্চ উপজেলার যশরা ইউনিয়নের দৌলতপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন নির্মাণ কাজের উদ্বোধনকে কেন্দ করে গিয়াস উদ্দিন এমপির গ্রুপ ও উপজেলা চেয়ারম্যানের গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে চারটি মোটরসাইকেল ভাংচুরসহ অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে উপজেলা চেয়ারম্যান গ্রুপের নেতা-কর্মীদের ধাওয়ার মুখে স্থানীয় এমপি গিয়াস উদ্দিন পুলিশ প্রহরায় ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। একই বছরের ৩১ মার্চ পৌরশহরে যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচার দাবিতে আহূত সমাবেশকে কেন্দঘর্ষ বাঁধে। এতে এমপি সমর্থিত আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা এবং আসবাবপত্র ও মোটরসাইকেল ভাংচুর, অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে উভয় গ্রুপের ১৬ নেতা-কর্মী আহত হয়।
