ফসফরাস বা ফসফেট সারের অতিরিক্ত ব্যবহার:
১. ফসফরাস জাতীয় সার বেশি ব্যবহারে ফসলের আগাম পুষ্টতা বা পরিপক্বতা দেখা যায়। অম্ল মাটিতে ফসফেট আটকে গিয়ে এই সার গাছের পুরোপুরি কোনো কাজে আসে না। ফসফরাস সার অতিরিক্ত হলে অন্যান্য সার বিশেষ করে নাইট্রোজেন আনুপাতিক হারে বাড়াতে হয়, তা না হলে বীজ উত্পাদনে অসুবিধা হয়।
২. ফসফরাস সার বেশি ব্যবহারে মাটিতে জিংক, আয়রন, কপার ও ম্যাঙ্গানিজের অভাব দেখা দেয়।
৩. মাটিতে আয়রনের ঘাটতি হলে ধান গাছের পাতার রঙ হলুদাভ বা সাদাটে হয়ে যায়। ধানের বীজতলার চারার নতুন পাতা হলদেটে হয়ে যায়। অভাব তীব্র হলে পাতাগুলো হলদেটে থেকে হলদে সাদা এমনকি পুরোটাই সাদা হয়ে যেতে পারে। টমেটো গাছের পাতার দুই শিরার মাঝের স্থানের সবুজ কণিকা নষ্ট হয়ে সাদা হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও কাণ্ডের আগা হলদে ও সবুজ হয় ও ডগার বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। ফসলের ফল ও বীজ সংখ্যায় কম উত্পাদিত হয়। ফল গাছের পাতায় লালচে বাদামি দাগ দেখা যায়। সরিষা জাতীয় গাছের কচিপাতার সবুজ অংশ নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু পুরানো পাতা সবুজই থাকে। সয়াবিনের পাতা ছোট হয় এবং স্বাভাবিক রঙ হারিয়ে হালকা সাদা রঙ ধারণ করে। ৪. ম্যাঙ্গানিজের অভাবে পাতার রঙ জ্বলে যায়। পাতা হলদে বা বাদামি রঙয়ের হতে দেখা যায়। ধান গাছের পাতার আগার দিক থেকে দু’শিরার মাঝখানে বিবর্ণতা শুরু হয়। পরে এগুলো ধীরে ধীরে বাদামি হতে শুরু করে। নতুন পাতা হালকা সবুজ হয় এবং খাটো ও সরু হয়ে যায়। ছড়িয়ে পড়ে। তবে কচিপাতা সবুজ থাকতে পারে। শিমের পুরো পাতা হলুদ হয়ে যায়, তবে শিরা সবুজ থাকে। একে মোজাইক রোগ বলে ভুল হতে পারে।
কপার বা বোর্দো মিশ্রণ অতিরিক্ত ব্যবহার:
১. জমিতে অতিরিক্ত কপারঘটিত ছত্রাকনাশক বা বোর্দো মিশ্রণ ব্যবহার করা হলে গাছের শিকড়ের বেশি ক্ষতি হয়। কারণ কপার গাছের মাটির উপরের অংশের চেয়ে মাটির নিচের অংশেই বেশি জমা হয়। অতিরিক্ত কপারের কারণে গাছের প্রধান শিকড় ও শাখা শিকড়ের বৃদ্ধি হয় না। শাখা শিকড়ও মোটা ও অস্বাভাবিক গাঢ় রঙয়ের হয়ে যায়। পাতার সবুজ অংশ নষ্ট হয়ে যায়। পোল্ট্রি সার ও শহরের বর্জ্য থেকে তৈরি জৈবসারে সাধারণত বেশি কপার থাকে, এগুলো ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হয়।
২. মাটিতে অতিরিক্ত কপারের উপস্থিতি গাছের জিংক শোষণ বা গ্রহণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় বা একেবারে বন্ধ করে দেয়। ফল জাতীয় গাছে জিংকের অভাব হলে অনেক সময়ই ফল পাকতে দেরি হয়। ৩. মাটিতে অতিরিক্ত কপারের উপস্থিতিতে আয়রনের ঘাটতি দেখা দেয়। গাছে প্রয়োজনীয় আয়রনের পরিমাণ কমে গিয়ে পাতার সবুজ কণিকা তৈরি বাধাগ্রস্থ হয়। ফলে গাছের সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। গাছ খাটো হয়। শিম জাতীয় গাছের বেলায় বাতাস থেকে নাইট্রোজেন আবদ্ধ করার কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। শিকড়ে নডিউল বা গুটিকা কম উত্পন্ন হয়।
৪. আয়রন ও কপারের অতিরিক্ত ব্যবহারে যে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয় তা চুন জাতীয় সার ব্যবহারে কমাতে সাহায্য করে।
চুনের অতিরিক্ত ব্যবহার:
১. অম্ল মাটিতে চুন বেশি ব্যবহার করলে মাটিতে থাকা জিংক, বোরন ও ম্যাঙ্গানিজের সহজলভ্যতা বেড়ে যায়।
২. চুন বেশি ব্যবহার করলে মাটিতে জিংক, বোরন, আয়রন ও কপারের অভাবও হতে পারে।
জিংক, কপার ও ম্যাঙ্গানিজ সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটিতে আয়রনের ঘাটতি হয়।
মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে মাটির বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের অবস্থা বুঝে সার ব্যবহার করা উচিত। জমিতে একবার চুন ব্যবহারের পর পরের বছর চুন ব্যবহার করতে হয় না। গাছের সমস্যার কারণে কপার জাতীয় ছত্রাকনাশক ব্যবহারের আগে মাটিতে তার অবস্থা জেনে ব্যবহার করা ভাল। যদি মাটিতে সারের পরিমাণ অতিরিক্ত হয়ে যায় তখন বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে গাছ অন্যান্য সারের উপাদানগুলোর স্বাভাবিক গ্রহণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। (শেষ)
লেখক:উদ্যান বিশেষজ্ঞ
কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর, রংপুর অঞ্চল, রংপুর
