আবারো কি সংবিধান সংশোধন হচ্ছে? এ প্রশ্ন অনেকের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের মূল রায়দাতা সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৪২ দিন আগে সংসদ বাতিলের অভিমত দিয়েছেন। সরকারি দল থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আর বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অটল রয়েছে। এর বাইরেও নাগরিক সমাজ থেকেও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে নানা ফর্মুলা আসছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব প্রস্তাবের কোনটি গ্রহণ করলে আবারো সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন পড়বে।
এছাড়া সংসদ বাতিলের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করতে আইনের একটি খসড়া তৈরি করেছে ইসি। যদিও সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত রয়েছে। ফলে আইন ও সংবিধানের মধ্যে একটি সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি হচ্ছে।
গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায় প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ওই রায়ে বেশ কিছু অভিমত দেয়া হয়। এর মধ্যে বিচারপতি খায়রুল হক সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের ফলাফলের তারিখ ঘোষণা পর্যন্ত রাষ্ট্রের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকবেন বলে অভিমত দেন। বিচারপতি খায়রুল হক বর্তমান সংবিধানের ৫৬ (২) অনুচ্ছেদের শর্তের পরিবর্তে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ৫৬ (৪) অনুচ্ছেদ গণতন্ত্রের স্বার্থে আনয়ন করা প্রয়োজন বলেও অভিমত দেন। তার এই তিনটি নির্দেশনার যে কোনো একটি বা সবক’টি গ্রহণ করতে চাইলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
প্রসঙ্গত, সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে (ক) উপ-দফায় উল্লেখ রয়েছে ‘মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’ কিন্তু এ ক্ষেত্রে একটি শর্ত রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে, (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লেখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।’ সংবিধানের এই বিধানের কারণে ৪২ দিন আগে সংসদ বাতিলের সুযোগ নেই। কেননা বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ বহাল রেখেই জাতীয় নির্বাচন করতে হবে।
এদিকে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে বিচারপতি খায়রুল হক ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ৫৬ (৪) অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের পরামর্শ দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছিলো, ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া এবং সংসদ সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে এই অনুচ্ছেদের (২) বা (৩) দফায় অধীন (প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিগণ) নিয়োগ দানের প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার অব্যবহিত পূর্বে যাহারা সংসদ সদস্য ছিলেন, এই দফার উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তাহারা সদস্যরূপে বহাল রহিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।”
বিচারপতি খায়রুল হকের এই পরামর্শ গ্রহণ করা হলে আবারো সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এছাড়া তার এই অভিমত সংসদ গ্রহণ করলে দশ ভাগের এক ভাগ টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী নেয়ার যে সুযোগ বর্তমান সংবিধানে রয়েছে তাও রহিত হয়ে যাবে।
ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে আরো বলা হয়েছে, “সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ হতে নির্বাচনের ফলাফলের তারিখ ঘোষণা পর্যন্ত রাষ্ট্রের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকবেন। ” এদিকে নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ সংশোধন করে সংসদ বাতিলের পর থেকে নতুন সংসদ কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে অর্পণের সুপারিশ করেছে।
কিন্তু সংবিধানের ৫৫ (২) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাহার কর্তৃত্বে এই সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে।’ সংবিধান হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন। দেশের অন্য আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন সংবিধানের বিধানই প্রাধান্য পাবে। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী যদি নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন তা সংবিধান পরিপন্থি হবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি সাংবিধানিক জটিলতা থেকেই যাবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইন ও সংবিধানের মধ্যে বৈপরীত্য থাকা উচিত নয়। ওই বৈপরীত্য নিরসনে হয় আইনকে বাতিল করতে হবে নতুবা সংবিধানকে সংশোধন করতে হবে।
এদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পর সরকারের নীতি নির্ধারক পর্যায় থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এই অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা বা কাঠামো কি হবে সে ব্যাপারে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী একটি দলীয় সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সংসদ এবং সরকার বহাল থাকছে। আর এ দুটির কোনো পরিবর্তন আনতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন পড়বে। তাছাড়া বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করতে হলেও সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও আগামী নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে নানা ফর্মুলা দেয়া হচ্ছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান সম্প্রতি চারটি ফর্মুলা দিয়েছেন। তার ফর্মুলার একটি হচ্ছে, দু’দল দশজন করে মোট বিশ জন নিরপেক্ষ সদস্যের তালিকা দেবে। ওই তালিকা থেকে উভয় দলের ৫ জন করে মোট ১০ জন সদস্য নির্বাচন করবে সংসদ। ওই ১০ জনের মধ্য থেকে একজনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে। তার এই ফর্মুলা গ্রহণ করা হলে সেক্ষেত্রেও বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়া ড. আকবর আলি দুই দল একমত না হলে গণভোট দিয়ে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সংবিধানে গণভোটের কোন বিধান নেই। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের বিধান বাতিল করে দেয়া হয়েছে।
