ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিলো পাকিস্তানে

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:০২
বিতর্ক আর সংকট পিছু ছাড়ছে না পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীদের। প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির মামলা পুনরায় চালুর জন্য সুইস সরকারকে চিঠি লিখতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে গত জুনে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে সরে যেতে হয়। রাজা পারভেজ আশরাফ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর একই চাপ তার উপরও ছিলো। শেষ পর্যন্ত চিঠি লিখতে তিনি রাজিও হয়েছিলেন। কিন্ত শেষ রক্ষা হয়নি। কুইক রেন্টাল বা ভাড়া ভিত্তিক বিদুত্ প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে আদালতের কোপানলে পড়েন রাজা পারভেজ। পাকিস্তানের তেহরিক-ই-মিনহাজুল কুরআনের (টিএমকিউ) নেতা ড. তাহির-উল-কাদরি ও তার সমর্থকদের বিক্ষোভের মুখে দেশটির রেন্টাল পাওয়ার প্রজেক্টের (আরপিপি) দুর্নীতির কারণে রাজা পারভেজসহ ১৬ জনকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। আরপিপিগুলো বিদ্যুত্ বিক্রির নামে হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি করেছে, আর প্রধানমন্ত্রী সেখান থেকে ঘুষ ও কমিশন নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে গত মঙ্গলবার আদালত ওই নির্দেশ দিলেও গতকাল শনিবার পর্যন্ত রাজা পারভেজকে গ্রেফতার করা হয়নি। কারণ হিসাবে দেশটির জাতীয় জবাবদিহিতা ব্যুরো (এনএবি) সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতারে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ তাদের হাতে নেই। রেন্টাল পাওয়ার প্রজেক্টের ইতিবৃত্ত ২০০৬ সালে পারভেজ মোশাররফের সরকার বিদ্যুত্ ঘাটতি নিরসনে স্বল্প মেয়াদী সমাধানের পথ বের করে। বিদ্যুত্ কেনার জন্য ছোট ছোট ছোট পাওয়ার প্লান্টের সঙ্গে তিন ও পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি করে। পরবর্তীকালে এগুলো ‘হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার প্রজেক্টের’ মতো দীর্ঘ মেয়াদে কাজ শুরু করে। ২০০৮ সালে পিপিপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারও একই পথ অনুসরণ করে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) পাকিস্তানের আরপিপি’র উপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন আরপিপি সঙ্গে করা চুক্তিতে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। এতে ক্রয় সংক্রান্ত ও রেগুলেটরি প্রক্রিয়া লঙ্ঘন হয়েছে। যে কারণে দুই বছরে গ্রাহকের ব্যয় ৮৭ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, অতিরিক্ত ১৪টি ভাড়া ভিত্তিক রেন্টাল পাওয়ার প্রজেক্ট বসানোর পরও লোডশেডিং দূর করা যায়নি। বরং পাকিস্তানে যে বিদ্যুত্ ব্যবস্থা ছিলো তার পূর্ণ ব্যবহার করা গেলে আরো ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করা যেত। সেটা না করে ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্প করায় সরকারের ২০৭ বিলিয়ন রুপি খরচ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আরপিপিগুলোকে সাত শতাংশ অর্থ অগ্রিম (ডাউন পেমেন্ট) দেয়ার কথা ছিলো সরকারের। কিন্তু চুক্তির পর স্টান্ডবাই লেটারস অব ক্রেডিট (এসবিএলসি) যুক্ত করার মাধ্যমে আরপিপি এর পক্ষে আর্থিক সুবিধা দেয়া হয়। ৭ শতাংশ থেকে অগ্রিম দেয়া অর্থ ১৪ শতাংশে উন্নীত করা হয়। ফলে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আরপিপি যেসব গ্যারান্টি দিয়েছিলো তার বেশিরভাগই বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর ‘বিজনেস রেকর্ডার’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুতের ঘাটতি কমাতে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে অনেক বেশি ব্যয় হচ্ছে। কারণ এসব প্রজেক্টে প্রতি ইউনিট বিদ্যুত্ উত্পাদনে খরচ হচ্ছে ১৪ রুপি। রাজা পারভেজ এখন ‘রেন্টাল পারভেজ’ প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফ পানি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তিন বছর। দায়িত্বে থাকাকালে লোডশেডিংয়ের জন্য তাকে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এ পদে থাকাকালে আরপিপি থেকে ঘুষ ও কমিশন নিয়েছিলেন। তার সময়ে নয়টি রেন্টাল পাওয়ার প্রকল্প সচল করার জন্য অগ্রিম ২২ বিলিয়ন রুপি প্রদান করা হয়েছিলো। কিন্তু এদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রজেক্ট স্থাপন করেনি। আর কয়েকটি স্থাপন করেছিলো কিন্তু দেরিতে। রাজা পারভেজ আশরাফের সময়ে এসব প্রকল্পের জন্য অগ্রিম অর্থ ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৪ শতাংশ করা হয়েছিলো। ২০১০ সালের ১৪ ডিসেম্বর ‘দ্য নিউজ’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অগ্রিম হিসেবে নেয়া ২২ বিলিয়ন রুপি আরপিপিগুলোর কাছ থেকে উদ্ধারের দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলো ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল পাকিস্তান। ২০১০ সালে ডিসেম্বরে ‘পাকিস্তান ট্রিবিউনে’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নওডেরো-১১ এবং গুড্ডু রেন্টাল পাওয়ার প্রজেক্টে লাখ লাখ ডলারের অনিয়ম হয়। গুড্ডু রেন্টাল পাওয়ার প্রজেক্টের যন্ত্রপাতি নওডেরো-১১ প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়। যেটা ছিলো সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূত। এ দু’টি প্রজেক্টকে এসব যন্ত্রপাতি আনার জন্য পৃথকভাবে অগ্রিম অর্থ দেয়া হয়েছিলো। এ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টির পর রাজা পারভেজ আশরাফ গুড্ডু প্রজেক্টকে সমর্থন করে নওডেরো-১১ থেকে যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেয়ার অনুমোদন দেন। স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুত্ কেন্দ্র আমদানি বা ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্পের দেখভাল করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ। এসব প্রকল্পে সরকারের কোটি কোটি ডলার খরচ হলেও বিদ্যুত্ উত্পাদন হয়েছে অল্পই। এ নীতির কারণে পরিবর্তীকালে তার নাম দেয়া হয় ‘রাজা রেন্টাল’। এখান থেকে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি বিদেশে সম্পত্তি কিনেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। আর তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মামলাও হয়নি। মধ্যবিত্ত হলেও রাজনৈতিক পরিবার থেকেই রাজনীতিতে আসেন রাজা পারভেজ আশরাফ। তার এক চাচা ৬০ এর দশকে আইয়ুব খানের মন্ত্রী পরিষদের সদস্য ছিলেন। এর আগে দুর্নীতির অভিযোগে তিনি তার ৬০ শতাংশ সম্পত্তি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। রাওয়ালপিন্ডির কাছে সাংগ্রাল গ্রামের বাসিন্দা আশরাফ। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সরকারের টাকায় সেই বাসভবনে তিনি হেলিপ্যাড নির্মাণের পরিকল্পনা করেছেন। বিরোধীরা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, দেশের আর্থিক সঙ্কট ও বিদ্যুত্ সমস্যার কথা ভুলে আশরাফ প্রধানমন্ত্রী পদের সুযোগ-সুবিধা নিতেই ব্যস্ত। রেন্টাল প্রজেক্ট বন্ধে হাইকোর্টের আদেশ অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির জন্য ২০১২ সালের মার্চে আরপিপিগুলো বন্ধ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের আদেশে অগ্রিম অর্থের হার বৃদ্ধি এবং আরপিপি থেকে উচ্চ মূল্যে বিদ্যুত্ কেনার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে দায়ী করা হয় এবং অগ্রিম দেয়া অর্থ আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়া ২০০৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত এসব প্রজেক্টের চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনার নির্দেশ দেয়া হয় এনএবি’কে। সুপ্রিমকোর্টে আরপিপি’র দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার এসব অভিযোগ আনেন গৃহায়ণ মন্ত্রী ফয়সাল সালেহ হায়াত এবং পিএমএল-কিউ ও পিএমএল-এন এর দু’জন আইন প্রণেতা। রাজা পারভেজকে জেরা করা হতে পারে গত ১৫ জানুয়ারি আরপিপি দুর্নীতির অভিযোগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফসহ ১৬ জনকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয় দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। গ্রেফতারের ২৪ ঘন্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিলেও এখনো তাকে গ্রেফতারই করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে এনএবি’র মুখপাত্র জাফর খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আশরাফের বিরুদ্ধে তদন্ত এখনও চলছে। দুর্নীতির প্রশ্নে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীকেও জেরা করতে পারে এনএবি। তবে তাকে জেরা করতে ডাকা হবে, না কিছু প্রশ্নের জবাব তার কাছ থেকে লিখিতভাবে চাওয়া হবে-সে ব্যাপারে এখনও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।